
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সূচনা হয় ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর
“গরিবের সংসারে কোনোরকমে টেনেটুনে মেয়েটাকে বড়ো করেছি। আমি দিনমজুর, করোনা এসে আমাদের সব শেষ করে দিল। মেয়েটার পড়াশোনার খরচ কীভাবে চালাব ভেবেই পাচ্ছিলাম না। তবে কন্যাশ্রীর দৌলতে মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে আর চিন্তা করি না” – কথায় কথায় বলছিলেন হুগলি-বৈদ্যবাটির বাসিন্দা সমর দাস।
আবার হাওড়ার ছাত্রী মধুজার কথায়, “অনেকদিন থেকে ইচ্ছে ছিল একটা কম্পিউটার কেনার, পড়াশোনার জন্য খুব প্রয়োজন হত। কিন্তু বাবা মায়ের ওপর চাপ দিতে ইচ্ছে করত না। কন্যাশ্রী প্রকল্প আমায় সেই ইচ্ছেপূরণের সুযোগ করে দিয়েছে।”
ভারতের মতো গরিব দেশের ঘরে ঘরে ‘কন্যাশ্রী’ ছিল এরকমই এক স্বপ্নের নাম। ঘরের কন্যাদের মুখের হাসি আর ইচ্ছেপূরণের নাম। আজ এই প্রকল্পের বয়স প্রায় আট পেরিয়ে নয়-এ পা দিয়েছে।
বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অনুপ্রেরণায় ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সূচনা হয় ২০১৩ সালের ১ অক্টোবর। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল কন্যা সন্তানের অল্পবয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার যে রীতি গ্রামবাংলায় বহাল ছিল, তা রদ করা। বিবাহই ছাত্রীদের একমাত্র ভবিষ্যৎ নয়, বরং উচ্চশিক্ষা হোক অন্যতম লক্ষ, এটাই কন্যাশ্রীর মূল মন্ত্র। এই প্রকল্পের অন্যতম অভিপ্রায় হল, আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা দরিদ্র দুঃস্থ মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য সামনের সারিতে তুলে আনা।
১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো বিদ্যালয়ে পাঠরতা ছাত্রীদের জন্য বার্ষিক ৭৫০ টাকা এবং ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে প্রত্যেকের জন্য ২৫,০০০ টাকা করে দেওয়া হয় এই প্রকল্পে। অনুদান পেতে নিজের বিদ্যালয়ের মাধ্যমে নাম নথিভুক্ত করতে হয় ছাত্রীদের। আর প্রত্যেক ছাত্রীর নামে থাকতে হবে একটি জিরো ব্যালেন্সের অ্যাকাউন্ট। ব্যাস, এটুকই যথেষ্ট। তাহলেই প্রতিমাসে নির্দিষ্ট সময় বৃত্তি পেয়ে যাবে ছাত্রীরা।
শুরুতে ছাত্রীদের পরিবারের বার্ষিক আয়ের সীমা নির্ধারণ করা থাকলেও বর্তমানে সেই সীমা আর নেই। যত বেশি সংখ্যক ছাত্রীদের এই প্রকল্পের আওতায় আনা যায় সেই লক্ষেই এই পদক্ষেপ নেন মুখ্যমন্ত্রী। ১৪ অগাস্ট দিনটি ‘কন্যাশ্রী দিবস’ হিসাবে পালন করা হয় রাজ্যে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কন্যাশ্রী প্রসঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় জানিয়েছেন, “আমি তাদের কৃতিত্ব, উৎসাহ আর নিষ্ঠার জন্য গর্বিত। কন্যাশ্রী প্রকল্প লক্ষ লক্ষ কিশোরীর স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করেছে। মহিলাদের ক্ষমতায়নের লক্ষেই আমাদের সর্বদা কাজ করে যাওয়া উচিত।”
ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভের সাম্প্রতিক রিপোর্টে দেখা গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে পড়ুয়াদের মধ্যে স্কুলছুটের প্রবণতা ক্রমশই কমছে। শুধু তা-ই নয়, স্কুলছুটের অসুখ কাটিয়ে দেশের সেরা ৬-৭টি রাজ্যের মধ্যে ঠাঁই করে নিয়েছে এ রাজ্যের পড়ুয়ারা। এই প্রকল্প তার নকশা ও সুশাসনের বৈশিষ্ট্যের জন্য একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। বর্তমানে যেকোনো ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষ সমান-সমান, এ কথা মানতেই হয়। মেয়েরা আজ কিছুতেই পিছিয়ে নেই। যেকোনো সাফল্যের অংশীদার আজ তারাও। আর তাদের স্বীকৃতি দিতেই রাজ্য সরকারের পদক্ষেপ, কন্যাশ্রী প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১-এ সারা রাজ্যের জনমত জানতে ঘুরে বেরিয়েছিল টিম ‘বঙ্গদর্শন’। ঝাড়গ্রামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে তারই একটি গ্রাউন্ড জিরোয় গিয়ে জানা গিয়েছিল কন্যাশ্রীর ছড়িয়ে পড়ার কথা। সেখানে একাধিক মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছিল, তারা সরকারি প্রকল্প কন্যাশ্রীর আওতায়।
বিগত বছরে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জনকারী ছাত্রী রুমানা সুলতানাকে রাজ্যের কন্যাশ্রী প্রকল্পের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করা হয়। রুমানার মতো মেয়েদের সাফল্য যাতে আরও নতুন নতুন আশার আলোদের মূল স্রোতে এগিয়ে দিতে পারে তার স্বপ্নেই কন্যাশ্রীর পথ চলা। বাংলার মেয়েরাও এখন এগিয়ে, কন্যাশ্রী তাই এখন বিশ্বশ্রী – এ কথা স্বীকার করে নেন সমাজের বিশিষ্টরা।
ছবি সৌজন্যেঃ https://www.wbkanyashree.gov.in/
