
ভাটির দেশের ভূমিকন্যারা এবার অন্য স্বপ্ন আঁকছেন
আজ থেকে প্রায় ছ’ দশক আগে সুন্দরবনে পটশিল্পের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু সময়ের গ্রাসে হারিয়ে যায় ভাটির দেশের অন্যতম এই ঐতিহ্য। শিল্পীরাও হারিয়ে যান অন্য পেশায়। কেমন ছিল সুন্দরবনের পট? কীভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে?
পাড় ভাঙা নদী। গা ঘেঁষে এবড়ো খেবড়ো রুখা কাদার স্তুপ। বর্ষা বাদলায়, ভিজলে আর চলার উপায় থাকে না। তখন পা ফেলতে হয় বাঘের মতো। পিছল মাটি আঁকড়ে চলতে হয় থাবা ফেলে। একটু এপাশ ওপাশ হলে আর রক্ষে নেই।
তবে এই পথকে ভয় পান না স্মৃতিকণা। স্মৃতিকণা মৃধা মণ্ডল। দয়াপুর গ্রাম থেকে রোজ এক ঘণ্টা হেঁটে আসেন ফেরি ঘাটে। নৌকায় পাখিরালয় রেঞ্জ অফিস। সঙ্গে দেড় বছরের ছেলে। কখনও কোলে, কখনও কাঁখে। আর কিছু কাগজ, রং, তুলি।
এই লম্বা পথটাতে এগুলোই তার বল-ভরসার রসদ। রঙের টানেই তো অন্য চোখে জীবন চিনতে শিখছে সে।
স্মৃতিকণা একা নন, ওঁর মতোই আরও চোদ্দো জন। পূজা সর্দার রায়, সুপর্ণা ঘরামী মৃধা এমন অনেক মুখ। গোসাবা, পাখিরালয়, দয়াপুর, দুলকি, সোনার গাঁ সংলগ্ন গ্রাম থেকে নিয়মিত আসতেন গোসাবা ব্লকের সজনেখালি রেঞ্জের অন্তর্গত পাখিরালয় রেঞ্জ অফিসে। তাঁদের কাছে এই অফিস ঘর যেন এক স্বপ্নের কারখানা, যেখানে স্বপ্ন গড়ার কাজ চলছে সারাদিন। ইস্কুলও বলা যায় স্বছন্দে।
‘কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ’ (Kolkata Society for Cultural Heritage) নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বন বিভাগের (Forest Department, Government of West Bengal) সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভ -এর যৌথ উদ্যোগে সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মহিলাদের বিকল্প পেশায় স্বনির্ভর করে তোলার প্রচেষ্টা চলছে। মাধ্যম রং তুলি আর ভাটির দেশের হারানো ঐতিহ্য-পট।
স্মৃতিকণাদের তুলির টানে ফিরছে সুন্দরবনের হারিয়ে যাওয়া পটশিল্প। আজ থেকে প্রায় ছ’ দশক আগে সুন্দরবনে পটশিল্পের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু সময়ের গ্রাসে হারিয়ে যায়। শিল্পীরাও হারিয়ে যান অন্য পেশায়। পটের ছবি বদলে গিয়ে বনবিবির পালা, যাত্রার চেহারা নেয়। সেই পটকেই ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
কেমন ছিল সুন্দরবনের পট? কীভাবে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে?

প্রশ্নের উত্তরে কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ-এর ফাউন্ডার ডিরেক্টর সৌরভ মুখোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন-কে জানালেন, “জাতীয় গ্রন্থগারে সুন্দরবনের পট সংক্রান্ত নথি, বই এই গবেষণার অন্যতম সহায়ক। তাছাড়া গ্রামের বর্ষীয়ান শিল্পীদের স্মৃতিও বড়ো ভরসা।”
পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর বা রাজ্যের অন্যান্য জায়গার পটের তুলনায় সুন্দরবনের পট অনেকটাই আলাদা। ফর্ম, মোটিভ, রঙের ব্যবহারেও। ছবির বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে এই ভূমির নিজস্ব সংস্কৃতির অনুসঙ্গ। জল, জঙ্গল, মনসা, বনবিবি, দক্ষিণ রায়, বাঘ, বাগদা সকলেই আছে।

টানা তিন ঘণ্টার ক্লাস। দুপুর বারোটায় শুরু তিনটেতে শেষ। বাড়ি ফেরার পথে ভয় অনেক, তাই সূর্য পাটে বসার আয়োজন করলেই ক্লাস শেষ।
আরও পড়ুন: সুন্দরবন – বাঘ-কুমিরের আপন দেশে
ঘরে ফিরে সংসারের দায়; সকাল থেকে রাত তাতে ফাঁক পড়ার এতটুকু জো নেই। ধান কাটার মরসুমে ভোর চারটের সময় উঠে মাঠে ধান কেটে, সংসারের হাজার এক কাজ সামলেও রং তুলির সামনে এসে বসেন ওঁরা। কারুর বাড়িতে অসুস্থ সন্তান, বৃদ্ধ মানুষ। বন্ধুর রাস্তা পাড়ি দিতে সাইকেল ছোটে। অনেক সময় খাওয়ার সময়টুকু মেলে না। ওঁরা কিন্তু ক্লান্তিহীন।

বাড়ির মানুষজনকে রাজি করিয়ে ওয়ার্কশপে আসা সহজ ছিল না। সংসারের কাজ যদি এক বেড়ি হয় তাহলে লোকচক্ষু, বৈষম্য, বাড়ির চাপ অবশ্যই আর এক কঠিন বেড়ি। কিন্তু কথাতেই আছে সাফল্য সব বদলে দেয়। প্রত্যন্ত সুন্দরবনের স্মৃতিকণাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কীভাবে? সে কথা পরে বলছি, তার আগে শুনুন অন্য এক জয়ের গপ্পো।
বাঘ আর কুমিরের সঙ্গে লড়াই করে যাদের বেঁচে থাকতে হয় প্রতিদিন তাদের অভিধানে ভয় শব্দটা থাকে না। তবু শুরুর দিকে বেশ ভয়-ই পেয়েছিলেন ওঁরা। দুলকির সুম্মা বৈরাগী, মধুশ্রী দাসরা। ওঁদের অনেকেই যে জীবনে প্রথমবার রং-তুলিতে আঙুল ছোঁয়ালেন! রঙের শিশি, তুলি সামনে থেকে জানা নেই। পট চর্চার পারিবারিক পরম্পরা তো অনেক দূরের ব্যাপার। বেজায় ঘাবড়েছিলেন প্রথম কয়েক দিন। যে হাত ধান কাটে, মাছ ধরে, জাল ফেলে সেই হাত কি কাগজে রং তুলির চলন সামলাতে পারবে? ওঁদের মাস্টারমশাই ভেবেছিলেন ‘কেন নয়?’। চেষ্টা করলেই সব হবে।

এই মহিলা স্বনির্ভর উদ্যোগের প্রশিক্ষক শিল্পী চিন্ময় মুখোপাধ্যায়। ওয়ার্কশপের ধরা বাঁধা গতের ক্লাসের পরিবর্তে শুরু থেকেই চেয়েছিলেন ডানা মেলুক নিজস্ব কল্পনা। স্মৃতিকণারা যেন নিজেদের চারপাশ আর দেখার চোখ দিয়ে ছবি চিনতে শেখেন। তিনি সেই পথে এগিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের।
ধৈর্য আর অধ্যাবসায় দিয়ে ধীরে ধীরে এক দল নতুন শিল্পীর জন্ম হয়েছে পাখিরালয় রেঞ্জ অফিসের ঘরে।

পটচিত্রের পাশাপাশি কাচের বাতিল বোতল, মাটির কাপ, ফুলদানি, টি-শার্টে ছবি আঁকেন। শিল্পদ্রব্য প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থাও আছে এই উদ্যোগে। আগামী বছরের গোড়াতেই হতে চলেছে চলেছে দুটি প্রদর্শনী। একটি সজনেখালি অপরটি কলকাতায়। দুটি প্রদর্শনীতেই উপস্থিত থাকবেন শিল্পীরা। তৃতীয় প্রদর্শনী নেদারল্যান্ডসে। সুন্দরবনের এই শিল্পীদের আঁকা পট ও শিল্প সামগ্রী আগামী আগমনীতে পাড়ি দেবে সেখানে। নেদারল্যান্ডসের একটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপ সেজে উঠবে ওঁদের শিল্পকর্মে। হবে বিশেষ প্রদর্শনী।

স্মৃতিকণা, নন্দিনীরা আয়লা দেখেছেন, আমফান দেখেছেন। নদীর রোষ নিত্য সঙ্গী। মীন, মধু আনতে গিয়ে কত মানুষ খোয়া গেছেন। সেসব দেখতে দেখতে অবাক হতে ভুলে গেছেন ওঁরা। তবু এবার ভরসা করতে শিখছেন রং তুলিকে। বাঘ কুমিরের সঙ্গে যুদ্ধে যোঝার বদলে বিকল্প পথ খুঁজছেন অন্য পথে বাঁচার। তাঁদের একের স্বপ্ন ছড়িয়ে যাচ্ছে বহুতে। ভাটির দেশের ভূমি কন্যারা এবার অন্য স্বপ্ন আঁকছেন।
ছবি সৌজন্য: চিন্ময় মুখোপাধ্যায়
[লেখাটি পুন:প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২৩-এ প্রকাশিত।]
