
ছয়জন বাঙালি নারীর পর্বত-অভিযানের গল্প
ছবিটি হয়তো সময়ের সঙ্গে অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে, কিন্তু ছবির তরুণীদের আত্মবিশ্বাসী হাসি আজও উপেক্ষা করা কঠিন।তারিখটা ১৯৬৮ সালের ৬ নম্ভেম্বর, বাংলা দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত, এই ছবিটিতে ১১ জন বাঙালি মহিলার একটি দলকে দেখানো হয়েছে, যাঁরা গঙ্গোত্রী হিমবাহে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণ সম্পূর্ন করে কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। ফিরে এসেছিলেন আরও কঠিন দুঃসাহসিক কাজের প্রস্তুতিতে।

মোটামুটি দুই বছরের পরে, ওই মহিলাদের মধ্যে ছ’জন আবারও অভিযানে রওনা হন। গন্তব্য হিমাচল প্রদেশের লাহৌল অঞ্চলের একটি নামহীন চূড়া। ২০,১৩০ ফুট (৬,১৩৫ মিটার) উঁচু, সেই চূড়াটিতে যখন তাঁরা পা রাখেন তখনও পর্যন্ত অজানাই ছিল এর উচ্চতা। দিনটি ছিল ১৯৭০ সালের ২১ আগস্ট। অভিযাত্রী দলের নেত্রী সুজয়া ঘোষ, দলের সদস্য সুদীপ্তা সেনগুপ্ত ও কমলা সাহা এই চূড়ায় পা রেখেছিলেন। তারাই এই চূড়ার নাম দিয়েছিলেন ‘ললনা’ (Lalana), বাংলায় যার অর্থ মহিলা।
বর্তমান সময়ে অনালোচিত থেকে গিয়েছে দুঃসাহসী নারীদের সেই গল্প। আজ প্রায় ৫০ বছরের পার হয়ে এসেও, নতুন কোনও অভিযান “ললনা”কে অতিক্রম করে যেতে পারেনি।
জানা যায়, তার পাঁচ দিন পরে ২৬ আগস্ট, সুজয়া এবং কমলা দুজনেই মারা যান। একটি উচ্চ-উচ্চতার বরফের স্রোতপ্রবাহে ভেসে যান তাঁরা। স্থানীয়ভাষায় এই স্রোতপ্রবাহটি ‘কারচা’ (Karcha) নামে পরিচিত। পরবর্তীতে সুজয়া ঘোষের মৃতদেহ উদ্ধার করা গেলেও কমলা সাহার কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এদিনের এই শক্তিশালী, অবিশ্বাস্য অভিযানের গল্প অনালোচিতই থেকে গিয়েছে।

১৯৮৩ সালে অ্যান্টার্কটিকে পা রাখার জন্য প্রথম দুই ভারতীয় মহিলার একজন ছিলেন সামিটর সুদীপ্তা সেনগুপ্ত। বছর দুয়েক আগে, তাঁদের আরোহণের পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে, একটি জাতীয় মিডিয়া-পোর্টালের সাক্ষাৎকারে সেদিনের স্মৃতিচারণা করেছিলেন৷ সেই দুঃসাহসী অভিযানের ছয়জন নারীর মধ্যে তিনিই একমাত্র যিনি এতদিন পর প্রকাশ্যে অভিযানের গল্পটি বলেছেন বলে জানা যায়।
অপরদিকে, সেদিনের মারণ দুর্ঘটনায় সুজয়া ঘোষ এবং কমলা সাহা মারা গেলেও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন, দলের আরেক সদস্য শেফালি চক্রবর্তী (পরবর্তীতে মুখার্জি)। বর্তমানে তিনি কলকাতায় নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করছেন। তাঁর ভাই শেখর চক্রবর্তী (Shekhar Chakraborty), একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এবং ভারতের ভেক্সিলোলজির (পতাকাগুলির বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন) একজন বিশিষ্ট অনুশীলনকারী। তাঁর বড়ো বোন কীভাবে শীর্ষস্থানীয় পর্বতারোহী হয়ে ওঠেন এবং কীভাবে তিনি সেদিন লাহৌলে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিলেন, সেই বিষয়ে অসংখ্য কাহিনি লেখেন।
৬০ এবং ৭০’এর দশক তরুণ স্বাধীন ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি এবং বিকাশের যুগ হতে পারে, কিন্তু সেসময়ের নিরিখে একজন মহিলা পর্বতারোহীর গল্পকে অবশ্যই একটি বিরল ঘটনা বলা চলে। “সেদিন আমাদের কলকাতার বাড়ি থেকে যখন আমার বোন শার্ট এবং ট্রাউজার পরে বের হয়েছিল, বেশ বড়োসড়ো আলোড়ন তৈরি হয়েছিল, যা এখনও আমার মনে আছে,” হাসিমুখে বলেন শেখর চক্রবর্তী। অথচ সবটাই থেকে গিয়েছে বাংলার ইতিহাসের পাতায়। বর্তমান সময়ে অনালোচিত থেকে গিয়েছে দুঃসাহসী নারীদের সেই গল্প। আজ প্রায় ৫০ বছরের পার হয়ে এসেও, নতুন কোনও অভিযান “ললনা”কে অতিক্রম করে যেতে পারেনি।

সাক্ষাৎকারে সুদীপ্তা সেনগুপ্ত আরও জানান, ২০১৮ সালে আবারও এই অভিযানের প্রচেষ্টা করা হয়। কিন্তু ওই পথে অসংখ্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবশেষে মাঝপথেই বাতিল করতে হয় অভিযানটি। ১৮,০০০ ফুটও অতিক্রম করতে পারে না দলটি।
যে ছবিটি দিয়ে আমরা আজকের লেখাটি শুরু করেছিলাম, আবার সেখানে ফিরে যাওয়া যাক একবার। বামদিক থেকে ডানদিকে পরপর ব সে রয়েছেন – সুজাতা মজুমদার (Sujata Majumder), কল্পনা রায়চৌধুরী (Kalpana Roy Chowdhury), সুদীপ্তা সেনগুপ্ত (Sudipta Sengupta), সুতপা সেনগুপ্ত (Sutapa Sengupta), নীলা ঘোষ (Nila Ghosh), এবং বামদিক থেকে ডান দিকে যথাক্রমে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কমলা সাহা (Kamala Saha), শেফালি চক্রবর্তী (Shefali Chakraborty), স্বপ্না নন্দী (Swapna Nandi), অনুরাধা লাহিড়ী (Anuradha Lahiri), সুজয়া ঘোষ (Sujaya Ghosh)।
এই নামগুলি পর্বতারোহণের ইতিহাসে খুব পরিচিত হয়ে থেকে যায়নি ঠিকই কিন্তু তাঁরাই যে মহিলাদের জন্য আলোর পথ খুলে দিয়েছিলেন একদিন, তা হয়তো অজানাই থেকে গিয়েছে। সুদীপ্তা সেনগুপ্তের অভিযান প্রতিবেদনের এই পঙক্তিগুলি আজ চোখের সামনে যেন সেদিনের ছবিটা স্পষ্ট তুলে ধরে, “তখন ভোর ৫:৩০ নাগাদ, আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম একটি খাড়া বরফের প্রস্তর প্রান্তে, যার সামনে ছিল উন্মুক্ত শক্ত বরফ। এই জায়গাটি ছিল একটি তুষারপাত বিন্দু।” এটি ছিল ১৮,৩৭৩ ফুট, যেখানে পর্বতারোহীরা প্রায় উলম্ব শিলা-মুখে পাথর এবং বরফ সরিয়ে তাঁদের অভিযানের পথ তৈরি করছিল। তাঁরা যে সেদিন শুধুমাত্র একটা বাধা জয় করেছিলেন তাই নয়, পাশাপাশি নামকরণ করেছিলেন নতুন এক পাহাড় চূড়ার। সেদিনের এই ঘটনা যে প্রকৃতঅর্থেই দৃষ্টান্তমূলক একটি জয়ের গল্প, যা সারা ছড়িয়ে পড়া উচিৎ, একথা স্বীকার করতেই হয়।
প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে
