
তথাগত ঘোষ তাঁর কাজের মাধ্যমে বারবার নিদারুণের উৎসবের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেন
‘বলি’-র আপাত অর্থ উৎসব। সেই উৎসব ব্যাখ্যা করা যেতে পারে দুইভাবে — দারুণের উৎসব এবং নিদারুণের উৎসব। তরুণ পরিচালক তথাগত ঘোষ তাঁর কাজের মাধ্যমে বারবার এই নিদারুণের উৎসবের বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলেন। সমাজের নেতিগুলো, ওঁর ছবিতে প্রতিবাদ হয়ে ধরা দেয়৷ বেঙ্গালুরু চলচ্চিত্র উৎসবে আমার সাম্প্রতিক দেখা ছোটো ছবি ‘ধুলো’ — যার ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছে ‘The Scapegoat’ অর্থাৎ ‘বলির পাঁঠা’। বলি তো মানুষেরই আবিষ্কার। সেই মানুষ তখন হয়ে ওঠে হর্তাকর্তাবিধাতা। যিনি ঘৃণা ছড়ান৷ যিনি নিজেদের মন্ত্রে সমাজটাকে বাঁধতে চান৷ যিনি ভালোবাসেন রক্ত আর জল্লাদের উল্লাস।
খুব উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, বিশ্বে যত ফ্যাসিস্ট নেতারা এসেছেন, তাঁরা মহিলাকণ্ঠটি বাঁধতে চেয়েছেন। মেয়েরা মানে এই, মেয়েরা এইটা করতে পারবে না, ওখানে যেতে পারবে না ইত্যাদির বিধান। সাম্প্রতিককালে আফগানিস্তানের চিত্র আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে৷ সেখানে তালিবানরা ঘোষণা করেছে মেয়েদের শিক্ষা নিষেধ, বাইরে বেরনো নিষেধ, পোশাক কীরকম হবে তা নিয়েও ফতোয়া জারি করেছে। আমাদের দেশের ঘটনাগুলো এত তীব্র না হলেও, প্রচুর গ্রামগঞ্জ আছে, যেখানে মেয়েদের অবস্থা শোচনীয়। তথাগতর ‘ধুলো’ ছবিতেও দুই মহিলা চরিত্র দেখা যায়। তাঁরা আর পাঁচটা মেয়ে বা গৃহবধূর মতোই দিনযাপন করতে অভ্যস্ত। কিন্তু একদিন তাঁদের ঘুম ভাঙে। তাঁরা স্বপ্নসন্ধানে বেরোন। তাঁরা রুখে দাঁড়ান। প্রতিবাদ করেন। আর এই প্রতিবাদ তখন হয়ে ওঠে দারুণের উৎসব। আমাদের মন তাঁদের কুর্নিশ জানায়, দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে ইচ্ছা করে।
তথাগতর ছবিতে মহিলারা অগ্নিকন্যা, যাঁরা পিতৃতন্ত্র আর ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। দুই মহিলা চরিত্রে দেখার মতো অভিনয় করেছেন পায়েল রক্ষিত এবং শিমলী বসু।
গত বেশ কয়েকবছর ধরেই ভারতবর্ষে ঘৃণার রাজনীতি ভয়ংকর আকার ধারণ ধরেছে। এক বিশেষ সংখ্যালঘু মানুষদের ধরে ধরে হুমকি আর অত্যাচারের সংখ্যা কত, তার সমীক্ষা দেখলে শরীর শিউরে উঠবে। তাছাড়া গার্হস্থ্য হিংসার শিকারে মেয়েদের ভয়াবহ অবস্থা তো আছেই। এখনও অনেক মহিলা রাস্তায় একা হাঁটতে ভয় পান। ঠিক এই জায়গা থেকেই ছবিটি এই সময়ের জন্য বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তথাগত ঘোষের পরিচালনা এবং চিত্রনাট্য বরাবরই মুগ্ধ করে৷ এখানেও তার অন্যথা হয়নি। তুহিন সাহার ক্যামেরা, আমির মণ্ডলের সম্পাদনা, অনিন্দিত রায় ও আদীপ সিং মানকির শব্দ পরিকল্পনা, অভিরাজ সেনের আবহ ছবিটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। প্রত্যেকটি চরিত্রের টানাপোড়েন, একটা চাপা টেনশন সবটাই সম্পাদনা এবং ক্যামেরায় সুন্দরভাবে উঠে আসতে সক্ষম হয়েছে। পায়েল রক্ষিত, শিমলী বসু, বিমল গিরির অভিনয়ের অভিব্যক্তি নজর কেড়েছে। বিশেষ করে বিমল গিরির চরিত্রে যে ঘৃণ্যতার তীব্রতা— খুব সুন্দরভাবে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। পায়েল রক্ষিতের চরিত্রে তিনি যখন সাইকেলে দুধ বিক্রি করতে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁকে দেখতে চমৎকার লাগে। ছবিতে আরও একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন আলি আক্রম। অন্যদের তুলনায় তিনি খানিক ম্লান। তাঁর চোখেমুখে খানিক শহুরে ছাপ, শরীরে জড়তা। এর থেকেও অনেক ভালো কাজ তিনি আগামীদিনে নিশ্চয় করবেন বলে বিশ্বাস।
আমার মতে, ‘ধুলো’ তথাগত ঘোষের ব্যক্তিগত রাগ ও ব্যথার প্রকাশ। ব্যক্তিগত অনুভূতি যখন শিল্পের মাত্রা পায়, তাতে কোনো অন্যায় থাকে না। ব্যক্তিগতকে সমষ্টিগত করে তুলতে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে হয়। সেই অনুভূতি যখন শক্তিশালী শিল্পের ভূমিকা পালন করে জনমানসে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে, সেখানে পরিচালক তথাগত ঘোষকে কুর্নিশ জানাতেই হয়। চলচ্চিত্রে অস্থিরতার চেয়ে দামি চরিত্র আর কি কিছু হয়? তথাগত ঘোষের ‘ধুলো’ সেখানে সফল।

