রিভিউ : কারণ গ্রিস আমাদের দেশ না অথবা ব্লু-ব্ল্যাক ও ট্রান্সপারেন্ট হোয়াইট

ব্যাকরণহীন ভণিতাহীন একটি বাংলা ছবি

ধরা যাক, একটি বাড়ি। সেখানে কিছু লোকজন। ঘুরছেন, ফিরছেন, কথা বলছেন, খিস্তিখেউড় করছেন। সারাদিনে ঘটনাবলি যা যা ঘটছে, বাড়ির লোকজন শুধু সেভাবে রিয়্যাক্ট করছেন। সেই বাড়িতে থাকেন একজন ব্যর্থ চিত্রশিল্পী, যিনি মূলত ব্লু-ব্ল্যাক ও ট্রান্সপারেন্ট হোয়াইট রঙে ছবি এঁকে চলেন; একজন ব্যর্থ তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি বাধ্য হয়ে নিম্নমানের থ্রিলার বানাতে চান; একজন মধ্যবিত্ত চাকুরীজীবী, যিনি চাকরিতে প্রোমোশন জোটাতে পারেননি বলে ও আরও নানান কারণে স্বামীর সঙ্গে নিত্য ঝগড়া করেন। অর্থাৎ খুবই সাধারণ কয়েকটি চরিত্র। প্রত্যেকেই নিজেদের জীবনে হতাশ। এরকম সাধারণ কয়েকটি ছাপোষা চরিত্র নিয়ে নির্মিত হয়েছে একটি বাংলা ছবি। কারণ গ্রিস আমাদের দেশ না অথবা ব্লু-ব্ল্যাক ও ট্রান্সপারেন্ট হোয়াইট (Karon Greece Amader Desh Na Athoba Blue-Black O Transparent White)। বিচিত্র নামকরণ। শুনে মনে হতেই পারে কী না কী! কিন্তু সিনেমাটি দেখলে নামকরণের জটিলতার সঙ্গে মূল কাহিনির কোনো সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে না। চারপাশে যা দেখছি আমার আপনার বাড়িতে, সেগুলিই রয়েছে এই ছবির মূল কেন্দ্রে। গল্প প্রধান ছবি নয় এটি, এ ছবির ভিত দাঁড়িয়ে রয়েছে ট্রিটমেন্টে।

ঘটনাবলির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চরিত্ররা খুব স্বাভাবিক আচরণ করেন, অত্যন্ত মাপা তাঁদের অভিব্যক্তি ও চাহনি। বেশিরভাগ দৃশ্যের মাঝে কোনও কাট নেই, ক্লোজ শটের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে।

কোনো আবহ বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক (BGM) নেই এই ছবিতে। অযথা রাশভারী দৃশ্যও নেই। বরং নির্জন ফ্রেম, সূক্ষ্ম রঙের ব্যবহার এবং সম্পাদনা এই ছবির প্রাণ। গড়পড়তা সরলরৈখিক কাহিনিতে এই ছবির ক্যানভাসকে বাঁধা যাবে না। পরিচালক সুদীপ্ত লাহা প্রথম ছবিতেই ন্যারেটিভ ও গল্প বলার ঢংয়ে দক্ষতা দেখিয়েছেন।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে ২০১০ পরবর্তী সময়ের সিনেমায় শ্লথ গতি ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। যদিও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাঁদের নিজেদের মতো সিনেমা বানানোর রেওয়াজ জারি রাখলেও, ভারতীয় সমাজের দর্শক তা গ্রহণ করতে অক্ষম। একাধিকবার তা প্রমাণিত হয়েছে। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের মতো পরিচালক তাই এ-দেশে উদযাপিত হন না কিংবা ফিলিপিন্সের পরিচালক লাভ দিয়াজের ছবি দেখে বড়োসড়ো হাই তোলেন ভারতীয় দর্শক। গড়পড়তা সাজানো-গোছানো বাহারি চরিত্র আর সংলাপের ভিড়ে ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে ক্যামেরা আর রঙের সূক্ষ্ম ব্যবহার এবং তা নিয়ে আলোচনা, বরং বেশি করে জমকালো হয়েছে মেকআপ-কস্টিউমের আতিশয্য আর সাকসেস পার্টির ফোয়ারা। কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া, ফাঁপা, শূন্য। সুদীপ্ত লাহা ওঁর প্রথম ছবির ন্যারেটিভেই ব্যবহার করেছেন শ্লথ গতি, হয়তো গল্পের মেজাজ দিশা হারাচ্ছে, কিছু চাপিয়ে দেওয়া সংলাপ কানে আসছে, কিছু কিছু সময় মুখস্থ বলার মতো করে চরিত্ররা কথা বলে যাচ্ছেন একে অপরের সঙ্গে; ‘এতদ্সত্ত্বেও কারণ গ্রিস আমাদের দেশ না অথবা ব্লু-ব্ল্যাক ও ট্রান্সপারেন্ট হোয়াইট’ একটি রাজনৈতিক ছবি হয়ে উঠেছে অজান্তেই।

সামাজিক মাধ্যমে পরিচালক সুদীপ্তা লাহা বলেছেন, “আর্ট কী বা কেন? আর্ট অ্যাচিভ করার রাস্তাই বা কী? অ্যাচিভ করার পর? আদৌ কি আর্টের কোনো দরকার আছে? কোনো দায় আছে সোসাইটিকে বদলে দেওয়ার? প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে বরাবর। এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতেই এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে ফেলা। ৭-৮ বছরের চেষ্টায় অবশেষে সিনেমাটা বানিয়ে ওঠা গেছে।”

 

এই ছবি দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মাথায় আসে, মানুষকে কি শুধু গল্পই আকর্ষণ করে? সারাক্ষণ নীতিকথা আওড়ে না যাওয়া কিংবা নৈতিক দ্বিধার মধ্যে থাকা ব্যক্তির অবস্থান ও তাঁর পারিপার্শ্বিক সবকিছুর প্রতি একজনের দৃষ্টিভঙ্গি নজর কাড়ে না কেন? পরিচালক এখানেই প্রশ্নটা রেখে যান। নিজেই বলেন, তাঁর কাছে ‘ভালো’ সিনেমার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ম্যানিপুলেশান বর্জিত সিনেমা বানানো। ঘটনাবলির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে চরিত্ররা খুব স্বাভাবিক আচরণ করেন, অত্যন্ত মাপা তাঁদের অভিব্যক্তি ও চাহনি। বেশিরভাগ দৃশ্যের মাঝে কোনও কাট নেই, ক্লোজ শটের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। লংশটের ব্যবহারই এই ছবির গতিকে শিথিল করেছে। চোখ নির্দিষ্ট একটা কিছুর ওপর আবদ্ধ থাকছে না, চোখে পড়ে যাচ্ছে ওই পুরো অগোছালো সেটটাই। অর্থাৎ প্রায় সবকিছুই। বলা হচ্ছে আমাদের এই ঘটনাবহুল জীবনে যা যা ঘটছে তার সবটা দ্যাখো।

সিনেমার ব্যাকরণ মানেনি এই ছবি। একটি দৃশ্যে চরিত্র কোথায় দাঁড়াবে বা বসবে তারও কোনো নিয়ম খুব একটা চোখে পড়েনি। একজন চাকরি করবেন, কিন্তু রাজনীতির কারণে প্রমোশন আটকে যাবে। একজন ছবি আঁকবেন, কিন্তু তাঁকে কেউ চেনে না বলে গৃহবন্দি হয়ে থাকবে ছবি। একজন সিনেমা বানাবেন, কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির প্রযোজকের অভাবে গড়পড়তা ছবি বানিয়ে যেতে হবে তাঁকে। এসব তো রোজকার প্রশ্ন। আমার আপনার সবার। এখানেই সিনেমার প্রাসঙ্গিকতা। তবে পরিচালক কর্তৃক ছবির এহেন নামকরণ খানিক অহেতুক মনে হয় বৈকি!

________ 
কারণ গ্রিস আমাদের দেশ না অথবা ব্লু-ব্ল্যাক ও ট্রান্সপারেন্ট হোয়াইট
অভিনয়: কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য সেনগুপ্ত, তনুশ্রী চক্রবর্তী, গৌরব চ্যাটার্জি, রাজেশ্বরী পাল | কাহিনি-চিত্রনাট্য-সংলাপ-পরিচালনা : সুদীপ্ত লাহা | চিত্রগ্রহণ : উত্তরণ দে | সম্পাদনা : অনির্বাণ মাইতি | শব্দ : শিলাজিৎ চক্রবর্তী | রং : সৌমিত্র সরকার | শিল্প : সুভাষ সাহা | প্রযোজনা : অভিজিৎ নন্দী

Developed by DXDasia