
একসময় এই পুজো হত বাংলাদেশের বিক্রমপুরে
অভিনেতা তথা পরিবেশবিদ সব্যসাচী চক্রবর্তী সস্ত্রীক প্রায় প্রতিবছরই এই বাড়ির দুর্গাপুজোতে আসেন। গতবছর নাট্যকার তথা অভিনতা চন্দন সেন সেই বাড়ির পুজোয় সস্ত্রীক আড্ডায় অংশ নেন। অভিনেতা ও পরিচালক চিত্রভানু বসু-সহ আরও অনেক পরিবেশবিদ, নাট্যকর্মী, ফটোগ্রাফার সে বাড়ির পুজোতে জমজমাট আড্ডায় অংশ নিতে আসেন দূরদূরান্ত থেকে। শিলিগুড়ি দেশবন্ধু পাড়ার অবন ঠাকুর সরণিতে এভাবেই চক্রবর্তী বাড়ির পুজো শুধু শিলিগুড়ি নয়, গোটা রাজ্যেই বাড়ির পুজো হিসাবে খ্যাতি লাভ করেছে।

বাঙালির পুজো মানেই সেখানে অন্যরকম আড্ডা, খাওয়াদাওয়া। চলে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে যাবতীয় প্রচার। প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ বর্জন, জলের অপচয় ঠেকানো, গাছ বাঁচাও-এর মতো বিষয় নিয়ে প্রচার গতবছরও হয়েছে। এবারও হবে। একশো বছরেরও বেশিদিনের পুরোনো এই পুজো। বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুরে রয়েছে বাগোড়া গ্রাম। সেখানেই একসময় এই পুজো হত। পুজোর জন্য বিক্রমপুরের সেই গ্রামে ত্রিশ ফুটের একটি নাটমন্দির তৈরি হয়েছিল। এখনও ওই নাটমন্দির অক্ষত রয়েছে।
শিলিগুড়ির দেশবন্ধু পাড়ায় নিজেদের পূর্ব পুরুষদের ওই পুজো শুরু করেছেন দীপজ্যোতি চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রী শ্রাবণী চক্রবর্তী। দীপজ্যোতিবাবুর বাবা প্রয়াত অনিল চক্রবর্তী ছিলেন চা বাগানের ম্যানেজার। আর তাঁর ঠাকুরদা ক্ষিতীশ চক্রবর্তী বিশ্বভারতীতে নন্দলাল বসুর সঙ্গে একসঙ্গে কলাভবনে পড়াশোনা করতেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশদের সময়েই ডুয়ার্সের মাল ব্লকের মিশন হিল চা বাগানের ম্যানেজার হিসাবেও কাজ করেছেন ক্ষিতীশবাবু।
দীপজ্যোতিবাবু জানাচ্ছেন, একসময় বাংলাদেশে এই পুজোয় মোষ বলি হত। তাঁদের পূর্ব পুরুষেরা ছিলেন জমিদার। গোটা গ্রামের মানুষ পুজোর চারটেদিন কেউ বাড়িতে রান্নাবান্না করতেন না। সবাই সেই বাড়িতে প্রসাদ গ্রহণ করতেন। কলকাতা, বাংলাদেশ থেকে চক্রবর্তী পরিবারের সব আত্মীয়স্বজনরা পুজোর দু’দিন আগেই চলে আসেন শিলিগুড়ি। পঞ্চমীতে চলে আসে প্রতিমা। সব মহিলারা বরন করে নেন দেবীকে। এলাকার সব মানুষেরই সে পুজোয় নেমন্তন্ন থাকে। পাড়ার বিভিন্ন মানুষ পুজোর প্রসাদ গ্রহণ থেকে শুরু করে অন্য কাজে অংশ নেন। তখন এই পুজো আর বাড়ির পুজো থাকে না, পুজো হয়ে ওঠে সর্বজনীন। প্রতিদিন গড়ে দু’শো থেকে আড়াইশো জন মানুষ সেখানে ছয়-সাত ভাগে অঞ্জলি দিতে উপস্থিত হন। গতবছর থেকে পুজোর থিম সং-ও তৈরি হয়েছে। পুজোর প্রসাদ বিতরণের সময় সকলকে বসিয়ে খাওয়ানো হয়। একেকদিন একেকরকম খাবার। কোনওদিন ফ্রায়েড রাইস, কোনওদিন পোলাও, কোনওদিন আবার খিচুড়ি বা সাদা ভাত প্রসাদ হিসেবে বিলি হয়।

গত বছর এই পুজোয় অভিনেত্রী তথা সব্যসাচী চক্রবর্তীর স্ত্রী মিঠু চক্রবর্তীকে ধুনুচি নাচ করতে দেখা গিয়েছে। কলকাতার একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের বিচারে সেরা বনেদি বাড়ির পুজো, প্রাণের পুজো শিরোপা অর্জন করে এই পুজো। পুজোও হয় নিষ্ঠা সহকারে। ১০৮ টি পদ্ম তো আছেই। তার সঙ্গে সেভক পাহাড়ের তিস্তা থেকে কলা বউ স্নান করিয়ে আনা হয়। পঞ্চমী থেকে শুরু হয় নিরামিষ গ্রহণ। বিসর্জনের পর খাওয়া হয় মাংস ভাত। আসলে বাড়ির দুর্গাপুজোর মজাই আলাদা।
