সৌরবিদ্যুৎ চালিত আলো পেল সুন্দরবনের পাঁচটি প্রত্যন্ত গ্রাম

আলোকজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ৪,৫১৬ জনেরও অধিক গ্রামবাসীর জীবন

মানুষ ও বাঘের সুপ্রাচীন দ্বন্দ্ব রুখতে এবার সুন্দরবনের পাঁচ গ্রামে জ্বলে উঠলো সৌরবিদ্যুৎ চালিত স্ট্রিট লাইট। সম্প্রতি বারুইপুর সাব-ডিভিশনের অন্তর্গত কুলতলি রেঞ্জের নির্বাচিত পাঁচটি গ্রামে সৌরবাতি বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর। এই অভিনব উদ্যোগের ফলস্বরূপ, আলোকজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ৪,৫১৬ জনেরও অধিক গ্রামবাসীর জীবন।

শহরের অফুরন্ত আলোর মাঝে বসে থেকে যা আমাদের কল্পনাতীত, তেমনই এক জীবন যাপন করত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত দেবীপুর, ভুবনেশ্বর, মধ্য গুরগুরিয়া, পূর্ব গুরগুরিয়া এবং দেউলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা। এই গ্রামগুলির কয়েকটি রাস্তা ইট বাঁধানো হলেও, আলো জ্বালানোর কোনোরকম ব্যবস্থা এখানে ছিল না। সন্ধে হলেই ঘন অন্ধকার নেমে আসত গ্রাম জুড়ে। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই পাশের গহীন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসত বাঘ। প্রাপ্ত সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যেই আটবার বাঘেরা হানা দিয়েছে এখানে। যদিও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাশাপাশি সুন্দরবনে বাঘ-বিধবাদের লড়াইয়ের পাশে থেকেছে ‘পথের সাথী কলকাতা’-র মতো সংগঠন।

রাস্তায় সৌরবাতি

সৌরবাতিগুলি বসানোর জন্য যে রাস্তাটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে, তার আশপাশ দিয়ে একাধিক ছোটো ছোটো জলের ধারা বয়ে গিয়েছে, মিশেছে পিয়ালি ও মাতলা নদীতে। রাস্তার অপর পাশে রয়েছে চিতুরি জঙ্গল। কেবলমাত্র দুই সারি নেট দিয়ে রাস্তা থেকে আলাদা করা হয়েছে জঙ্গলের অংশটিকে। স্বাভাবিক ভাবেই, এই পাতলা নেট বন্য পশুদের গ্রামের ভিতর প্রবেশ করা রুখতে সক্ষম হয় না। গ্রামগুলিতে কয়েক ঘণ্টার জন্য ইলেক্ট্রিসিটি পাওয়া গেলেও, গ্রামবাসীদের কাছে তার নাগাল পাওয়া রীতিমতো এক বিলাসিতা!

এই গ্রামগুলির কয়েকটি রাস্তা ইট বাঁধানো হলেও, আলো জ্বালানোর কোনোরকম ব্যবস্থা এখানে ছিল না। সন্ধে হলেই ঘন অন্ধকার নেমে আসত গ্রাম জুড়ে। আর এই অন্ধকারের সুযোগ নিয়েই পাশের গহীন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসত বাঘ।

এছাড়াও রয়েছে বিষধর সাপের উপদ্রব। অন্ধকারে ঠাহর করতে না পেরে প্রায়দিন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা বিষধর সাপের গায়ে পা পড়ে যায় গ্রামবাসীদের। গত কয়েক বছরে পাতি কাল কেউটে ও কোব্রার কামড়ে প্রাণ হারিয়েছে অগুন্তি মানুষ। এখানকার সবথেকে কাছের হাসপাতালটিই গ্রামাঞ্চল থেকে ৩৬ কিলোমিটার দূরে। ফলে বেশিরভাগ আক্রান্ত মানুষরা হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই মারা গিয়েছেন।

এই দুর্দশা ঘোচাতেই সুন্দরবনের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর। কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ (Kolkata Society for Cultural Heritage – KSCH)-এর হাতে হাত মিলিয়ে শুরু হয় কুলতলি রেঞ্জের এই পাঁচ গ্রামের মানোন্নয়নের অভিযান। কুলতলি সংলগ্ন ৪৭ কিলোমিটার অবধি বিস্তৃত রাস্তাটিকে বেছে নেওয়া হয় এর জন্য। রাস্তার ধারে ধারে নির্দিষ্ট দূরত্বে বসানো হয় খুঁটি, যার সঙ্গে লাগানো হয়েছে সৌর বিদ্যুতে চলা এলইডি লাইট। প্রত্যেকটি খুঁটিতে রয়েছে লিথিয়াম ব্যাটারি, আর বাল্বের উপর অংশে সৌরশক্তি আহরণের সুবিধার্থে লাগানো রয়েছে সোলার প্যালেন। প্রত্যেকটি লাইট পোস্টেই রয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা অবধি ব্যাকআপ–এর ব্যবস্থা। ফলে সারা রাত ধরেই জ্বলে থাকবে এই আলোগুলি।

এ প্রসঙ্গে আলোচনা করছেন কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ টিম

 

এই দুর্দশা ঘোচাতেই সুন্দরবনের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তর। কলকাতা সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ -এর হাতে হাত মিলিয়ে শুরু হয় কুলতলি রেঞ্জের এই পাঁচ গ্রামের মানোন্নয়নের অভিযান।

আশা করা যাচ্ছে, সন্ধের পর রাস্তাটি আলোকিত হয়ে থাকলে, বন্যপ্রাণীদের মধ্যে জঙ্গল ছেড়ে এখানে বেরিয়ে আসার প্রবণতা কমবে। তবে শুধু এটুকুই নয়, বনদপ্তরের বিশ্বাস, এই অভিনব উদ্যোগের ফলে পুনর্নবীকরণযোগ্য সবুজ শক্তির প্রচার এবং কার্বনের পরিমাণ হ্রাস করা সম্ভব হবে। এই লাইট পোস্টগুলি প্রতি বছর ১৮২.৫ কিলোওয়াট পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি উৎপাদন করতে সক্ষম।

সোসাইটি ফর কালচারাল হেরিটেজ-এর কর্ণধার সৌরভ মুখার্জির বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রামবাসীদের মধ্যে থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে ছোটো ছোটো গোষ্ঠী, যারা নিয়মিত এই সৌরবাতিগুলির দেখভাল করবে। তাঁরা চেষ্টা করছেন, ভবিষ্যতে যাতে গ্রামবাসীদের নিয়ে ছোটো কর্মশালার আয়োজন করা যায়। এর সাহায্যে তাদের মধ্যে পরিবেশ ও আত্মরক্ষা বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

Developed by DXDasia