স্বাধীনতার ছাদ

ইন্দ্রাণী চক্রবর্তীর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ছাদ-এর রিভিউ

ছাদ বলতে কী মাথায় আসে? শৈশব নাকি রঙিন ঘুড়ি? দুপুরের চালতার আচার নাকি পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসা গানের রেওয়াজ? ছাদ মানে আসলে কি মুক্তি, স্বাধীনতা? ছাদ মানে অনেককিছুই। ব্যক্তিবিশেষে বদলাতে থাকে ছাদের সংজ্ঞা। কিন্তু সে ছাদ পায় কজন! যাদের ছাদ নেই, তাদের বেঁচে থাকাও যেন অর্ধেক। ইন্দ্রাণী চক্রবর্তীর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘ছাদ’ আসলে আমাদের প্রত্যেকের স্মৃতি রোমন্থন। আর মেয়েদের কাছে একরাশ খোলা হাওয়া। এই ছবির প্রধান চরিত্র মিত্রার কাছে ছাদ হয়ে ওঠে পূর্ণিমার আলো আর উপন্যাসের খসড়া শেষ করার একটা নিজস্ব জায়গা। মিত্রা মানে তো বন্ধুও, সুহৃদ। এই চরিত্রের স্বভাবেও তার ছাপ খানিক স্পষ্ট, খানিক অস্পষ্ট। বাঁধাধরাহীন একটা জীবনে বাঁচতে চায় সে, সকালে স্কুল আর সন্ধেয় সংসার ছাড়া তার বেঁচে থাকার সম্বল লেখালেখি, গঙ্গার ধার ঘেঁষে একা একা হাঁটা, পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখা আরও অনেক কিছুই। একজন পরিপূর্ণ লেখকের জীবন। পরিপূর্ণ বলা যায় কি? মিত্রার স্বামী বন্ধু হতে পারেনি, বরং বন্ধু হয়ে উঠেছে স্বামীর প্রাক্তন সহকর্মী। তিনিই মিত্রাকে উপন্যাস লেখার কথা বলেন। প্রথম উপন্যাস। কিন্তু মিত্রার লেখার জায়গা ওই ছাদটাই আর নেই। যৌথ পরিবার ভাগ হওয়াতে ছাদের সিঁড়িতে তালা ঝোলে। মিত্রার মুক্ত চিন্তার অবকাশও বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আবার একদিন খুব সাহস নিয়ে ছাদের দরজা খুলে ফেলে মিত্রা। উপন্যাসের দমবন্ধ করা চরিত্রগুলোও যেন প্রাণ পায়। তারপর আবার নদী, নৌকা, পাখি, পূর্ণিমার চাঁদ, ঘুড়ি…।

“আজ আর আমাদের ঘুম আসবে না, চলো
ছাদে দাঁড়াই
ছাদ কোথায় পাবো, আমাদের মাথার ওপর তো
আর দুজন ঘুমোচ্ছে। তার ওপরে আর একজনদের শোবার ঘর,
তার ওপর আর কারোর খাট-পালং পাতা; তারও ওপরে
আর দুজনের দাপাদাপি- এত সব পেরিয়ে
ছাদে উঠতে-উঠতে তো ভোর হয়ে যাবে
তার চেয়ে চলো, আকাশে গিয়ে দাঁড়াই”

ইন্দ্রাণী চক্রবর্তীর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘ছাদ’ আসলে আমাদের প্রত্যেকের স্মৃতি রোমন্থন। আর মেয়েদের কাছে একরাশ খোলা হাওয়া। এই ছবির প্রধান চরিত্র মিত্রার কাছে ছাদ হয়ে ওঠে পূর্ণিমার আলো আর উপন্যাসের খসড়া শেষ করার একটা নিজস্ব জায়গা।

জয় গোস্বামীর এই কবিতায় ছাদ হয়ে উঠেছিল আকাশ-সমান। যাদের ছাদ নেই, তাদের আকাশ আছে নিশ্চয়। খুঁজে নিতে হবে। মিত্রা গোটা ছবি জুড়ে সেই খোঁজাটাই জারি রেখেছে। মিত্রার অভিব্যক্তিতে কখনও রাগ, অভিমান, কখনও হাসি, চোখের জল। মিত্রার মনখারাপের সঙ্গী তখন আমরা প্রত্যেকে।

অত্যন্ত সাবলীল ও বাস্তবসম্মত পরিবেশন করেছেন ইন্দ্রাণী। মাত্রাতিরিক্ত কোনো অতিনাটকীয় নেই, অদরকারি সংলাপ নেই। ছিমছাম, সরল, স্বাভাবিক এবং সৎ। মিত্রার স্বভাবের মতোই। ছাদ ছবির পুরো মেজাজটাই ধরা রয়েছে মিত্রা চরিত্রের মধ্যে। দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই পোশাক, মোটা করে পরা কাজল আর এক্সট্রিম ক্লোজআপে ধরা ওর মুখের অভিব্যক্তি দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে চলে আসে ক্যামেরার কথা। শুভদীপ দে-র ক্যামেরার চোখ আমাদের আস্ত একটা ক্যানভাস দেখিয়েছে। গোটা ছাদের মধ্যে তৃপ্ত মিত্রার শুয়ে থাকা শুভদীপের ক্যামেরায় অতি-চমৎকার হয়ে ওঠে। ক্যামেরার ফ্রেম টপ শট থেকে গোটা শহরের স্কাইলাইন ধরতে ধরতে ছাদের বিস্তার বুঝিয়ে মিত্রার শুয়ে থাকা ক্রমশ ফোকাস করে মিড ক্লোজ-আপ থেকে এক্সট্রিম ক্লোজআপে চলে আসে, এই ছবির মূল গল্প গুরুত্ব পায় এখানেই। আবার ছবিতে ঘনঘন এক্সট্রিম ক্লোজআপ এমন ভাবে ফ্রেম করা হয়, যেখানে চরিত্র দৃশ্যের আধিপত্য বিস্তার করে। মিত্রা হয়ে ওঠে আমাদের কাছের কেউ।

ক্যামেরার ফ্রেম টপ শট থেকে গোটা শহরের স্কাইলাইন ধরতে ধরতে ছাদের বিস্তার বুঝিয়ে মিত্রার শুয়ে থাকা ক্রমশ ফোকাস করে মিড ক্লোজ-আপ থেকে এক্সট্রিম ক্লোজআপে চলে আসে, এই ছবির মূল গল্প গুরুত্ব পায় এখানেই।

মধ্যবিত্ত বাঙালি সংসারের চিরাচরিত ছবি বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক ইন্দ্রাণী। সেই পরিবেশের সঙ্গে মানানসই জয় সরকারের আবহ-সংগীত। অত্যন্ত সাবলীল ভাবে মিত্রা চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাওলি দাম, বিশেষ করে হঠাৎ পজ নেওয়ার দৃশ্যগুলো ওর চাপা কষ্ট আর দুঃখের মন্তাজ হয়ে উঠেছে এমন মাপা অভিনয়ে। মিত্রার স্বামীর চরিত্রে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ও দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করেছেন। ‘শিল্প আর শিল্পী এক নাও হতে পারে’ সংলাপটির মধ্যে পরিচালক যেভাবে শিক্ষিত মানুষের দ্বিচারিতা স্পষ্ট করে তোলেন, তা রাহুলের অভিব্যক্তিতে প্রাণ পায়।

শৈশব থেকে বার্ধক্য— ছাদ যেন একান্ত আড়াল, যেখানে অবসর থেকে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায় নিজের সঙ্গে। এই ছবিতে পরিচালক সেই কাজটিই ফুটিয়ে তুলেছেন সুচারুভাবে। খুব চেনা গল্প হয়েও কোথাও যেন অচেনাকে খুঁজে চলে ইন্দ্রাণী চক্রবর্তীর ছাদ।

_____ 
ছাদ (Chhaad – The Terrace) | চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: ইন্দ্রাণী | চিত্রগ্রহণ: শুভদীপ দে | সম্পাদনা: অমিতাভ দাশগুপ্ত | শব্দ: অনুপ মুখোপাধ্যায় | সংগীত: জয় সরকার | শিল্প: তপন শেঠ | প্রযোজনা: এনএফডিসি (NFDC)

Developed by DXDasia