
বাঙালির অন্যতম প্রিয় ট্রেক অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পের দিনলিপি
রুকস্যাক কাঁধে করে ঘোরা মানুষদের বৃত্তে একটা কথা খুব প্রচলিত। “পয়সাও নষ্ট, শরীরেও কষ্ট।” কিন্তু সেই বারবার শরীরের প্রত্যেকটা মাংসপেশি আর জয়েন্টকে কাঁদিয়ে, দীর্ঘশ্বাস বের করিয়ে এগিয়ে যাওয়া। একজন মানুষ প্রথমবারের জন্য কেমনভাবে দেখে সেই রাস্তা? ঘন মেঘের আবরণ সরে গিয়ে যখন জ্বলজ্বল করতে থাকে বরফে আচ্ছাদিত চূড়াগুলো; কী ভাবে সে? দেখবেন মানুষকে হাসতে এবং কাঁদতে। ভোরের হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে তাদের তাকিয়ে থাকতে দেখবেন দূর দিগন্তে। এই সূত্রেই, নেপালের একটি রাস্তার কথা মনে পড়ে যায় রোজ। যার একেবারে শেষ গন্তব্য ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অন্নপূর্ণা, অন্নপূর্ণা সাউথ, মছপুচ্ছারে। গন্তব্যের নাম অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প (Annapurna Basecamp)। অবশ্য, নামে ‘বেসক্যাম্প’ কথাটি থাকলেও সাউথ ফেস হয়ে অন্নপূর্ণা আহোরণের আসল বেসক্যাম্প উক্ত জায়গাটি নয়। তবে সেসব জটিল বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো আমাদের কাজ নয়। আমি আর আপনি প্রাণ ভরে দেখবো রাস্তাটুকু। দেখবো রাস্তার চারপাশ। তাকিয়ে থাকবো দিগন্তজোড়া শৃঙ্গগুলিকে। দিনান্তে এককাপ গরম ‘লেমন-জিঞ্জার-হানি’-তে চুমুক দিতে দিতে দেখবো পাহাড়ের সারির পেছনে ডুবতে থাকা লাল সূর্যকে।
আকাশছোঁয়া অন্নপূর্ণার দেশে
ফেওয়া তালের পাড়ে, একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে বসে পড়লেন এক ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে। উইলো গাছের আড়াল থেকে তখন আপনি দেখছেন, সমগ্র হ্রদের জল জ্বলজ্বল করছে সোনালি আলোয়।
ফেসবুকে আর ইন্সটায় একগাদা ট্র্যাভেল স্টোরি আর রিল দেখার পর হঠাৎ একদিন আপনারও ইচ্ছে হল। আপনিও যেতে চান। নিজের চোখে দেখতে চান সবটা। অগত্যা দশদিনের ছুটি ম্যানেজ করার জন্য অফিসের বসের কাছে কান্নাকাটি। শেষে রক্তচক্ষু বস কয়েকদিনের মাইনে কেটে ছুটিটা মঞ্জুর করেই দিলেন। তবে মনে রাখবেন, ঝাড় খেয়ে অফিস কামাই করতে হলে সব থেকে ভালো সময় অক্টোবর। নীলের ব্যাকড্রপে সাদা শৃঙ্গগুলো সব থেকে স্পষ্ট দেখা যায় এই সময়েই। গ্রীষ্মেও আসতে পারেন। মার্চ-এপ্রিলে দেখবেন ফুল ফুটেছে অসংখ্য। বিশেষ করে রডোডেনড্রন। তবে এই সময়টা আবহাওয়া নিয়ে একটু সংশয় থেকেই যায়।
অবশেষে আজ সেই বিশেষ দিন। সকালের মিথিলা এক্সপ্রেসে আপনার পা পড়েছে রকসৌলে। স্টেশন থেকে বেরুতেই কোনও এক সহৃদয় টাঙ্গাওয়ালা আপনাকে তুলে নিয়েছে টাঙ্গায়। নাম মাত্র ভাড়ায় পার করে দেবে বর্ডার। এই সময়েই টুক করে ভারতীয় নোট বদলে নেপালি নোটের তাড়া গুনে নিলেন ভালো করে। একটা মোড়ে এসে টাঙ্গাওয়ালাই আপনাকে তুলে দেবে পোখরাগামী কোনও একটি শেয়ার গাড়িতে। গাড়ি ছাড়ার আগেই আরেক সহৃদয় এসে আপনাকে নেপালের একটি ট্র্যাভেল সিমও দিয়ে দেবে অল্প কিছু টাকায়। ব্যাস! এর পর কানে হেডফোন গুঁজে কিংবা হাঁ করে ঘুমাতে ঘুমাতে লেকসাইড পৌঁছে গেলেন বিকেলে। হোটেলের রুমটা তো ছুটি কনফার্ম হওয়ার দিনই বুক করে রাখা ছিল। পরিচিত এক বন্ধুর সুবাদে গাড়িও ঠিক করা রয়েছে আগেই। ইতিমধ্যেই কথা হয়ে গিয়েছে গাইড ভাইয়ের সঙ্গে। তিনি থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছেন প্রতিটি জায়গায়। তার সঙ্গে দেখা হবে পরদিন সকালে, ঝিনু যাওয়ার রাস্তায়। ট্রেকের পারমিটটাও আপনি করে নিয়েছিলেন বাড়ি বসেই। তাই আপাতত বিশেষ কাজ নেই। একটু ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ফেওয়া তালের পাড়ে, একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে বসে পড়লেন এক ঠোঙা ঝালমুড়ি নিয়ে। উইলো গাছের আড়াল থেকে তখন আপনি দেখছেন, সমগ্র হ্রদের জল জ্বলজ্বল করছে সোনালি আলোয়। আশেপাশের সব দোকানগুলিতেই ‘বিশেষ’ পানীয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। আপনার একটু ইচ্ছে হল বটে, কিন্তু হাঁটার দিনগুলোয় সুস্থ থাকতে হবে ভেবে সংযত করে নিলেন নিজেকে। আলো পড়ে আসতেই আবার হোটেল অভিমুখে যাত্রা। পথে একটি দোকান থেকে চিজের অপরূপ সুবাস আসছে। ঠিক করে ফেললেন, আজ ডিনারটা পিৎজা খেয়েই সারবেন।
ডোভান যাওয়ার রাস্তায় মছপুচ্ছারের এক ঝলক
সকাল সাতটার মধ্যে ড্রাইভার ভাই হোটেলের পার্কিংয়ে গাড়ি পার্ক করে ফেলেছেন। আগের রাত্রে জলদি ডিনার করে আপনি ঘুমিয়েছেন জলদি। ড্রাইভার ভাই আসতে আসতে আপনিও প্রস্তুত। চা জলখাবারটা রাস্তায় সারবেন ভেবে বেরিয়ে পড়া হল। লেকসাইড গাড়ি একটু এগিয়ে একটা মোড় নিতেই আপনার চক্ষু চড়কগাছ! হাইওয়ে থেকে দূর দিগন্তে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অন্নপূর্ণা ম্যাসিফ! এ শুধু নেপালেই সম্ভব। দৃশ্য উপভোগ করতে করতেই গাড়ি একটা জায়গায় থামল অল্প সময়। ড্রাইভার ভাই জানালেন, এটি গাইড ভাইয়ের পাড়া। তিনি অপেক্ষা করছিলেন গাড়ির জন্য। আবার গাড়ি চলতে শুরু করেছে। পরের ব্রেক নয়াপুলে। গাইডভাই আপনার পারমিট নিয়ে ন্যাশনাল পার্কের চেকপোস্টে এন্ট্রি করতে গিয়েছেন। সেই সুযোগে আপনি একটু চা আর সেল রুটি খেয়ে নিলেন। চমৎকার স্বাদ! পিঠে গোছের। এরপর গাড়ি এসে থামল আক্ষরিক অর্থেই রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে। আর কোনও দিকে গাড়ি যাওয়ার রাস্তা নেই। আপনার মতো আরও অনেকে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। জায়গাটির নাম ঝিনুদাঁড়া। এবারেই শুরু হতে চলেছে আপনার হাঁটুর অগ্নিপরীক্ষা।
আরও পড়ুন: এই রুটে আর যাবো না
মিটার শয়েকের একটা কেবল ব্রিজ ক্রস করার পরেই শুরু হল সিঁড়ি আর সিঁড়ি ভেঙে চড়াই। আপনি মনে মনে ভাবছেন তখন, “হে ঈশ্বর! ব্রহ্মাণ্ডে কি এই সিঁড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই!” তবে হাঁটার প্রথমদিনটা ঈশ্বর আপনার উপর একটু সদয়। “ঔর পাঁচ মিনিট” বলতে বলতে আপনাকে গাইড ভাই দেড় ঘণ্টার চড়াই চড়িয়ে ফেলেছেন। চোমরঙের হোমস্টে থেকে বিকেলে তখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন মাছের লেজের মতো দেখতে মছপুচ্ছারে, হিনচুল্লি ও অন্নপূর্ণা সাউথ। দিনের আলো নিভে আসছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট্ট আলোর দিকে আঙুল দেখিয়ে গাইড ভাই বললেন ওইটা সিনুয়া। পরেরদিনের লাঞ্চ পয়েন্ট। চড়াই আন্দাজ করে আপনার হাঁটু একটু কেঁপে উঠল বটে। কিন্তু এখন আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই।
একটা কেবল ব্রিজ ক্রস করার পরেই শুরু হল সিঁড়ি আর সিঁড়ি ভেঙে চড়াই। আপনি মনে মনে ভাবছেন তখন, “হে ঈশ্বর! ব্রহ্মাণ্ডে কি এই সিঁড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই!”
দেওরালির পর U আকৃতির উপত্যকা
এরপর দিনগুলোর রুটিন একই। সকালে উঠে স্যাক কাঁধে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়া। সিঁড়ি সমস্যা সল্ভ করতে করতে একটি পাহাড়ি নদীকে ডান পাশে রেখে এগিয়ে চলা সামনের দিকে। জঙ্গলে ঘেরা সবুজে আবৃত রাস্তা। সিনুয়া, ব্যাম্বু পেরিয়ে পরের রাত্রিবাস ডোভান। জঙ্গলের মাঝে গুটিকয়েক হোমস্টে। এক পাশে উঠে গিয়েছে খাড়া পাহাড়। যার উপরের অংশ দিনের অধিকাংশ সময় ঢেকে থাকে মেঘে। মাছের লেজের মতো চূড়াটি উঁকি দেয় মাঝেমাঝে। সারাদিন সিঁড়ি ভাঙার পর তাড়াতড়ি ডিনার করে শুয়ে পড়লেন। সারাদিনের ক্লান্তির পর খরস্রোতা নদীর শব্দে ঘুম আসতে একটুও দেরি হয় না।
মছপুচ্ছারে বেসক্যাম্প থেকে (বাঁদিকে) অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প থেকে মছপুচ্ছারের উপর সূর্যাস্তের আলো (ডানদিকে)
তৃতীয় দিনের রাস্তা ডোভান থেকে দেউরালি হয়ে মছপুচ্ছারে বেসক্যাম্প। দেউরালির পরেই ফুরিয়ে আসবে পাহাড়ি জঙ্গল এবং সিঁড়ি। ইংরেজি ‘ইউ’ আকৃতির উপত্যকা ধরে নদীটিকে ডানহাতে রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন উপত্যকা ধরে। মছপুচ্ছারে বেসক্যাম্প পৌঁছাতে পৌঁছাতে আলো নিভে আসছে। দূরে একটি হোমস্টের আলো দেখা যাচ্ছে। অসম্ভব ক্লান্তির মধ্যে সেই আলো ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না আর। নিঃশব্দ সঙ্গী গাইড ভাই তখন একবার আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন আকাশের দিকে। চাঁদ উঠেছে, তার ঠিক নিচেই বিশালাকৃতি মছপুচ্ছারে শৃঙ্গ ঢেকে দিচ্ছে অর্ধেক আকাশ। চাঁদ ও তারাদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। শরীরের ক্লান্তি একটু একটু করে শুষে নিচ্ছে হিমেল বাতাস।
ইংরেজি ‘ইউ’ আকৃতির উপত্যকা ধরে নদীটিকে ডানহাতে রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন উপত্যকা ধরে। মছপুচ্ছারে বেসক্যাম্প পৌঁছাতে পৌঁছাতে আলো নিভে আসছে। দূরে একটি হোমস্টের আলো দেখা যাচ্ছে। অসম্ভব ক্লান্তির মধ্যে সেই আলো ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না আর। নিঃশব্দ সঙ্গী গাইড ভাই তখন একবার আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন আকাশের দিকে।
অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প থেকে মাউন্ট অন্নপূর্ণা
চতুর্থ দিনে, পাহাড়ি ঘাস জমির হালকা চড়াই পেরিয়ে মছপুচ্ছারে বেসক্যাম্প থেকে অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পের দূরত্ব মাত্র তিন কিলোমিটার। তবে এই ছোটো রাস্তাটির জন্যই এত পরিশ্রম। মাউন্ট মছপুচ্ছারেকে পেছনে রেখে আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন দৈত্যাকৃতি অন্নপূর্ণা সাউথের দিকে। কিন্তু বিস্ময় তখনও বাকি। অন্নপূর্ণা সাউথের কোলে ছোটোছোটো লাল-নীল ছাদগুলি যখন আপনার দৃষ্টিগোচর, ডানদিকের সুবিশাল প্রাচীরটির দিকে চোখ পড়ল প্রথমবারের জন্য। এটিই অন্নপূর্ণা। উচ্চতা, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮০৯১ মিটার। সেদিনটা অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্পে কাটিয়ে পরদিন আবার নেমে আসা একই রাস্তায়। যাওয়া আসার পথে আপনি একা অনুভব করেননি এক মুহূর্তের জন্যও। দেশ-বিদেশের একাধিক সহযাত্রীর দেখা পেয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন। অন্যের অভিজ্ঞতা শুনেছেন। ক্যামেরাবন্দি করেছেন সহস্রাধিক ছবি। ওয়াইফাই পেয়ে আপলোডও শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। কিন্তু কী যেন একটা অনুভূতি… প্রকাশ করতে পারছেন না কিছুতেই। উপলব্ধি করেছেন সবটাই কিন্তু সেই উপলব্ধিকে ভাষার ছকে ধরাতে পারছেন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি দেখে অন্য বন্ধুরা উদ্বুদ্ধ হয়েছে বেশ। তারাও যেতে চাইছে পরের মরশুমে।
সবার মুখে একটাই প্রশ্ন, “সামনামানি কেমন লাগে রে?”
আপনারও উত্তর সংক্ষিপ্ত, “ঘুরে আয় না! দেখে আয় নিজের চোখে।”
অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প
কীভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে আকাশপথে কাঠমান্ডু হয়ে পোখরা এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে পারেন। অন্যথায় কাঠমান্ডু থেকে বাস শেয়ার গাড়িতে পোখরা পৌঁছানো যায়। ট্রেনপথে হাওড়া থেকে মিথিলা বা রকসৌল এক্সপ্রেস ধরে বর্ডার পার করে বীরগঞ্জ। সেখানে বাস এবং শেয়ার গাড়ি পাওয়া যায়।
পোখরা থেকে অন্নপূর্ণা বেসক্যাম্প আরো অন্যান্য ট্রেকের জন্য প্রচুর ভালো এবং বিস্বস্ত এজেন্টরা আছেন। যাওয়া আসার গাড়ি এবং গাইডের ব্যবস্থা তারাই করে দেন। নিজে স্যাক বইতে না চাইলে পোর্টারের ব্যবস্থাও হয়। খরচ সাশ্রয় করতে চাইলে পারমিট, গাইডের ব্যবস্থা নিজেই করে নেওয়া যায়। তবে নবাগতদের অভিজ্ঞ কারও সাহায্য নেওয়াই বাঞ্চনীয়। বয়স এবং কোনও শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাঁটার ধকল নিতে না পারলে পোখরা থেকে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা আছে। তবে তা অত্যন্ত খরচ সাপেক্ষ।
বড়ো দলের সঙ্গে ট্রেকে গেলে কলকাতা থেকে যাতায়াত, পোখরায় থাকাসহ ট্রেকের আনুমানিক খরচ বর্তমানে মাথাপিছু ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ভারতীয় টাকা। একা বা দুজনে যেতে চাইলে আরও দশ থেকে পনেরো হাজার বেশি খরচ হতে পারে।
______________
ছবি: লেখক
