
ভাগ্য ভালো থাকলে দেখাই যেতে পারে হাতির জল খাওয়া
উড়িষ্যার মহানদীর তীরে প্রায় হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে সাতকোশিয়া অভয়ারণ্য। পূর্বঘাট পাহাড় চিরে বয়ে গেছে মহানদী, তৈরি হয়েছে গভীর গিরিখাত সাত ক্রোশ জুড়ে, এখনকার হিসেবে ১৪ মাইল বা ২৩ কিলোমিটার। এর থেকেই নাম হয়েছে সাতকোশিয়া। অভয়ারণ্যে ঢোকার পথ আছে কয়েকটি, জঙ্গলের কাছাকাছি উড়িষ্যা বন উন্নয়ন দপ্তর ব্যবস্থা করেছে থাকার। তেমনই একটির নাম হল সাতকোশিয়া সেন্ড রিসর্ট। নদী, বন আর পাহাড় মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব দৃশ্য – প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করল আমাদের। মহানদীর তীর থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে পাহাড়ের গা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে এই রিসর্ট। নদীর তীরে বালির তটে সারি দিয়ে সুদৃশ্য তাঁবু, মাঝে চালার ঘরে খাবার ব্যাবস্থা। তার কিছুটা উপরে বেশ বড় চারটি তাঁবু, যাকে বলে সুইস কটেজ আর পাহাড়ের গায়ে তিনটি কটেজ। নদীর তটের তাঁবুগুলো জানা গেল অস্থায়ী – ১৫ই নভেম্বর থেকে চালু হয় এগুলি। বর্ষার জল যখন তট ছাপিয়ে যায়, তখন খালি খোলা থাকে চারটি তাঁবু আর কটেজ।

আমাদের থাকার ব্যাবস্থা কটেজে – পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলে ঘেরা ঘর, বারান্দা থেকে দেখা যায় দূরের সাতকোশিয়া গর্জ, চোখে পড়ে অস্পষ্ট পূর্বঘাট পর্বতমালা। পাখির কলকলানিতে ভরে আছে চারদিক, আর কত না রংবেরঙের প্রজপতি। গাছের ফাঁকে মূহুর্তের জন্য চোখে পড়ল বেশ বড় কাঠবিড়ালির মত এক প্রাণী, কিন্তু কাঠবিড়ালির মত ধূসর রঙের নয়, চমৎকার গাঢ় খয়েরি রঙের। নাম জানলাম giant squirrel. বুঝলাম ঢুকে পড়েছি এদের দেশে, নিঃশব্দে উপভোগ করে যেতে হবে, এদের শান্তি বিঘ্নিত না করে।
ভুবনেশ্বর বা কটক থেকে যাওয়া যায় সাতকোশিয়া। ভুবনেশ্বর থেকে বাঘামারি, কালাপাথর হয়ে দু ঘণ্টার গাড়ির পথ। কটক থেকে সময় লাগে গাড়িতে তিন ঘণ্টা। রিসর্টের বুকিং হয় অনলাইনে। বেড়ানোর আদর্শ সময় শীতকাল। যদি নদীর চরে থাকতে চান, তবে ১৫ই নভেম্বরের পরে। আর যদি নিরিবিলি চান, তবে চলে যান নভেম্বরের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে।
উড়িষ্যা বন উন্নয়ন দপ্তর এক অভিনব ব্যবস্থা চালু করেছেন এখানে। রিসর্টের পরিকাঠামো তৈরি করে পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন বনসংলগ্ন গ্রামের লোকেদের, অবশ্যই বনদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে। ফল হয়েছে চমৎকার। গ্রামের অতিদরিদ্র মানুষগুলির আর্থিক সংস্থান হয়েছে, আর তারাও মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসে নিপুণভাবে পরিচালনা করছে সবকিছু। একেবারে দেশীয় ধাঁচে তৈরি হয়েছে পুরো রিসর্টটি, রুচির ছাপ রয়েছে সর্বত্র। গ্রামের মেয়েরা প্রতি সকালে এসে আলপনা দিয়ে সাজিয়ে যায় পুরো চত্বর। রান্নাবান্নার দায়িত্বও তাদের। ব্যবস্থাপনার কোনও ত্রুটি নেই, কিন্তু নজর রাখা হয়েছে প্রকৃতির সাথে কোথাও যেন কোনও অসামঞ্জস্য চোখে না পড়ে।
মহানদীর গর্জে আছে মোটরচালিত নৌকায় ভ্রমণের ব্যবস্থা। দুপাশে পূর্বঘাটের পর্বত ঘন বনে ছাওয়া, মাঝ দিয়ে চলেছি আমরা। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখাই যেতে পারে হাতির জল খাওয়া। তবে বাঘের দেখা সহজে মেলে না – জানালেন আমাদের গাইড। হাতি দেখার সৌভাগ্যও আমাদের হয়নি। কিন্তু সহজেই দেখা যায় চরের সাথে রঙ মিলিয়ে শুয়ে আছে ঘড়িয়াল। গাইড জানালেন গভীর গিরিখাতে মহানদীর মিস্টিজল নাকি ঘড়িয়ালের ভারি পছন্দ। আর আছে কুমীরও।

দেখা মিলল গাছের ডালে এক বিরাটাকার পেঁচার – জ্ঞানবৃদ্ধ তপস্যায় বসেছেন যেন। আছে নানা পাখি। ঝাঁকে ঝাঁকে বসে আছে কমলা ঠোঁটের পাখির দল – Indian skimmer, কাছাকাছি যেতেই আকাশে কমলা রঙের ফোয়ারা ছুটিয়ে উড়ে গেল নীল দিগন্তে, সূর্যাস্তের রঙের সাথে যেন মিলেমিশে এক হয়ে গেল। শুধু এই দৃশ্যটুকু দেখার জন্যই আসা যায় বারবার সাতকোশিয়ায়।
আরও পড়ুন
ঘুরে আসুন পাহাড়ে পলাশে

সাতকোশিয়া রিসর্ট থেকে এক পথ গিয়েছে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, শুনলাম এই পথ গিয়েছে নাকি এক ঝর্নার কাছে। পরম উৎসাহে সঙ্গী হলেন এক রিসর্টের কর্মচারী, আমাদের একা ছাড়বেন না। জঙ্গলের মধ্যে পথ হারালে বিপদ। কিছুটা গিয়েই বুঝলাম সত্যি এ পথে আমাদের একা আসার সাধ্যি ছিল না, বেশ ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে ছায়া ঘেরা পাহাড়ি পথ। তবে পথপ্রদর্শক অভয় দিলেন এ পথে জংলি জানোয়ারের বিশেষ ভয় নেই, যদি না ভুল করে আরো গভীরে ঢুকে পড়ি। গভীর জঙ্গলে আছে লেপার্ড, হাতি। অভয় সত্ত্বেও গা ছমছমে ভাবটা থেকেই যায় – চারপাশ নিঃশব্দ, খালি পায়ের চাপে শুকনো পাতার শব্দ। হঠাৎ চোখে পড়ে এক খরগোশ, দ্রুত জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল। বনমুরগিরও সাক্ষাত পাওয়া গেল। প্রায় তিন কিলোমিটার গিয়ে সন্ধান পাওয়া গেল ঝর্ণার। তিরতির করে বয়ে চলেছে ছোট্ট ঝরণা, পাহাড়ি ঝরণা বলতে যে চিত্র মনে আসে একেবারেই তা নয়, অতি সাধারণ। কিন্তু চারপাশের আরণ্যক পরিবেশ যেন একে অসাধারণ করে তুলেছে।
আমাদের পথপ্রদর্শক জানালেন সন্ধেবেলা নাকি গ্রামের লোকেরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করবেন আমাদের জন্য। নদীর চরে হেজাকের আলো জ্বালিয়ে শুরু হল গ্রামীণ পালা, গানের অর্থ বুঝিনি। কিন্তু খোলা আকাশের নীচে গ্রামীণ গানের সুরের রেশ আর তাদের সরল অভিব্যাক্তি –সত্যি ভোলা যায় না।
এখানকার প্রকৃতি, মানুষ, জঙ্গলের প্রাণী সব মিলে যেন সৃষ্টি হয়েছে এক ঐকতান – সতর্ক থাকতে হয় আমদের মত আগন্তুকেরা যেন সেই সুরের রেশ না কেটে দিই।

