
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ৬
পঞ্চম পর্বের পর
আজ সকালে টাম্পা থেকে নোঙর তুলে ইউএসটিএস কেনেডি (USTS Kennedy) রওনা হয়েছে পুয়ের্তো রিকোর (Puerto Rico) অভিমুখে। জল ক্রমশ ঘনসবুজ থেকে ময়ূরকণ্ঠী নীলে পৌঁছে জানিয়ে দিচ্ছে আমরা এখন গভীর সমুদ্রে। উড়ন্ত গাংচিলেরা বাড়ি ফিরে গেছে অনেকক্ষণ হল। এখন যেদিকে দু-চোখ যায় – কেবল জল আর আকাশ। আমরা সকলে আবার পুরোনো রুটিনে ফিরে ক্লাস পড়ানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। একটু আগে সারাদিনের কাজের শেষে ক্যাবিনে ফিরে ভাবলাম, লিখে ফেলি অরল্যান্ডোতে দ্বিতীয় দিনের কথা।
সেদিন সকালে ট্রাভেলজ মোটেলের কম্প্লিমেন্টারি কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্ট (অরেঞ্জ জুস, ইংলিশ মাফিন আর কফি) খেয়ে, বাস ধরে যখন সি ওয়ার্ল্ড (Sea World) পৌঁছলাম, তখন ঘড়িতে নটা বাজে। একটা বিশাল হ্রদের ধারে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সামুদ্রিক প্রাণীদের ঘিরে তৈরি এই থিম পার্ক। সেদিন ফ্লোরিডাতে ভালো রকমের ঠান্ডা। সকালে কায়দা মেরে সুতির সালোয়ার কামিজ পরে প্রাতঃরাশ খেতে এসে খটাখট আওয়াজে বুঝলাম শীতে আমার দাঁতে দাঁত ঠেকে যাচ্ছে। খাওয়ার পরে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে পোশাক পাল্টে, সোয়েটার, জিন্স, মাফলার, বুট জুতো পরে কোনোরকমে প্রাণরক্ষা! লবিতে হোটেলের ম্যানেজার আমার ঘন ঘন পোশাক পরিবর্তন দেখে একটা ভুরু প্রশ্নসূচকভাবে একটু উপরে তোলায় (এটা আমার একেবারে মনের ভুল হতে পারে) খামোকা দন্তবিকশিত করে বললাম, ‘হেঃ হেঃ খুব ঠান্ডা কি না!’
আরও পড়ুন: ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : মহাকাশ ভ্রমণ

সি ওয়ার্ল্ড বেকারি
সি ওয়ার্ল্ডের গেট দিয়ে যখন ভেতরে ঢুকলাম তখন নাতিশীতোষ্ণ রোদের আমেজ। প্রথমেই সাইপ্রাস বেকারিতে (Cypress Bakery) ঢুকে একটা হট চকোলেট কিনে কন্টিনেন্টাল ব্রেকফাস্টের শেষ ধাপ পেরোলাম। প্রথমে যে জায়গায় পৌঁছলাম তার নাম ডলফিন নার্সারি (Dolphin Nursery)। সেখানে একটা জলাশয়ে কিছু সদ্যোজাত ডলফিন তাদের মায়েদের সঙ্গে একটা সুরক্ষিত আবহাওয়ায় জীবনের প্রথম কয়েক মাস কাটাচ্ছে৷ একটু বড়োসড়ো হলে তবেই তাদের অন্য বড়োদের সঙ্গে মিশতে দেওয়া হবে। ঠিক তার পাশে কুমিরদের এলাকা পেরিয়ে পৌঁছালাম ম্যানাটিদের অঞ্চলে। ম্যানাটি অত্যন্ত শান্তশিষ্ট ধীর-স্থির প্রাণী, কারণ তাদের বিশাল অবয়ব তাড়াহুড়ো করে কিছু করার উপযোগী নয়। তারা খুব আস্তে সুস্থে জলে ভেসে ভেসে বেড়ায় আর খাওয়া-দাওয়া করে। যেহেতু এরা নখদন্তহীন শান্তিপ্রিয় জীব, তাই প্রকৃতির নিয়মে হাঙরের সহজ শিকার।

ম্যানাটি

পেঙ্গুইন
এরপর পেঙ্গুইন এনকাউন্টারে গিয়ে পৃথিবীর সব প্রজাতির পেঙ্গুইনের সঙ্গে মোলাকাত হল। এক প্রজাতির পেঙ্গুইনের দেখলাম বেশ বাহারি ঝুঁটি আর রকস্টার-এর মতো খোঁচা খোঁচা চুলের কায়দা। এদের নাম রকহপার পেঙ্গুইন। এইসব দেখে হাঁটতে-হাঁটতে লেকের ধারে একটা খুব সুন্দর জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেখানে সি ফায়ার ইন এন্ড রেস্টুরেন্ট (Sea Fire Inn and Restaurant) রয়েছে যা কিনা পুরোনো আমলের বিলিতি সরাইখানার আদলে তৈরি। তার সামনে একটা বিশাল গাছে নানা দেশ থেকে আনা কাচের ছোটো ছোটো লণ্ঠন ঝুলছে। লেকের হাওয়া আর নরম সূর্যের আলো সেই লণ্ঠনগুলির কাচে ঝিলিক মেরে তৈরি করেছে এক মায়াবী পরিবেশ। আমার সারা গায়ে সেই আলোর প্রতিচ্ছবি ঢেউয়ের মতো খেলছে… আর একেবারে অবাক করে দিয়ে, যে অসাধারণ গানটা সেই সরাইখানার পুরোনো রেকর্ড প্লেয়ার হঠাৎ বেজে উঠল… তা হল ‘হোয়াট এ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড’, যা কিনা পৃথিবীতে কেবল একজন মানুষই এমনভাবে গাইতে পারে৷ সেই রোদ… সেই গান…

লণ্ঠন
সেই লণ্ঠনের কাচে ঝিলিক মারা সকালের আলো আর ভালোবাসার মতো সমস্ত সত্তাকে উজ্জীবিত করে দেওয়া একটা টাটকা নতুন দিন আমাকে বলে গেল… ‘হোয়াট এ ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড’।

সি ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে নামকরা শো, যার নাম বিলিভ
ঠিক সকাল এগারোটা বেজে পনেরো মিনিটে শুরু হল সি ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে নামকরা শো, যার নাম বিলিভ (Believe)। একটা বিশাল স্টেডিয়ামে কিলার হোয়েলদের (Killer Whale) শো। কিলার হোয়েল এক রকমের তিমি মাছ, যাদের অসাধারণ সাদা-কালো রূপ একেবারে মুগ্ধ করে। ধবধবে সাদা আর কুচকুচে কালো মেশানো এদের মসৃণ শরীর। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। সামনে ঘন নীল বিরাট জলাধার, যেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে ছয়টি কিলার হোয়েল। এরা দৈত্যাকার এবং সমুদ্রের সবচাইতে তুখোড় শিকারি। অথচ ট্রেনারদের প্রশিক্ষণে একেবারে নরম, বাধ্য, শান্ত প্রাণী।

একটা বিশাল স্টেডিয়ামে কিলার হোয়েলদের শো
খোলা আকাশের নিচে স্টেডিয়াম আর সেখানে নানা রকম সাদা রঙের বক উড়ে বেড়াচ্ছে। জলের ওপরে তিমির বিশাল একটা মডেল মাথা উঁচু করে আছে আর তার সামনে বিরাট চারটে সিনেমাহলের স্ক্রিনের মতো স্ক্রিন, যারা মনে হয় শূন্য থেকে ঝুলছে। গ্যালারির প্রথম দশটি সারিতে বেশি লোক বসে নেই, কারণ সেখানে লেখা আছে সোক (SOAK) অর্থাৎ, ওখানে বসলেই তিমির লেজের ঝাপটায় জলে ভিজে একসা হবে। আমি অবশ্যই পঞ্চম সারিতে বসলাম। এরপর শুরু হল সেই আশ্চর্য খেলা। চিত্রার্পিত, স্তব্ধ হয়ে দেখলাম মানুষ আর সামুদ্রিক জীবের অসাধারণ মেলবন্ধন। তিমি মাছের গায়ের রং, ডিজাইনের সঙ্গে ম্যাচ করে সাদাকালো সুইমিং কস্টিউম পড়েছিল ট্রেনাররা। সূর্যের আলোয় জলের ফোঁটা পিছলে পড়ে মুক্তোর মতো চমকাচ্ছিল কিলার হোয়েলদের শরীরে৷ পুরো শোটা জুড়ে ছিল বিশ্বাসের কথা। নিজের প্রতি… জীবজন্তুর প্রতি… প্রকৃতির প্রতি… পৃথিবীর প্রতি। অবিশ্বাসকে অতিক্রম করে বিশ্বাসের অভিষেক। অন্ধকারকে অতিক্রম করে, শীতকে উপেক্ষা করে, ভেদাভেদকে তুচ্ছ করে, পূর্ণ বিশ্বাসের অঙ্গীকার।
সেখানে সি ফায়ার ইন এন্ড রেস্টুরেন্ট রয়েছে যা কিনা পুরোনো আমলের বিলিতি সরাইখানার আদলে তৈরি। তার সামনে একটা বিশাল গাছে নানা দেশ থেকে আনা কাচের ছোটো ছোটো লণ্ঠন ঝুলছে। লেকের হাওয়া আর নরম সূর্যের আলো সেই লণ্ঠনগুলির কাচে ঝিলিক মেরে তৈরি করেছে এক মায়াবী পরিবেশ।
‘ভাবিতেছিলাম উঠি কি না উঠি
অন্ধতামস গেছে কি না ছুটি
রুদ্ধ নয়ন মেলি কি না মেলি
তন্দ্রাজরিমা মাজিয়া
এমন সময় ঈশান তোমার
বিষাণ উঠেছে বাজিয়া’

ফেস্টিভ্যাল অফ দ্য লায়ন কিং
সি ওয়ার্ল্ড থেকে ৫০ নম্বর বাসে চড়ে যখন ডিজনি ওয়ার্ল্ড (Disney World) পৌঁছলাম, তখন প্রায় দুপুর একটা বাজে। আধবেলাতে যতটুকু সম্ভব দেখা যায় তাই দেখে আমাকে ফিরতে হবে। আধবেলায় ডিজনি ওয়ার্ল্ড দেখব শুনে টিকিট বিক্রেতা আমার দিকে এমন ভাবে চাইল যেন আমার মুখে একটা বাড়তি নাক আছে! ঠিক করলাম অ্যানিমাল কিংডম দেখব। সেখানে ঢুকে সবচেয়ে প্রথমে গেলাম ক্যাম্প মিনি – মিকি (Camp Minnie-Michey), যেখানে একটা খুব সুন্দর কাঠের তৈরি থিয়েটার মঞ্চ ছিল৷ একটা ক্যাম্প গ্রাউন্ডের মাঝখানে কিছুটা জঙ্গল পরিষ্কার করে এটা তৈরি। সেখানে ফেস্টিভ্যাল অফ দ্য লায়ন কিং (Festival of the Lion King) বলে একটা অসাধারণ শো দেখলাম৷ লায়ন কিং সিনেমার সিম্বা, টিমন, পুম্বা আর তাদের সঙ্গে নানারকম জীবজন্তুর বর্ণময় পোশাক পরা কিছু চমৎকার গাইয়ে আর নাচিয়ের দল সেই ক্যাম্প গ্রাউন্ড মাতিয়ে রেখেছিল। উপস্থিত দর্শকদেরও চার ভাগে ভাগ করে ফেলা হল। একদল হল হাতি, একদল বুনো শুয়োর, একদল সিংহ আর একদল হল জিরাফ। দল অনুযায়ী আমাদের বলা হল সেই জন্তুর আওয়াজ অনুকরণ করতে। আমরা যারা জিরাফের দলে ছিলাম, তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসে রইলাম কারণ আমরা কেউ কোনোদিন জিরাফকে ডাকতে শুনিনি। যেই মুহূর্তে জানলাম যে জিরাফ আসলে ভেড়ার মতো ডাকে তখন আমাদের সমবেত ব্যা ব্যা ডাকে কান পাতা দায়!
যে হাসিখুশি, মোটাসোটা গায়িকা আমাদের সব নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তিনি প্রতিটি মুখপাত্রকে বললেন মাইকে তাদের পরিচয় দিয়ে সেই জন্তুর ডাকটা খুব জোরে ডাকতে। বুনো শুয়োরের দলের মুখপাত্র এক বিশাল চেহারার মাঝবয়সী টাকমাথা মানুষ৷ তিনি চেঁচিয়ে বললেন ‘হাই আই এম অর্নি ফ্রম টেক্সাস’।
প্রত্যেক দলের একজন মুখপাত্র ঠিক করা হল। যে হাসিখুশি, মোটাসোটা গায়িকা আমাদের সব নির্দেশ দিচ্ছিলেন তিনি প্রতিটি মুখপাত্রকে বললেন মাইকে তাদের পরিচয় দিয়ে সেই জন্তুর ডাকটা খুব জোরে ডাকতে। বুনো শুয়োরের দলের মুখপাত্র এক বিশাল চেহারার মাঝবয়সী টাকমাথা মানুষ৷ তিনি চেঁচিয়ে বললেন ‘হাই আই এম অর্নি ফ্রম টেক্সাস’ (Hi! I am Earnie from Texas) আর তারপর নাক-মুখ দিয়ে বুনো শুয়োরের একটা বিকট ভয়ানক ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজ করলেন।
সেই উৎকট আওয়াজে আমরা প্রায় চেয়ার উল্টে পড়ি আর কি! মনে হল অর্নি ফ্রম টেক্সাসের খানিকটা মাথার ঘিলু ওই বিকট ডাকের সঙ্গে সঙ্গে নাক মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো বুঝি! গায়িকা ভদ্রমহিলা খুবই রসিক মানুষ| উনি হেসে বললেন, ‘ওহে অর্নি ফ্রম টেক্সাস… তোমার কি একটা টিস্যুর দরকার হল নাকি হে?’

হাকুনা মাটাটা
লায়ন কিং-এর অনেকগুলো গান শুনলাম, যা আমার ভীষণ প্রিয়। ক্যাম্প গ্রাউন্ড থেকে বেরিয়েও যে গানটা মাথার ভেতরে ঘুরছিল তা হল হাকুনা মাটাটা (Hakuna Matata)। সোয়াহিলি ভাষায় এই কথার মানে হল ল্যাদ। ‘আরে একটু জিরিয়ে নাও… একটু মজা করে নাও… এত ছোটাছুটি করে কি লাভ? রিলাক্স।’
মন ভরে, প্রাণ ভরে সব দেখে টেখে যখন বাস ধরলাম, তখন সিন্ডারেলার ট্রাভেলজে ফেরার সময় হয়ে গেছে। আরেকটু দেরি করলেই শেষ বাসটা মিস করে ল্যাজেগোবরে হতে হত। বাসে বসে ফ্লোরিডার ঝলমলে রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, প্রাত্যহিক টানাপোড়েন আর ইঁদুর দৌড়কে আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্য বাক্সবন্দি করে চাবি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম আটলান্টিকের গভীরে। যতক্ষণ সেই চাবির কথা ভুলে থাকা যায়, ততক্ষণ আমার সাথে রয়েছে সিম্বা, টিমন, পুম্বা আর অর্নি ফ্রম টেক্সাস৷ বিকট গলায় সে যে গানটা গাইছে সেটা অবশ্যই ‘হাকুনা মাটাটা’।
ক্রমশ…
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হবে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।
