গল্পের ছলে শিক্ষা : শিশুর পড়ার তালিকায় যে বইগুলো থাকা জরুরি

শিশুমনকে গড়তে গল্পের বইয়ের ভূমিকা

শিশুরা গল্প শুনতে ভালোবাসে। কী বই পড়বে বা তাদের পড়ে শোনাতে হবেই, সে কথা একটু বলি। আমাদের অর্থাৎ, বাংলা শিশুসাহিত্য-এর দিকে তাকালে খুঁজে পাই অমূল্য রতন।

শিশুদের জানতে হবে ‘রামায়ণ, মহাভারতের গল্প’। যা ভারতের এপিক বা মহাকাব্য। রামায়ণে রাম, সীতা, লক্ষণ, রাবণ, সূর্পনখাকে বাদ দিলে অনেক অনেক ছোটো গল্প খুঁজে পাই এখানে। রাবণের পুষ্পক রথ ওদের জানতেই হবে। তবে হয়েতো আজকের রাজনীতিতে কোনো দেশের প্রধানকে উড়িয়ে নিয়ে আসাটি তারা বুঝে উঠবে।

রাবণের পুষ্পক রথ ওদের জানতেই হবে। তবে হয়েতো আজকের রাজনীতিতে কোনো দেশের প্রধানকে উড়িয়ে নিয়ে আসাটি তারা বুঝে উঠবে।

সব সময় পড়ার বই রামায়ণ, মহাভারত। ছোটোদের নিয়ে বেড়াতে যাবেন। তার ইতিহাস ছোটোদের বলে দেবেন। ধরা যাক, অজন্তা-ইলোরা। ওদের এর ইতিহাসটি গল্পের মাধ্যমে জানাবেন। ওদের পড়াবেন ‘জাতকের গল্প’। ওদের কিনে দেবেন অবনীন্দ্রনাথের ‘নালক’। বেনারসে এসে নদীর ঘাটে তার গল্প বলবেন। পথ চলে চলে ঘুরে বেড়াবেন। বেনারসের অলিগলি গুলি ঘুরে দেখাবেন। পারলে ফিরে এসে সত্যজিৎ রায়ের ‘জয়বাবা ফেলুনাথ’ সিনেমাটি দেখাবেন। ওদের সঙ্গে একটা ডাইরি পেন্সিল বা পেন রাখতে বলবেন। যেখানে যেখানে সে যাচ্ছে তার নাম লিখে রাখবে। বিশ্বনাথের মন্দির তো দেখাবেন, তার সঙ্গে দেখাতে ভুলবেন না অন্নপূর্ণার মন্দির। বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় দেখাবেন ঘুরে ঘুরে। মনে হবে এক সাম্রাজ্য দেখছেন। বিশ্বনাথের মন্দিরের পাশে একটা মসজিদ আছে তা দেখাবেন। 

গল্পের মধ্যে তাদের জানাবেন কলকাতার ইতিহাস। পূর্ণেন্দু পত্রী-র কলকাতা নিয়ে ছোটোদের অনেক বই আছে, পারলে কিনে দেবেন। পারলে হাওড়া ব্রীজের তলায় ফুলবাজারটি দেখাবেন। সঙ্গে সঙ্গে বাজারের ইতিহাস গল্পের সাহায্য জানাবেন। ফুল প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ তা দিয়ে কীভাবে গহনা তৈরি হয় সেটিও বলবেন। নিজের বাড়িতে ফুলের গাছ থাকলে তা যত্ন নিতে শেখাবেন। পারলে বাড়ি এসে ‘ফুল বলে ধন্য আমি মাটির পরে’ রবীন্দ্রসংগীত শোনাবেন। গান, ছড়া, কবিতা, গল্প শোনাতেই হবে ছোটোদের।

 

উপেন্দ্র কিশোরের ‘ছেলেদের রামায়ণ’, ‘ছোটোদের মহাভারত’ পড়াবেন। আরও ছোটোদের ‘ছবিতে রামায়ণ’ আগে দেখাবেন পরে পড়ে শোনাবেন। বাড়িতে সুকুমার রায়ের ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ পড়ে শোনাবেন। বাচ্চাদের জটায়ু ও সম্পাতির গল্প, ইন্দ্রজিৎ-এর মেঘনাদ নামটি কেন হলো, সে যুদ্ধে কতটা পারদর্শী ছিল, সেতু নির্মাণে কাঠবিড়ালির ভূমিকা ছোটোদের জানতে হবে। হনুমান, বাঁদরের দল কীভাবে রামকে সাহায্য করল, তা তো জানতেই হবে। বাল্মীকি মুনির কাছে লব-কুশের বড়ো হওয়ার বিষয়টি ছোটোদের আনন্দ দেবে।

আজকাল শিশু মন নিয়ে অনেক আলোচনা হয় কিন্তু ওরা কী চায়, সে সম্পর্কে খুব একটা জানি না বা চেষ্টা করি না। শিশুরা চায় অনাবিল আনন্দ। বাবা মায়ের সঙ্গে গল্প করা।

ছোটোরা বীরের পূজারী। তাই যুদ্ধ, তির-ধনুক, গদার লড়াই পড়তে ওরা ভালোবাসে। মহাভারতের আঠারো দিনের যুদ্ধ ছোটোদের আনন্দ দেবে। তবে বিভূতিভূষণের ‘অপু’-র মতো মনের বাচ্চাদের কিন্তু কষ্ট হবে কর্ণের চাকা মাটিতে আটকে গেলে। তখন ওকে, ওর মনকে বুঝতে চেষ্টা করবেন। এইভাবে ছোটোদের মনে জন্ম নেবে এমপ্যাথি (empathy)। মহাভারতের কথা অমৃত সমান কিনা জানি না কিন্তু তার কথা ছোটো বয়স থেকে না জানলে বড়ো হয়ে একটু অসুবিধায় পড়তে হয়। কৃষ্ণের রাজনীতি ছোটো বয়সে ছোটোরা বুঝবে না, তারা আনন্দ পাবে ভীমের বক-রাক্ষসকে মেরে ফেলার দৃশ্যের কথা শুনে। ভীষ্মের শরসজ্জা ওদেরকে বিস্মিত করবে। শিশুর বিস্ময় না থাকলে ও তো বড়ো হয়ে ভাবতে পারবে না। মহাভারতে দুর্যোধনের হিংসা, শুকুনির পাশার দান দেওয়া ছোটোদের মনকে নাড়া দেবে। বুঝতে শিখবে হিংসা করে কোনো ভালো ফল পাওয়া যায় না; আজকের শিশুদের যা শেখা উচিত। মহাভারতে শেষ দৃশ্যে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে একটি কুকুর যাবে পথে। বলা হয় কুকুরটি ধর্ম ঠাকুর। এই ভাবে তারা সমব্যথী হয়ে পড়বে।

আজকাল শিশু মন নিয়ে অনেক আলোচনা হয় কিন্তু ওরা কী চায়, সে সম্পর্কে খুব একটা জানি না বা চেষ্টা করি না। শিশুরা চায় অনাবিল আনন্দ। বাবা মায়ের সঙ্গে গল্প করা।

________________ 
মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব

 

Developed by DXDasia