হাজার হাজার বিষ্ণুপুরি লন্ঠন দিয়ে সাজানো হল পাহাড়

জঙ্গল-পাহাড়ের মাঝখানে সারা ভারতের লোকসংস্কৃতির আশ্চর্য উদযাপন…

প্রথমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, মেলা শুরু হবে দুর্গাপুজোর ঠিক পরের অমাবস্যায়। তারপর কোজাগরী পূর্ণিমার দিন মেলা বসল। কিন্তু এই ব্যবস্থাটাও স্থায়ী হল না। এখন মেলা শুরু হয় প্রত্যেক বছর রাস পূর্ণিমার দিনে। পাহাড়ের ওপর জঙ্গলের কোলে জড়ো হন কয়েক লক্ষ মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে তো বটেই, সারা ভারতের নানান কোণ থেকে সাংস্কৃতিক দল মেলার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসে।

কথা হচ্ছিল সৃজন উৎসবের। এবছর যা ২৪ বছরে পা দিল। শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। পুরুলিয়ার একদল জোয়ান ছেলেমেয়ে ঠিক করেছিলেন দেশীয় সংস্কৃতির উদযাপন করবেন একটা মেলায়। তার জন্য দরকার একটা জায়গা, যেখানে অনেক অনেক মানুষ একসঙ্গে একাত্ম্য হয়ে যেতে পারে প্রকৃতির সঙ্গে। সাইকেল নিয়ে তাঁরা ঘুরে বেড়াতেন পাহাড়ে আর জঙ্গলে। তাঁরা মানে সৈকত রক্ষিত, গৌতম দত্ত, ইলা দত্ত, সত্য মুর্মু, দূর্বা মুখোপাধ্যায়, অনন্তলাল মাহাতোর মতো কিছু মানুষ। খরিদুয়ারার কুমারী নদীর পাশে টিলা আর জঙ্গলে ঘেরা জায়গাটা মনে ধরল তাঁদের। তিনখানা টিলার নাম রাখা হল মহেন্দ্র শিল্পপীঠ, চিত্রকূট শিল্পপীঠ আর কিষ্কিন্ধ্যা শিল্পপীঠ। ঠিক হল, মেলার প্রচারে কোনো পোস্টার বা দেওয়াল লিখন থাকবে না। মিছিল করে মানুষের কাছে গিয়ে বিলি করা হবে লিফলেট। প্রথম বছর মেলা বসল দুদিনের জন্য। হাজার হাজার বিষ্ণুপুরী লন্ঠন দিয়ে সাজানো হল পাহাড়। নানান রকমের জীবজন্তু, রাক্ষস, গাছ, ফুল, পাখির ছবি টিলায় টিলায় আঁকা হল। এদিকে প্রথম দিনই এমন জোর ঝড়বৃষ্টি শুরু হল যে টিলা থেকে নেমে মানবাজারের স্কুল ঘরে শেষ করতে হল অনুষ্ঠান। এখন দুদিনের বদলে তিনদিনের মেলা হয়। তবে জায়গাটা একই আছে – তিনটে টিলায় ঘেরা সৃজনভূমি।

সৃজন মেলা কিন্তু দিনের উৎসব নয়। সন্ধের থেকে শেষরাত পর্যন্ত অনুষ্ঠান চলে। দিনের বেলা সব কিছু শুনশান। উৎসব পরিচালনার জন্য প্রত্যেক বছর একটা কমিটি তৈরি করা হয়। অর্থের জোগান আসে সমমনস্ক লোকজনের কাছ থেকে। ন্যাশানাল বুক ট্রাস্ট, সাহিত্য একাডেমি, পূর্বাঞ্চল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানও সুবিধে মতো অর্থ সাহায্য করে। উদ্যোক্তারা নিজেরাও টাকা জমান, আশেপাশের মানুষের থেকে চাঁদা তোলেন। মেলাতে গরিব আদিবাসীদের স্টল থেকে কোনো ভাড়া নেওয়া হয় না। তবে সরকারি আর বহুজাতিক সংস্থাগুলো এই ছাড় পায় না। অস্থায়ী আখড়াতে পাতা খড়ের বিছানায় যে কেউ বিশ্রাম করতে পারেন। অতিথি, শিল্পী আর গ্রামের মানুষদের জন্য থাকে দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা। পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতের বিভিন্ন জায়গার লোকশিল্পী ছাড়াও শঙ্খ ঘোষ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের মতো সৃজনশীল গুণী মানুষদেরও উৎসবের মঞ্চ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। প্রতুল মুখোপাধ্যায় এই মেলার থিম সং-ও লিখে দিয়েছেন। সেই গান আর সৃজন মেলার অন্যান্য গানের একটা সংকলন বের করেছে এইচএমভি।

প্রত্যেক বছর মহেন্দ্র শিল্পপীঠ থেকে সন্ধেবেলা কয়েকটা বড়ো শিঙার আওয়াজে উৎসবের শুরু হয়। তারপর লোকশিল্পী, বিশিষ্ট অতিথি এবং অন্যান্য মানুষেরা কুমারী গ্রাম প্রদক্ষিণ করে উৎসব প্রাঙ্গণে ফিরে আসেন। মূল অনুষ্ঠান শুরু হয় এরপর। এবছর ২৩ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত চলেছে সৃজন উৎসব আর বাংলায় ভারত মেলা। তিন দিনে তিন লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছিলেন সেখানে। ছিল বিভিন্ন রাজ্যের দুর্লভ লোকশিল্পের অনুষ্ঠান, বাউল আখড়া, কৃষি প্রদর্শনী এবং আরও অনেক কিছু। আগামী কোনো বছর সৃজন উৎসবে যেতে চাইলে আপনাকে পুরুলিয়া স্টেশন থেকে যেতে হবে পুরুলিয়া বাসস্ট্যান্ড। বাস ধরে সোজা মানবাজার। সেখান থেকে চাপতে হবে বান্দোয়ানের বাসে। ঘন্টা দুয়েক পর খড়িদুয়ারা-কুমারীগ্রামে পৌঁছবেন। মেলায় পাবেন খড়ের বিছানা, কিংবা নিজেও তাঁবু খাটিয়ে নিতে পারেন আশেপাশে। মানবাজার কিংবা পুরুলিয়ার হোটেলেও থাকতে পারেন।

তথ্যসূত্র – ‘পুরুলিয়ার সৃজন উৎসব’, জলি বাগচী; ‘সৃজনমেলা’, অশ্বিনী দাশগুপ্ত

ছবি সূত্র – পার্থ দে এবং সুরমিতা কাঞ্জিলাল

Developed by DXDasia