সৌরভ ষড়ঙ্গীর তথ্যচিত্র ‘চর’, যেখানে মানুষের বেঁচে থাকা নদীর মর্জি নির্ভর

তথ্যচিত্র ‘চর’ – বুসান, বার্লিন, মস্কোর পর এবার দেখা যাবে কলকাতায়

সৌরভ ষড়ঙ্গী পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘চর’ (দ্য নো ম্যানস ল্যান্ড)-এর প্রথাগত কোনো গল্প নেই৷ আছে একটা নদী আর তার পার্শ্ববর্তী মানুষের বেঁচে থাকা যা কিনা নদীর মর্জি নির্ভর। নদীর গর্ভে তলিয়ে যাওয়া বহু বহু মানুষের স্বপ্ন যেন পরিচালকের দেখার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। নদীর চর ভাঙাকে কেন্দ্র করে তেমনই একটি জায়গা বেছে নিয়েছেন তিনি। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গী এবং তার পার্শ্ববর্তী গ্রাম। ২০১২ সালে ছবিটি জাতীয় পুরস্কারেও সম্মানিত হয়। সমাদৃত হয় বুসান এবং বার্লিনের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও।

‘চর’ আবর্তিত হয়েছে ১৪ বছর বয়সী এক ছেলে রুবেলকে কেন্দ্র করে। যে স্কুলে পড়াশোনা করতে চায়, কিন্তু আর্থিক পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করে পাচারকারী হতে। এই পাচারের মধ্যে পড়ে থাকে একটা নদী, আর দুই দেশ ভারত ও বাংলাদেশ। তার গ্রাম ঘিরে রেখেছে দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর দল। চর, যা কিনা আক্ষরিক অর্থে নেই মানুষের কিস্‌সা। প্রায় দশ বছর ধরে একটু একটু করে নির্মিত হয়েছে এই তথ্যচিত্র৷ ছবি নির্মাণের সময় ফারাক্কা বাঁধের দু-দিকের গ্রামগুলোতে ঘুরে বেরিয়েছেন সৌরভ। কখনও একটানা থেকেছেন চরের বাসিন্দাদের সঙ্গে, সাক্ষী থেকেছেন তাদের সুখ-দুঃখে৷ তারই ফসল প্রায় দেড় ঘণ্টার এই তথ্যচিত্র।

কিন্তু এমন একটি বিষয়কে তথ্যচিত্রের জন্য কেন বাছলেন পরিচালক? ‘বঙ্গদর্শন’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সৌরভ ষড়ঙ্গী জানাচ্ছেন, “তখন ‘ভাঙন’ নামে আরেকটা ছবি করছিলাম। মালদা–মুর্শিদাবাদে দীর্ঘদিন ধরে সেই কাজটা চলছিল। বিষয় ছিল, গঙ্গা-পদ্মার গতিপথ পাল্টে যাওয়া। অজস্র গ্রাম ভেঙে যাওয়া। এটার পিছনে একটা কারণ বললেন নদী বিজ্ঞানীরা। ফারাক্কা ব্যারেজ তৈরি হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। গতিপথ আটকে যাওয়ায় পলিগুলো জমতে জমতে নদীর খাদ অনেক উঁচু হয়ে যায় আর জলের পরিমাণ একই থাকে। ফলে বর্ষাকালে সেই জল উপচে পড়ে এবং বহু জায়গা ভয়ংকরভাবে ভেঙে যায়। তখন থেকেই বোঝার চেষ্টা করছিলাম, নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা আসলে কী!”

এরকম হাজার হাজার মানুষকে সৌরভ দেখেছেন, যাদের ভিটেমাটি হারিয়ে গেছে, চাষের ক্ষেত হারিয়ে গেছে। এমনকি মন্দির-মসজিদ জলের তলায় তলিয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে এবং লোকগুলোর কিছু করার নেই। “আমার একটা প্রশ্ন ছিল, এই মানুষগুলো যাবে কোথায়? ওরা আমায় বলেছিল, ‘আপনি চিন্তা করেন না দাদা। আমরা ঠিক থাকব।’ আসলে জমি কোথাও যায় না, যেখানে থাকার সেখানেই থাকে। যায় শুধু নদী৷ সে পাগলার মতো এদিক থেকে ওদিকে যায়। তখনই বুঝলাম প্রকৃতি কী বিচিত্র একটা জিনিস।” জানাচ্ছেন পরিচালক।

তখনই সৌরভ ঠিক করেন, চরে যাবেন। ওই অঞ্চলে দেশভাগের সময় সীমান্ত করা হয়েছিল খুব রাতারাতি এবং সেটা নদীর মধ্যিখানের অংশ ধরে। এই চর ওঠে নদীর মাঝখানে। স্থান মুর্শিদাবাদ, জলঙ্গীর উল্টোদিকে। এরকম অজস্র চর আছে দুই বাংলায়। আলোচ্য ছবিতে তার মধ্যে একটি চরকে দেখানো হয়েছে।

এই গ্রামেরই এক ছেলে রুবেল, ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র। যার সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথোপকথন চালিয়েছেন ক্যামেরার পিছনে থাকা পরিচালক স্বয়ং৷ সে যদি এই গল্পের নায়ক হয়, তাহলে খলনায়ক বলা চলে বহমান নদীকে। লাগাতার ভাঙনে প্রতিদিনই নদীগর্ভে চলে যায় আরও কিছুটা জমি, আশ্রয়হীন হয় আরও কিছু মানুষ। রুবেল এবং তার পরিবার এই ভাঙনেরই শিকার।

রুবেলদের গ্রাম আছে, বাড়ি আছে, চাষের জমি আছে। তবুও তারা ছিন্নমূল। কারণ কখন যে সব হারাতে বসবে তারা, নিজেরাও জানে না। রুবেল যখন মাত্র চার বছরের, নদীভাঙনে ওদের বসতবাড়ি, জমি সব হারাতে হয়েছিল৷ তারপর থেকেই ওরা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর, যার মালিকানা ভারত-বাংলাদেশ, কোনো দেশেরই নয়, যা কার্যত ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’, সেই বেওয়ারিস দ্বীপের বাসিন্দা তারা৷ ছবি নির্মাণের সময় রুবেলের বয়স ছিল ১৪ বছর৷ প্রায় বয়ঃসন্ধির সময়। রুবেলকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, একা থাকলে কী ভাবিস তুই, মেয়েদের কথা ভাবিস? রুবেল খানিক অস্বস্তিতে পড়ে, লজ্জা পায় এবং সরে যেতে চায়৷ কারণ আর পাঁচটা তরুণের মতো নয় সে। সে পড়াশোনা করতে চায়৷ বাড়িতে বাবা-মায়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই রোজ স্কুলে যায়৷ স্কুল ছুটি হওয়ার পর ভারি ভারি চালের বস্তা চাপায় ঘাড়ে। ওই চাল পরদিন ভোরে সীমান্তপার করে কালো বাজারে বিক্রি করে ঘরের জন্য নুন-তেল, শাক-সবজি খরিদ করে আনে৷ ওর বাবা অসুস্থ৷ রুবেলের বোনকে চরেরই একটি ছেলের সঙ্গে তড়িঘড়ি বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল ওরা৷ ছবিতে দেখানো হয়, সেই ছেলের বাড়ি থেকে এখন প্রচুর টাকা পণ চাইছে, তাই বোন বাড়ি ফিরে এসেছে।

ছবি নির্মাণের পর অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে৷ দেশ-বিদেশে নানা সম্মান পেয়েছে ‘চর’। প্রশ্ন জাগে, এখন কী করছে রুবেল? কেমন আছে আরেকটি বাচ্চা সোফি? উত্তরে পরিচালক জানান, “রুবেল এখন প্রেম করে বিয়ে করেছে। একটা ছোট্ট মুদির দোকান আছে। ওখান থেকেই সংসার চলে। আর সোফি একটা গ্যারেজে মেকানিকের কাজ করে। তাছাড়া ওই গ্রামগুলোর মানুষ মূলত চাষবাস নিয়েই থাকেন।”

পরিচালক সৌরভ ষড়ঙ্গীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে বন্যা হলে এলাকাবাসীদের জন্য তা ভালোই। বন্যা হলে জমিতে যে পলিটা পড়ে, তাতে খুব ভালো চাষ হয়। ওরা ভয় পায় ভাঙনকে। ভাঙন হলে জমিটাই চলে যায়। আর যারা চরে থাকে, তাদের জন্য একটা সুবিধার ব্যবসা হচ্ছে এখানকার জিনিস সীমান্ত পেরিয়ে ওই দেশে বিক্রি করা আর ওখানকার জিনিস এ বাংলায় নিয়ে আসা। এটাকেই আমরা স্মাগলিং বলি। কিন্তু নদী তো সীমানা বানায়নি। নদী সবসময় মানুষকে বলেছে আমার মধ্যে দিয়ে পারাপার করো। এইভাবেই তো সভ্যতা, সংস্কৃতি, সম্পর্ক, ব্যবসা-বাণিজ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সীমানা তৈরি হবার পর এইসব জিনিস পারাপারকে সমাজ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে৷ ফলে এরা ধরা পড়ে, গুলি খায়, মারা যায়। এভাবেই চলে এক একটা বিষাক্ত দিন।

‘চর’ দেখার সময় বারবার মনে পড়ছিল বিখ্যাত চিত্র পরিচালক কিম কি-দুকের উল্লেখযোগ্য ছবি ‘দ্য নেট’-এর কথা। যেখানে দেখানো হয়, এক দরিদ্র যুবক স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করছে। পেশায় সে একজন জেলে। একদিন তার জাল ইঞ্জিনে আটকে যায় এবং নৌকা ক্রমশ উত্তর কোরিয়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়াতে গিয়ে ডুবে যেতে থাকে। তাকে সন্দেহ করা হয় গুপ্তচর হিসেবে। পরিবারে ফিরে আসার জন্য মরিয়া চেষ্টা করলেও যুবক বুঝতে পারে জীবন কখনও এক পথে চলতে পারে না। এখানেও কিম কি-দুক দুই দেশের মাঝখানে বুনে দিয়েছেন একটা জাল। ‘চর’ তথ্যচিত্রেও নদী প্রধান চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছে, কিম কি’র ছবিতে যেভাবে ছিল একটা জাল। কীভাবে নদীকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন পরিচালক সৌরভ? উত্তরে তিনি জানাচ্ছেন, “নদী একটা প্রাকৃতিক ঘটনা। নদী না থাকলে সভ্যতা মরে যেত। আমার সঙ্গে নদীর কথা হত। আমরা একে অপরকে গল্প শোনাতাম। আসলে নদীকে আমি জীবন্ত একটা জিনিস ভাবি। কারণ সে প্রবহমান, তার স্থিরতা নেই। ওখানকার মানুষ নদীকে যেভাবে দেখে, আমিও ওদের চোখ দিয়ে নদীকে দেখার চেষ্টা করেছি। সেখানকার স্থানীয় মানুষরা নদীকে ঈশ্বর মানে। আমরা তো এভাবেই নদীমাতৃক হয়েছি। এই তথ্যচিত্রে আমি বলার চেষ্টা করেছি, জল হচ্ছে একটা ম্যাজিক। চোখে দেখতে না পেলেও তার মধ্যে কোটি কোটি জীবন কিলবিল করছে।”

নদীর সেই মধ্যিখানে চর জুড়ে সেইসব বেঘর মানুষজন — তাদের কথাই উঠে এসেছে এই তথ্যচিত্রে, যাদের ঠাঁই হয়েছে চর-এ, তারা যেন আর মানুষ নয়, প্রেতচ্ছায়া। নদী নিয়ে মানুষের রোমান্টিসিজমকেও প্রশ্ন করেছেন পরিচালক। এই ছবির সূত্রেই সৌরভ ষড়ঙ্গী সেরা পরিচালকের শিরোপা পেয়েছেন চিনে, ইন্দোনেশিয়ায় পেয়েছেন সেরার সম্মান, দুবাইতেও বিশেষ স্বীকৃতি, আর ভারতে পেয়েছেন রজত কমল। এছাড়াও জার্মানির ডক ফেস্ট, ভূপাল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ইউনিসেফ নেপাল-সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বিশেষ সম্মান।

‘চর’ দেখানো হয়েছে বুসান চলচ্চিত্র উৎসব, বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব, ইফি-গোয়া, দুবাই চলচ্চিত্র উৎসব, সিডনি চলচ্চিত্র উৎসব, আবু ধাবি ইন্টারন্যাশনাল এনভাইরোনমেন্টাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, মস্কো-সহ অসংখ্য নামী চলচ্চিত্র উৎসবে। কলকাতায় এই ছবি দেখা যাবে আবার। আগামী ১ অক্টোবর থেকে নন্দন ২-এ দুপুর ১:১৫-তে। বাংলা তথ্যচিত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়া সৎ, নির্ভীক এই ছবি পৌঁছে যাক আপনাদের দেখার লিস্টেও। সিনেমাহলে গিয়ে ছবিটি দেখুন। ভাবুন। সমালোচনা করুন। সেটাই হবে রুবেলের মতো চরের অসংখ্য মানুষের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

Developed by DXDasia