
নবজাতকেরা যাতে মাতৃদুগ্ধে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যে চেষ্টা চালাচ্ছে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্রেস্ট মিল্ক রিসোর্স নেটওয়ার্ক’
কোভিডে (Covid-19) মারা গিয়েছেন মিসেস সরকার। তারপর চারদিনের একরত্তি ফুটফুটে ছেলেকে নিয়ে মহাসমস্যায় পড়েছেন মিঃ সরকার। শিশুটির খাবার জোগাড় হবে কী করে? একটা সময় পরে তিনি বুঝলেন, সমস্যাটা তাঁর মতো আরও অনেকেরই।
অগাস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে সারা পৃথিবীতে চলে ‘ওয়ার্ল্ড ব্রেস্ট ফিডিং উইক’ (World Breastfeeding Week) বা ‘স্তন্যপান সপ্তাহ’। শিশুদের স্তন্যপানের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতেই এমন সচেতনতামূলক প্রচার। বলা হয়, সন্তান জন্মের অন্তত চার থেকে ছ’মাস পর্যন্ত একটি শিশুর মাতৃস্তন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দেখা গেছে, বহু ক্ষেত্রে হয় মা শিশুকে সেই পুষ্টি দিতে সক্ষম হন না, নয়তো শিশুই মায়ের স্তন্য পান করতে পারে না। তার একাধিক কারণ রয়েছে। কোভিড আসার পরে সেই সব কারণ আরও বেড়েছে। কোভিড পরিস্থিতি বিভিন্ন বিষয়ের মতো স্তন্যপানের ক্ষেত্রেও ভয়ংকর সংকট তৈরি করেছিল৷ সদ্যোজাত শিশুকে রেখে মারা গিয়েছেন অনেক নারী৷ এছাড়া অনেক শিশুর মা কোভিডের জন্য কোয়ারেন্টিনে থেকেছেন৷ তার ফলে শিশুদের থেকে জন্মদাত্রীকে দীর্ঘসময় দূরে থাকতে হয়েছে৷
দুই তরুণী শিশুদের সঙ্গে দুধ ডোনার মায়েদের সংযুক্ত করতেই গড়ে তোলেন এই রিসোর্স নেটওয়ার্ক৷ মা হারা শিশুর মুখে তাঁর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যটুকু পৌঁছে দিতে যাতে অসুবিধা না হয়, সেই লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছিলেন দুই বাঙালি নারী।
এই সমস্যাটা ভাবিয়ে তুলেছিল কলকাতার দুই তরুণী- বৈদেহী দাস (Baidehi Das) ও মণিময়ী চক্রবর্তীকে (Monimoyee Chakrabarty)৷ নবজাতকেরা যাতে মাতৃদুগ্ধে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যে তথ্যপঞ্জি গড়ছেন এই দুই তরুণী, যার পোশাকি নাম ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্রেস্ট মিল্ক রিসোর্স নেটওয়ার্ক’ (West Bengal Breast Milk Resource Network)৷ কেন এমন উদ্যোগ? স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্মী মণিময়ী বলেন, ‘‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অক্সিজেন রিসোর্স খুঁজতে সাহায্য করতাম৷ তারপর অভিনেত্রী স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের একটা পোস্ট দেখি৷ দিল্লিতে মাতৃদুগ্ধ খুঁজছে৷ আমাদেরও মনে হয় কলকাতায় এমন হবে না কেন?” প্রথমদিকে এই দুই তরুণীও অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু এ রকম কিছু কলকাতায় নেই৷ এমনকি মিল্ক ব্যাঙ্ক নিয়ে বিশেষ সচেতনতাও গড়ে ওঠেনি৷ কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালেই একমাত্র মিল্ক ব্যাঙ্ক রয়েছে৷ পশ্চিমবঙ্গ সরকার (West Bengal Govt) ২০১৩ সালের ৬ অগাস্ট এসএসকেএম হাসপাতালে (SSKM Hospital) পূর্ব ভারতের প্রথম এবং ভারতের সর্বপ্রথম আধুনিকতম ‘হিউম্যান মিল্ক ব্যাঙ্ক’-এর সূচনা করেন। যে প্রকল্পের আওতায় এটি চালু হয়, নাম ‘মধুর স্নেহ’। কেবল হাসপাতালে ভর্তি শিশুরাই এই ব্যাঙ্কের সুবিধা পায়৷ এই পরিস্থিতিতে দুই তরুণী শিশুদের সঙ্গে দুধ ডোনার মায়েদের সংযুক্ত করতেই গড়ে তোলেন এই রিসোর্স নেটওয়ার্ক৷ মা হারা শিশুর মুখে তাঁর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যটুকু পৌঁছে দিতে যাতে অসুবিধা না হয়, সেই লক্ষ্যে এগিয়ে এসেছিলেন দুই বাঙালি নারী।

যদিও এ কাজ দুই মহিলার পক্ষে মোটেই সহজ নয়৷ রয়েছে সামাজিক বাধা৷ সেটা অতিক্রম করে ডোনার মায়েরা দুধ দানে এগিয়ে এসেছেন৷ তবে তথ্যপঞ্জিতে যুক্ত মায়েদের নাম গোপন রাখা হচ্ছে৷
হায়দ্রাবাদে গবেষণারত বৈদেহী বলেন, ‘‘আসামেও এমন একজন মহিলার খবর পেয়েছিলাম, যিনি নিজের ব্রেস্ট মিল্ক দান করতে চান৷ তারপরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম, একটি বাচ্চার মা মারা গিয়েছে, তার মাতৃদুগ্ধ লাগবে৷ ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম, এটা বরাবরের সমস্যা৷ তাই এই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলাটা জরুরি ছিল৷” বাস্তবিকই মাতৃস্তন্য শিশুদের ক্ষেত্রে যে শুধু ভালো, এমনটা নয়। বরং এই উপকারের পালা দ্বিমুখী। অর্থাৎ মা-ও তাঁর নবজাতকে স্তন্য পান করিয়ে টাইপ টু ডায়বেটিস, ব্রেস্ট ক্যানসারের মতো নানা রোগের হাত থেকে অনেকাংশে রেহাই পান।
মিল্ক ব্যাঙ্কের মতোই নিরাপদভাবে মাতৃদুগ্ধ দানে আগ্রহী মায়েদের তথ্যপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে। সতর্কতা হিসেবে মহিলাদের তিন মাস অন্তর অন্তর এইচআইভি বা হেপাটাইটিস টেস্ট করানো হতো চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে৷
অনেকেরই মনে প্রশ্ন থাকে, কতটা নিরাপদ মিল্ক ব্যাঙ্ক? পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘মধুর স্নেহ’ (Madhur Sneho) প্রকল্পের মাধ্যমে এসএসকেএম হাসপাতালে যে হিউম্যান মিল্ক ব্যাঙ্কটির সূচনা করেছে, অত্যন্ত আধুনিক পদ্ধতিতে সেখানে হিউম্যান মিল্ক ডোনারদের কাছ থেকে মাতৃদুগ্ধ সংগ্রহ করা হয়। সেই মাতৃদুগ্ধ আদৌ অন্য নবজাতকের জন্য কতটা সুরক্ষিত তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু স্ক্রিনিং, টেস্টিং প্রক্রিয়া চলে। এরপরে আসে মাতৃদুগ্ধ পাস্তুরাইজ করার বিশেষ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে মাতৃদুগ্ধ রাখার সময়সীমা বাড়ে। পাস্তুরাইজেশন পদ্ধতির পরে আছে মাতৃদুগ্ধ প্রসেস করে স্টোর করার প্রক্রিয়া। কারণ শুধুই মাতৃদুগ্ধ সংগ্রহ করলে চলবে না। পাশাপাশি সেই মাতৃদুগ্ধকে যেন বেশ কিছু দিন ভালোভাবে রাখা যায়, খেয়াল রাখতে হবে সে দিকেও।
মিল্ক ব্যাঙ্কের মতোই নিরাপদভাবে মাতৃদুগ্ধ দানে আগ্রহী মায়েদের তথ্যপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে। সতর্কতা হিসেবে মহিলাদের তিন মাস অন্তর অন্তর এইচআইভি বা হেপাটাইটিস টেস্ট করানো হতো চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে৷ এক্ষেত্রে সেতুর ভূমিকা নেওয়া মণিময়ী বলেন, ‘‘যাঁরা সদ্যোজাত শিশুদের দুধের জন্য আমাদের কাছে আসেন, তাঁদের সঙ্গে দুগ্ধদানে আগ্রহী মায়েদের যোগাযোগটাই করিয়ে দেওয়া হয়৷ তারপর চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হয়।” অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, দুগ্ধদান করার পরে স্তনদায়িনী মায়েদের সন্তানরা দুধ থেকে বঞ্চিত হবে না তো? সংশয় দূর করে শিশুমঙ্গল হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অর্ণব রায় বলেন, ‘‘এটা চাহিদা ও জোগানের অনুপাত৷ কোনো মা নিয়মিত হারে যদি অন্য বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান, তাহলে সেই চাহিদা বুঝে শরীর বেশি দুধই উৎপন্ন করবে৷”
কোভিডের তৃতীয় ঢেউ (Covid Third Wave) সামলে নিয়েছে দেশ। সংক্রমণ কমে গিয়েছে। মণিময়ী জানান, অতিমারির প্রকোপ কমে যাওয়ায় এখন জনজীবন অনেকটাই স্বাভাবিক। শিশু ও মায়ের বিচ্ছিন্নতার ঘটনাও কমেছে। কোভিডের ঢেউ চলাকালীন মাতৃদুগ্ধের ভালো চাহিদা ছিল। এখন সেই প্রয়োজন কমেছে। তবে যে কোনও পরিস্থিতি বা পরবর্তী ঢেউয়ের জন্য নেটওয়ার্ক তৈরি। ফোন নম্বর-সহ তথ্যপঞ্জি আপডেট করা আছে। যখনই প্রয়োজন পড়বে, দুধের জোগান দেওয়া যাবে।
(বৈদেহী ও মণিময়ীর অনুরোধে তাঁদের ছবি দেওয়া হল না)

