আমেরিকা থেকে শিলিগুড়ি, এইডস আক্রান্ত এবং যৌনকর্মীদের পাশে দাঁড়ালেন এই বিদেশিনী

নিজের কাজের জন্য শিখছেন হিন্দি, নেপালি ও বাংলা ভাষা

আমেরিকার তরুণী হেনা লারসন। বয়স মাত্র তেইশ বছর। কিছুদিন আগেই আমেরিকার সিয়াটেলে একটি কলেজ থেকে স্যোশিওলজিতে স্নাতক উত্তীর্ণ হয়েছেন। আগামীতে স্নাতকোত্তর স্তরে আরও পড়াশোনা করতে চান সিয়াটেলের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কিন্তু তার আগে এইডস এবং সামাজিক সমস্যা নিয়ে কিছু গবেষণাধর্মী কাজ করতে চান। সেই টানেই ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সুদূর আমেরিকা থেকে একাই উত্তরবঙ্গে চলে গিয়েছেন হেনা। শুরু হয়েছে তাঁর দিনরাতের কাজ। চলতি বছরের জুন মাসে সেই কাজ শেষ হবে। কাজ শেষ হলে নিজের দেশে ফিরে গিয়ে তাঁর গবেষণাপত্রে উত্তরবঙ্গের অভিজ্ঞতার কথা মেলে ধরতে চান।

হেনার বাবা গ্যারি লারসন, মা রুথা লারসন। দুজনেই ধর্মযাজক। দেশের মাটিতে বাবা-মাকে রেখে এসে হেনা মেতেছেন উত্তরবঙ্গের এইডস আক্রান্ত এবং যৌন কর্মীদের নিয়ে। কখনও তিনি এইডস আক্রান্তদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করছেন। আবার কখনও যৌনকর্মীদের পাশে থেকে শিখে নিচ্ছেন তাঁদের ভাষা। জানছেন তাঁদের সমস্যার কথা।

ক্যামেরায় মুহূর্ত বন্দি করে রাখতে চান হেনা 

উত্তরবঙ্গের নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান সীমান্তে প্রায়ই ঘুরছেন হেনা। নির্ভয়ে কথা বলে নিচ্ছেন ট্রাক চালকদের সঙ্গে। একা একটি মেয়ে, যে দেশে নির্ভয়ার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে, সেখানে সব ভয় ভুলে হেনা যৌনকর্মী ও তাঁদের গ্রাহকদের ভাব ধরার চেষ্টা করছেন। আবার সুযোগ বুঝে এইডস ঠেকাতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন তারও প্রচার করে যাচ্ছেন। কোথায় নৈতিকতা, কোথায় অনৈতিকতা সব দেখে বুঝে, সমাজের উপকার হয় এমন সচেতনতার প্রচারও করে নিচ্ছেন। যে এইচআইভি এইডস আক্রান্তদের কথা শুনলে তাদের অচ্ছ্যুৎ ভেবে বহু মানুষ দূর দূর করে, তাঁদের কাছ থেকে সরে যান, সেখানে হেনা সবার হাত মিলিয়ে একসঙ্গে ভাত খেয়ে নিচ্ছেন। ভয় করে না? হেনাকে প্রশ্ন করলে তাঁর স্পষ্ট জবাব, “কীসের ভয়? এরা কি মানুষ নয় নাকি? আর একসঙ্গে এদের সঙ্গে থাকলে, একসঙ্গে খেলে এইচআইভি ছড়ায় না। রক্তের সংস্পর্শে না এলেই হল।”

সবাইকে আপন করে নিয়েছেন এই বিদেশিনী 

একদিকে পাহাড়, একদিকে সমতল, চা বাগান, জঙ্গল-নদী – উত্তরবঙ্গের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেশ পছন্দ হয়েছে হেনার। এখানকার ভাষা, সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং একসঙ্গে সবাই মিলেমিশে থাকার প্রবণতাও বেশ পছন্দ হেনার। চা বাগানে গিয়ে তাই হেনা প্রত্যক্ষ করছেন আদিবাসী সংস্কৃতি, তাঁদের খাওয়াদাওয়া-সহ অন্য অনেক কিছু। 

মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটির মাধ্যমে হেনা উত্তরবঙ্গে এসেছেন। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ওয়েস্টবেঙ্গল ভলান্টারি হেলথ এসোসিয়েশনের সদস্যরা এবং বিশিষ্ট সমাজসেবী তরুণ মাইতি হেনাকে তাঁর কাজে সহায়তা করছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও হেনা অংশ নিয়ে নিজেকে একাত্ম করে তুলছেন। সম্প্রতি বাগডোগরার গোঁসাইপুরে ওয়েস্টবেঙ্গল ভলান্টারি হেলথ এসোসিয়েশন এইডস আক্রান্ত এবং যৌনকর্মীদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বনভোজন এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে হেনা তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের সংগঠক হিসাবেও তাঁকে দেখা যায়। হেনা বলেন, “এইডস আক্রান্ত বা যৌনকর্মীদের ছেলেমেয়েরাও মানুষ। এই শিশুরা যাতে নিজেদের বিচ্ছিন্ন মনে না করে, সেই জন্য প্রত্যেকের সঙ্গে অন্য সাধারণদের একত্রিত খেলাধূলার আয়োজন বিরাট মানসিকতার পরিচয় বহন করে।”

ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় নিজেও অংশগ্রহণ করছেন 

এইসব কাজের ফাঁকে ছবি তোলেন হেনা। ছবি তুলতে তিনি ভালোবাসেন। তাই যেখানে কাজে যাচ্ছেন গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে রাখতে ভুলছেন না। উত্তরবঙ্গে মহিলারা কোন সমস্যায় রয়েছেন, কেন তাঁদের অনেকে যৌন পেশায়, তার বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টাও করছেন হেনা। সব কাজ শেষ হলেই তিনি সেসব তথ্য নিয়ে গবেষণাপত্র তৈরি করবেন। আর এই গবেষণার কাজকে আরও সহজ করতে হিন্দি ও বাংলা ভাষাও শিখছেন এই বিদেশিনী। হিন্দি কিছুটা শিখেছেন, কিছুটা বলতেও পারেন। তবে বাংলা বলতে পারেন না। বাংলা বোঝার চেষ্টা করছেন। শেখার চেষ্টা করছেন নেপালিও। এখানকার মানুষের সঙ্গে আরও বেশি করে একাত্ম হতে হেনা স্থানীয় গানের সঙ্গে কখনও গলা মেলাচ্ছেন, কখনও নৃত্যেও অংশ নিচ্ছেন। আবার বিশ্ব এইডস দিবসের অনুষ্ঠানে পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেবের সঙ্গে ভাষণও দিচ্ছেন হেনা। এভাবেই হেনা কখন যে এই এলাকার মানুষদের প্রিয়জন বা অন্য এক নিবেদিতা হয়ে উঠছেন তা হেনাও বুঝতে পারছেন না। তবে জুন শেষ হলেই তাঁকে ফিরে যেতে হবে দেশে। হেনা বলেন, “আমাদের সিয়াটেলের এলাকাটিও ঠিক উত্তরবঙ্গের মতো। তাই শিলিগুড়ি ও তার আশপাশে ঘুরে কাজ করার সময় কখনোই মনে হচ্ছে না, সিয়াটেল ছেড়ে বাইরে আছি।”

Developed by DXDasia