
তাদের পুজোর উপচারেও রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা
পরিবেশই ওঁদের ধ্যানজ্ঞান। প্রকৃতিকে দেখেন মাতৃরূপে। তাই জয়দীপ-সুচন্দ্রা কুণ্ডু দম্পতির কাছে পুজোর আচার মুখ্য নয়। মা ব্যাঘ্রবাহিনী রূপে তাঁদের দেবী আরাধনার মধ্যে মিশে থাকে বন্যপ্রাণ ও পরিবেশের চেতনা। হাতিবাগানের শতাব্দী প্রাচীন কুণ্ডুবাড়ি (Hatibagan Kundu Bari) এই মহতী উদযাপনে মেতে ওঠে শরৎ পার্বণের চারটে দিন।

প্রায় ১৬বছর আগে কুণ্ডুবাড়িতে শুরু হয়েছিল ব্যাঘ্রবাহিনী দুর্গা-র পুজো। সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের আগল ভেঙে সমাজের সব স্তরে আনন্দোৎসবের রং ছড়িয়ে দেওয়ার সেই শুরু। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই সাদর আমন্ত্রিত এখানে। প্রকৃতি আর মানুষের মেলবন্ধন হিসেবেই তাঁরা পুজোকে দেখতে চান। তাই সুন্দরবনের দক্ষিণ রায় হয়েছে মা দুর্গার বাহন।

ব্যাঘ্র সংরক্ষণ ও পরিবেশ রক্ষার বার্তায় জয়দীপ কুণ্ডু (Joydip Kundu SHER) এবং সুচন্দ্রা কুণ্ডুর বছরের ৩৬৫ দিন কাটে। অরণ্যজীবন, বন্যপ্রাণ নিয়ে তাঁর কাজ নিরন্তর। কিন্তু কোন ভাবনা থেকে মা ব্যাঘ্রবাহিনীর পুজো আয়োজন করা? সুচন্দ্রা কুণ্ডু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, হিমালয় কন্যা উমা একান্তই বাংলার ঘরের মেয়ে। প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর যোগ অচ্ছেদ্য। সেই দুর্গাকেই বিভিন্নভাবে খুঁজে বেড়িয়েছেন কুণ্ডু দম্পতি। কখনও লৌকিক, তো কখনও বনেদি বাড়ির দুর্গা, আবার কখনও বারোয়ারি দুর্গার খোঁজে তাঁরা ছুটে বেড়িয়েছেন। নানাভাবে দুর্গার খোঁজ ও সংরক্ষণ শেষে তাঁরা নিজেদের পুজো শুরু করার কথা ভাবেন। সুচন্দ্রা বলেন, “আমরা থিম পছন্দ করি না। একচালার সাবেকি সাজের প্রতিমা আমাদের।”
পুজোর উপচারেও রয়েছে পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা। কার্বন নিঃসরণ কম করতে পুজোতে বিভিন্ন জৈব, প্রাকৃতিক ও ভেষজ বস্তু ব্যবহার করা হয়। সুচন্দ্রা সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী- এই তিনদিনের নিরামিষ ভোগ নিজেই রান্না করেন। ছানার পাতুরি, আমড়া পোস্ত, লেবু পাতা দিয়ে ঘি ভাতের মতো বাঙালির বহু আগে হারিয়ে যাওয়া পদের দেখা মেলে এই তিনদিন কুণ্ডুদের বনেদিবাড়ির পুজো-তে।

পুজো যাতে সকলের হয়ে উঠতে পারে, সে জন্যও উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা। পুজোর সময় অরণ্য ও বন্যপ্রাণ এলাকায় বসবাসকারী প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষকে নতুন পোশাক দিয়ে সাহায্য করছেন বিগত কয়েক বছর ধরে। শুধু পোশাকের আয়োজন নয়, তার বাইরেও পুজোয় আমরা-ওরা’র তফাৎ দূর করতে চেয়েছেন। সুচন্দ্রা বলেন, “প্রতি বছর পুজোর একটা দিনে সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের প্রান্তিক সীমানায় বসবাসকারী প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শিশু ও কিশোর কিশোরীদের কলকাতার দুর্গাপুজো দেখাতে নিয়ে আসি। ভোরবেলা থেকে ওদের যাত্রা শুরু হয়। সারা সকাল ঘুরে দুপুরে ওরা আমাদের বাড়িতে ভোগ খেয়ে সুন্দরবন ফিরে যায়।”
তেমনিভাবে দশমীর সিঁদুরখেলায় সবার সঙ্গে সবাই মিলিত হন। ভেদ থাকে না সধবা-বিধবা, বিবাহিত-অবিবাহিততে। প্রকৃতঅর্থে সিঁদুর খেলা তখন হয়ে ওঠে খেলা ভাঙার খেলা।

