
রহস্য-নির্ভর বাংলা ছবির মহরৎ হয়েছিল সাহিত্যিক ও ছবি-নির্মাতা প্রেমেন্দ্র মিত্রের হাত ধরে
ভেতো বাঙালি, কিন্তু ভীতু নয়। অন্তত কল্পনা ও ভাবনার ক্ষেত্রে তো নয়ই। মনে মনে রহস্য ও অ্যাডভেঞ্চারকে ধাওয়া করার নেশা তার শিরায় উপশিরায়। আট থেকে আশি সকল বাঙালির কাছেই তাই গোয়েন্দা কাহিনি এবং গোয়েন্দা গল্প নির্ভর ছবি বরাবরই এক বিশেষ আকর্ষণ। রহস্য-নির্ভর বাংলা ছবির মহরৎ হয়েছিল প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও ছবি-নির্মাতা প্রেমেন্দ্র মিত্রের হাত ধরে। ১৯৫২ সালে মুক্তি পায় প্রথম বাংলা থ্রিলার (এ নিয়ে তর্ক আছে) ‘হানাবাড়ি’। জনতার বিচারে ‘হানাবাড়ি’ টিপিক্যাল গোয়েন্দা ছবি (Detective Cinema) না হয়ে উঠলেও গোয়েন্দা ছবির কিছু উপাদানে যে সমৃদ্ধ, তা বলা বাহুল্য। ‘হানাবাড়ি’-র পর মনে রাখবার মতো থ্রিলার ছবিটি হল উত্তমকুমার (Uttam Kumar) ও মাধবী মুখোপাধ্যায় (Madhabi Mukhopadhyay) অভিনীত ‘থানা থেকে আসছি’ (১৯৬৫)। পরিচালক: হিরেণ নাগ; মূল নাটক: ‘অ্যান ইনস্পেক্টর কলস্’ (নাটককার জে.বি. প্রিস্টলি)। কিন্তু এ দুটি ছবির কোনোটিতেই আমরা পেশাদার বা শখের ‘প্রাইভেট ডিটেকটিভ’ চরিত্রকে সেই অর্থে খুঁজে পাই না। গোয়েন্দা ছবির ধারাকে যিনি বাংলায় সর্বপ্রথম সফল ও জনপ্রিয় করে তোলেন তিনি আর কেউই নন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাণপুরুষ সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)। কথাসাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্ট ব্যোমকেশ বক্সীকেই সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রায়িত করেন ১৯৬৭ সালে। উত্তমকুমার অভিনীত ‘চিড়িয়াখানা’ ছবিটিকে তাই ধরা যায় প্রথম সফল গোয়েন্দা ছবি হিসেবে। এরপর নিজেরই সৃষ্ট গোয়েন্দা কাহিনির নায়ক ফেলুদাকে নিয়ে আসেন রূপোলি পর্দার আভিজাত্যের মোড়কে। ‘সোনার কেল্লা’ (১৯৭১) এবং ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ (১৯৭৯) বাংলা গোয়েন্দা ছবির ইতিহাসে কাল্ট হয়েই থেকে যাবে। ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় (Soumitra Chatterjee), জটায়ু চরিত্রে সন্তোষ দত্ত (Santosh Dutta) এবং তোপসে চরিত্রে সিদ্ধার্থ চ্যাটার্জীকে বাংলা ছবির দর্শকরা একরকম অমরত্বের আসনে বসিয়েছেন।

সোনার কেল্লা ছবিতে ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়
এরপর বাংলা ছবি নির্মাতাদের একটুও ভুল হয়নি বাঙালি দর্শকদের স্নায়ু বুঝে নিতে। রক্তমাংসের ছাপোষা বাঙালি গোয়েন্দারা রীতিমতো হয়ে উঠলেন প্রায় সুপারহিরো। ফেলুদা (Feluda), ব্যোমকেশ (Byomkesh), কাকাবাবুদের (Kakababu) মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। কারণ নম্বর যারা দেবেন তার একটা বড়ো অংশই তো ক্ষুদে দর্শক; তাদের খুশি করা তো মুখের কথা নয়! সঙ্গে বাজারে ভিড় জমালেন আরও সব গোয়েন্দারা। সোনাদা, শবর, শান্তিলাল, কিরিটি, গোগোল, পান্ডব গোয়েন্দা, গোয়েন্দা জুনিয়রেরা। বাবার রেখে যাওয়া ফেলুদার সঙ্গেই তো একরকম ঘর বেঁধে ফেললেন সন্দীপ রায়। ফেলুদা চরিত্রের নতুন মুখ হলেন সব্যসাচী চক্রবর্তী। টিভি সিরিজ ‘ফেলুদা ৩০’ (১৯৯৬-৯৭) থেকে শুরু করে ‘ডবল ফেলুদা’ (২০১৬) – একগুচ্ছ ফেলুদার ছবি তিনি উপহার দিয়েছেন দর্শককে।

চিড়িয়াখানা ছবিতে ব্যোমকেশ চরিত্রে উত্তমকুমার
ফেলুদার পাশাপাশি গোয়েন্দা ছবির যে ট্রেন্ড তৈরি করে ফেলেছেন দুঁদে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী, তা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার ধারা এখনও অব্যাহত। সত্যজিৎ রায় (‘চিড়িয়াখানা’, ১৯৬৭) থেকে শুরু করে মঞ্জু দে (‘শজারুর কাঁটা’, ১৯৭৪), ঋতুপর্ণ ঘোষ (Rituparno Ghosh) (‘সত্যান্বেষী’, ২০১৩), অঞ্জন দত্ত এবং অরিন্দম শীল – এঁরা সবাই ব্যোমকেশকে নিয়ে দর্শকের আগ্রহকে রীতিমতো বাড়িয়েই তুলেছেন। তবে ব্যোমকেশকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি নিরীক্ষা এখনো পর্যন্ত অঞ্জন দত্তই (Anjan Dutt) করতে পেরেছেন। মোট পাঁচটি ছবিতে ব্যোমকেশ চরিত্রকে একজন অভিনেতায় আটকে রাখেননি। আাবির চ্যাটার্জি এবং যিশু সেনগুপ্তকে পর্যায়ক্রমে কাস্ট করেছেন। অঞ্জন দত্তের পরেই ব্যোমকেশ প্রসঙ্গে যার নাম আসে তিনি হলেন অরিন্দম শীল। তবে শুধু ব্যোমকেশই নয়, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সৃষ্ট চরিত্র শবর এবং সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন মাসিকেও তিনি বড়োপর্দায় নিয়ে এসেছেন। শুধুমাত্র সিনেমাহল নয়, বাঙালির ডাইনিং টেবিলেও জায়গা করে ফেলেছিল অয়ন রায় পরিচালিত ও গৌরব চক্রবর্তী অভিনীত ‘ব্যোমকেশ’ ধারাবাহিকটি (২০১৪-১৫)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাঙালি পরিচালক বাসু চ্যাটার্জী পরিচালিত ও রজিত কাপুর অভিনীত ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ (১৯৯৩) নামের হিন্দি ভাষার ধারাবাহিকটিও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
ফেলুদা ও ব্যোমকেশের পর বেশি জনপ্রিয় গোয়েন্দা হয়ে ওঠেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সৃষ্ট কাকাবাবু চরিত্রটি। তপন সিনহা (‘সবুজ দ্বীপের রাজা’) থেকে শুরু করে পিনাকী চৌধুরী, সৃজিত মুখার্জিরা কাকাবাবুকে নিয়ে একাধিক ছবি করেছেন এবং সেগুলি বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছে।

মিশর রহস্য ছবিতে কাকাবাবুর চরিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়
তবে বেশিরভাগ ডিটেকটিভ ছবিতেই মেয়েদের অবস্থান কিন্তু অনেক পিছনে। প্রশ্ন ওঠে ফেলুদা কি ম্যাসকুলিন? নারীসঙ্গ থেকে তিনি শট হস্ত দূরে? ব্যোমকেশের স্ত্রী সত্যবতীর গুরুত্ব কি খাবার টেবিল পর্যন্তই সীমাবদ্ধ? মেধা এবং নারীকে একই পংক্তিতে রাখতে কোথাও দ্বিধা কাজ করেছে কাহিনিকার এবং ছবি নির্মাতাদের মনে? এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হতে পারে নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি উল্লেখ্য, সৃজিত মুখার্জির (Srijit Mukherjee) ‘মিশর রহস্য’ (২০১৩) ছবিতে দুই কিশোর-কিশোরীর চুম্বনদৃশ্যতে ট্যাবু লাগাতেও দুবার ভাবেনি বাঙালি দর্শকদের একাংশ। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এসময়ে দাঁড়িয়ে কতখানি আধুনিক হতে পেরেছি আমরা? তবু আশার বিষয় নারীকেন্দ্রিক গোয়েন্দা ছবির কথা আমাদের ছবি নির্মাতারা যে একেবারেই ভাবেননি তা নয়। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে আসে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহরৎ’ (২০০৩) ছবির কথা। আগাথা ক্রিস্টির ‘মিস মার্পেল’ (১৯৬২) উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবিতে বাংলা ছায়াছবির প্রথম মহিলা গোয়েন্দা রাঙা পিসিমাকে (রাখী গুলজার অভিনীত চরিত্র) হয়তো অনেকেরই মনে থাকবে। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা মিতিন মাসির কথাও কি ভোলা যায়? লেখিকা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের উপন্যাসের এই নারী গোয়েন্দাকে পর্দায় নিয়ে আসেন পরিচালক অরিন্দম শীল। মিতিন মাসির চরিত্রে কোয়েল মল্লিকের অভিনয় দর্শকদের নজর কেড়েছে। এ প্রসঙ্গে যে জনপ্রিয় ধারাবাহিকটির কথা না বললেই নয়, তা হল ইন্দ্রাণী হালদার অভিনীত ‘গোয়েন্দা গিন্নি’ (Goyenda Ginni)।

ফেলুদা যখন সব্যসাচী চক্রবর্তী
বাংলায় গোয়েন্দা ছবির নির্মাণ কিন্তু কম নয় এবং এই নির্মাণ থেমেও থাকেনি। হাল-আমলে ওটিটির হাত ধরে ফিরে এসেছে নবনির্মিত ব্যোমকেশ, যেখানে বক্সীবাবুর চরিত্রে অভিনয় করছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। পাশাপাশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে ‘একেন বাবু’ সিরিজ। এমনকি গোয়েন্দা-মেজাজের বাইরে বেরিয়ে এসে ঋত্বিক চক্রবর্তী অভিনীত ‘গোরা’ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ বুঝতে অসুবিধা হবার নয়, যে গোয়েন্দা ছবির দর্শক এবং প্রযোজক পরিসংখ্যানের দিক থেকে প্রথম সারিতে রয়েছেন। কিন্তু বাঙালির এই যে গোয়েন্দা গল্প ও গোয়েন্দা ছবির প্রতি প্রেম, তার কারণ কী?
অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “বাঙালির গোয়েন্দা গল্প-প্রীতি নতুন কিছু নয়। কী সাহিত্যে, কী ফিল্মে, বাঙালির কাছে গোয়েন্দা গল্প বা থ্রিলারের জনপ্রিয়তা চিরকালীন। যেহেতু বাঙালি বুদ্ধিমান জাতি, তাই তারা বই পড়তে পড়তে বা সিনেমা দেখতে দেখতে নিজেরাই গল্পের রহস্য সমাধান করতে থাকে। সেকারণেই গোয়েন্দা গল্পের জনপ্রিয়তা এত বাংলায়।”
একটি সমাজে কোনো বিশেষ সময়ে গোয়েন্দার আবির্ভাবের আর্থ-সামাজিক কারণ যাই থাক না কেন, বাঙালির গোয়েন্দা-রহস্যপ্রীতির উত্তর খুঁজতে লাইব্রেরি নয়, বরং বাঙালির বৈঠকখানা বা চায়ের ঠেকই উপযুক্ত ঠিকানা। একটি অপরাধ সংঘটিত হলে নানা মুনির নানান তত্ত্ব ও সমাধান সূত্র বিভিন্ন গোয়েন্দাসংস্থাকেও বোধহয় ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। কল্পনা ও জল্পনা-প্রিয় বাঙালির জটিল মাথা যে রহস্য ও তার সমাধানের ন্যারেটিভেই সর্বাধিক আকৃষ্ট হবে, তাতে আর বিরোধ কোথায়? একই ধরনের গোয়েন্দা ছবি দেখতে দেখতেও বাঙালির জীবনে কিন্তু একঘেয়েমি আসে না। একদিকে বোকা বোকা সিরিয়াল, অন্যদিকে মগজাস্ত্রে শান দেওয়ার মতো গোয়েন্দা রহস্য -এ দু’টিই বাঙালি সমানতালে উপভোগ করে। এই স্ববিরোধ নিয়েই তো বাঙালি বুদ্ধিমান জাতি! তাই গোয়েন্দা-রহস্য যুগ যুগ জিও।

দুই জনপ্রিয় ব্যোমকেশ – আবির চট্টোপাধ্যায় এবং যিশু সেনগুপ্ত

ওটিটিতে জনপ্রিয় একেনবাবু
বর্তমান সময়ে বাংলায় গোয়েন্দা ছবি নির্মাণের যে হিড়িক সে প্রসঙ্গে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্রবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, “বাঙালির গোয়েন্দা গল্প-প্রীতি নতুন কিছু নয়। কী সাহিত্যে, কী ফিল্মে, বাঙালির কাছে গোয়েন্দা গল্প বা থ্রিলারের জনপ্রিয়তা চিরকালীন। যেহেতু বাঙালি বুদ্ধিমান জাতি, তাই তারা বই পড়তে পড়তে বা সিনেমা দেখতে দেখতে নিজেরাই গল্পের রহস্য সমাধান করতে থাকে। সেকারণেই গোয়েন্দা গল্পের জনপ্রিয়তা এত বাংলায়।”

ঋতুপর্ণ ঘোষ নির্মিত মহিলা গোয়েন্দা চরিত্র রাঙা পিসিমা
তবুও সেই থোড়-বড়ি-খাড়াই তো পরিবেশন করা হচ্ছে নতুন থালায়। এই সময়ে চোখে পড়ার মতো কোনো নতুন গোয়েন্দাকে কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একই ব্যোমকেশ-কাকাবাবু-শবর ভাঙিয়ে কল্পনা ও সৃষ্টির দৈন্যতা প্রদর্শন করেই চলেছেন বাঙালি পরিচালকরা। আসলে ‘গোয়েন্দা’র জন্মই তো সমস্যার মধ্যে থেকে, সমস্যাসঙ্কুল সমাজের অপরাধ প্রবণতার অন্ধকার থেকে যে জ্ঞানের আলোক শিখা উঠে আসে, তা-ই তো ‘ডিটেকটিভ গেজ্'। সত্যান্বেষণের এই অন্তর্দৃষ্টিই বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে (ক্লুজ্) যুক্তির সুতোয় বেঁধে একটি সত্যাশ্রিত বিশ্বাসযোগ্য ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে পারে। আজ আমরা যে পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, যেখানে বিচার-ব্যবস্থা, গোয়েন্দাসংস্থা প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কার্যক্ষমতাকে সহজেই ক্ষমতার দ্বারা প্রভাবিত করা যায়, সেখানে সত্যান্বেষণ শুধুই এক পরিহাস, কিংবা বিলাসিতা মাত্র। চিন্তাশীল ব্যক্তিরা হয়তো তাদের স্বাধীন চিন্তাশক্তিও হারিয়ে ফেলছেন। এজন্যই কি নতুন কোনও গোয়েন্দার জন্ম আপাতভাবে সম্ভব হচ্ছে না? কিন্তু প্রতিকূলতাই তো এগিয়ে চলার সঠিক রাস্তাটিকে খুঁজতে শেখায়। তাহলে নতুন ধরনের গোয়েন্দা গল্প-নির্ভর ছবি দর্শকেরা উপহার পাবেন কবে?
*মতামত লেখকের নিজস্ব। কোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

