
২০০টি চিতল হরিণকে বল্লভপুর বনভূমি থেকে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে স্থানান্তরিত করা হল
শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী থেকে মাত্র এক কিলোমিটারের দূরত্বে অবস্থিত অগভীর বল্লভপুর বনভূমি। বনভূমি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটি ছোটো বড়ো জলাশয়। গ্রীষ্মের দুপুরে সেখানে জল খেতে আসে হরিণ ও শিয়ালের দল। শীতকালে ভিড় জমায় পরিযায়ী পাখিরা। ১৯৭৭ সালে বোলপুর শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই অভয়ারণ্যটির নাম বল্লভপুর ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি (Ballavpur Wildlife Sanctuary & Deer Park)। চিতল হরিণ ছাড়াও এখানে বাস করে কিছু কৃষ্ণসার হরিণ এবং একাধিক প্রজাতির শেয়াল।
সম্প্রতি একটি প্রে বেস অগমেন্টেশন প্রোগ্রাম-এর অংশ হিসাবে ২০০টি চিতল হরিণকে এই বল্লভপুর ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি থেকে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে (Buxa Tiger Reserve) স্থানান্তরিত করবার সিদ্ধান্ত নেয় পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগ। চিতল হরিণ বা অ্যাক্সিস ডিয়ারদের মূলত এশিয়ান দেশগুলিতেই দেখতে পাওয়া যায়। মাদি হরিণের তুলনায় মদ্দাগুলি হয় আকারে বড়ো, এদের মাথার উপর বাঁকানো শিং থাকতে দেখা যায়। এদের সোনালি রঙের দেহ জুড়ে দেখতে পাওয়া যায় অসংখ্য ছোটো ছোটো সাদা বুটি।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩-এ উৎক্ষেপিত হওয়া এই পশু স্থানান্তরিতকরণের বিষয়টিতে সম্প্রতি মত দেন রাজ্যের প্রধান বন সংরক্ষক, বন্যপ্রাণী এবং প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন (Principal Chief Conservator of Forests, Wildlife, and Chief Wildlife Warden, West Bengal)। ‘প্রে বেস অগমেন্টেশন’ নামের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে কোনো রিজার্ভ ফরেস্ট বা অভয়ারণ্যের ‘প্রে বেস’-কে শক্তিশালী করে তোলা হয়। কোনো বনভূমির ‘প্রে বেস’ কতটা শক্তিশালী, তার উপর নির্ভর করে যে সেখানে বসবাসকারী মাংসাশী প্রাণীরা কী পরিমাণ শিকার পাবে। একটি অভয়ারণ্যের ‘প্রে বেস’ই নির্ধারণ করে কত দ্রুত সেখানে বাঘ অথবা অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
এই বিশেষ ঘটনাটির ক্ষেত্রে হরিণদের আটক করবার জন্য প্রচলিত ‘বোমা’ পদ্ধতি অবলম্বন করে বনদপ্তর। এই পদ্ধতি অনুযায়ী, একটি ফানেলের আকৃতির বেড়া তৈরি করা হয়, যার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত করা হয় প্রাণীর দলকে। মূলত সবুজ নেট ও ঘাসের গালিচা দিয়ে এই ফানেল তৈরি করা হয়ে থাকে, যাতে বন্য প্রাণীদের মনে সন্দেহের উদ্রেক না হয়। ফানেলের অপর প্রান্ত আটকানো থাকে কোনো খাঁচা জাতীয় ঘেরাটোপের সঙ্গে। এই খাঁচা সমেতই তারপর ট্রাকে প্রাণীদের তুলে দেওয়া হয়।
এ বছরের ১১ মার্চ নাগাদ বল্লভপুর ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে ‘বোমা’ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে ১৬ মার্চ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ৮৬টি চিতল হরিণকে মোট তিনটি ট্রাকে তোলা হয়। ঘর্ষণজাত আঘাত থেকে তাদের রক্ষা করবার জন্য, ট্রাকের ভিতরের দিকের দেওয়ালগুলি ঢেকে দেওয়া হয় পুরু গদি দিয়ে। ৫৭০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে, অবশেষে ১৭ মার্চ দুপুর দুটো নাগাদ হরিণগুলিকে নিয়ে ট্রাক পৌঁছায় বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পে।

সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, ১৯০টি হরিণকে ইতিমধ্যেই বক্সার গহীন অরণ্যে মুক্ত করা হয়েছে। ট্রাক থেকে নামানোর সময়ে, যাত্রাপথের দুর্গমতার কারণে কিছু সংখ্যক হরিণকে আতঙ্কগ্রস্ত ও সামান্যরূপে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। যদিও তাদের সত্ত্বর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে বনদপ্তরের পক্ষ থেকে।
আশা করা যায়, এই পদক্ষেপের ফলে হরিণগুলি চলাফেরার জন্য বৃহত্তর বনভূমি পাবে। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের ‘প্রে বেস’ উন্নত হয়ে উঠবে। ফলত এখানে বসবাসকারী বাঘ ও অন্যান্য মাংসাশী প্রাণীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে।
