থিয়েটার-চলচ্চিত্র-রাজনীতিতে দিনবদলের স্বপ্ন দেখতেন ‘সর্বজয়া’

ছবি ও মঞ্চের অভিনয়ের জগতের বাইরে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় ছিলেন লেখালেখিতেও

পঞ্চাশের দশকের ভারতীয় চলচ্চিত্রে নব্যধারা নিয়ে আসা ‘পথের পাঁচালি’ (১৯৫৫) ও ‘অপরাজিত’ (১৯৫৬) নিয়ে আমরা প্রায়শই কথা বলি, অথচ বেশিরভাগ সময়েই এড়িয়ে যাই তাদের অভিনেতা/অভিনেত্রীদের প্রসঙ্গ। আমরা বলি বটে সর্বজয়া চরিত্রের সঙ্গে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একাত্ম হয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু যে অভিনেতা/নেত্রীদের উপস্থিতি ও অভিনয় গড়ে তুলছে শুধু চরিত্র নয়, ছবির একটি বিশেষ ভাষা তাঁদের নিয়ে  আলোচনা খুবই কম। আজ এই কথা যাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বলা, তিনি করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়- ভারতীয় বা বলা ভালো বিশ্বচলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরলের মধ্যেও বিরলতম এক অভিনেত্রী। তাঁর সু-অভিনয়ে শুধু সর্বজয়াই অমর হয়ে যাননি দর্শক মানসে, কিছু মুহূর্তের জন্ম দেখেছে চলচ্চিত্র মাধ্যম- যা হাতে গোনা কিছু অভিনেতা-অভিনেত্রীই উপহার দিতে পেরেছেন শতাব্দী প্রাচীন এই দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যমকে।

‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রে সর্বজয়া চরিত্রে অভিনেত্রী করুণা

‘পথের পাঁচালি’র অভিনয়ের প্রস্তাব যখন আসে, তখন গণনাট্য সঙ্ঘের পরিণত অভিনেত্রী করুণা, তা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রে অভিনয়ে দ্বিধা ও সংকোচ ছিল অনেকখানি। বিভূতিভূষণের কল্পনায় সৃষ্ট এই গ্রাম্য গৃহবধূর চরিত্রও সেভাবে পছন্দ হয়নি তাঁর। স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির অনুরোধে নিমরাজি হয়েই কাজ শুরু করেন। বাকিটা ইতিহাস! এরপরের ছবি ‘অপরাজিত’তে কী আশ্চর্য দক্ষতায় উনি রূপ দেন সর্বজয়ার পরিণত হয়ে ওঠার যাত্রাপথ। ‘অপরাজিত’তে বেনারস থেকে গ্রামবাংলা এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল সূচিত হচ্ছে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত সংলাপবিহীন এক দৃশ্যে। লং-শট থেকে মিড ক্লোজ-আপ ও ক্লোজ-আপে শুধু কিছু মুখভঙ্গিমার সূক্ষ্ম পরিবর্তন; আর দর্শক বুঝে যাচ্ছেন  ছোট্ট অপুকে তামাক সাজতে দেখে ওর মা চকিতে নিয়ে ফেলছেন গ্রামে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত। দৃশ্যটির নাটকীয় অভিঘাত প্রবল, অথচ কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়াজের ত্রাহি ত্রাহি রব নেই, ভ্রূকুঞ্চনের অতিরেক নেই, এমনকি হাত-পায়ের অবস্থান প্রায় স্থির! করুণা যে ধরনের অভিনয় রীতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করাচ্ছেন, সমসময়ের প্রেক্ষাপটে তা শুধু নতুন নয়, বৈপ্লবিক। ছবির পরের অংশে গ্রামীণ জীবনের প্রতি নিরাসক্ত অপুর যাত্রা আধুনিকতার দিকে আর আমরা সর্বজয়ার মধ্যে প্রত্যক্ষ করি অপুর ফেলে আসা গ্রামজীবনকে। আধুনিকতার যাত্রাপথে ‘বর্জিত’ বাড়িটায় সন্ধে ঘনিয়ে আসা সঙ্গে নিয়ে অবহেলা, উপেক্ষা ও বিষণ্ণতার  মূর্তরূপ করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন এক অভিনয় রীতির পাঠ হয়ে ওঠেন। চরিত্র এখানে একইসঙ্গে এক স্থান ও সময়কালের দ্যোতক আর করুণা কী দক্ষতায় মিশে যান এই স্থান-কাল ও চরিত্রে!

‘অপরাজিত’-তে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯৫৯ সালে ‘ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি অব ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন আর্ট’ (বাফটা) দ্বাদশ ব্রিটিশ ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড (‘বাফতা’) দেওয়ার জন্য মনোনীত করেন করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তাঁর সঙ্গে আর যে পাঁচজন অভিনেত্রী নির্বাচিত হন তাঁরা ছিলেন ইনগ্রিড বার্গম্যান, তাতিয়ানা সামজলোভা, জোয়ানে উডওয়ার্ড, গুইলেত্তা মাসিনা ও আনা ম্যাগনানি। করুণা লিখেছিলেন ওনার অত্যন্ত সৌভাগ্য যে, উনি মনের মতো চরিত্রে অভিনয় করতে  পেরেছিলেন। আমার মনে হয়, রায়ের চলচ্চিত্র ভাবনা ও আমরা ওঁর দর্শকেরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমরা করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে পেয়েছি ‘দেবী’র (১৯৬০) হরিসুন্দরী বা ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র(১৯৬২) লাবণ্যকে। কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো ছবিতে অল্পই স্ক্রিন প্রেসেন্স ওঁর, সংলাপও বিশেষ নেই। তাও দুটি তিনটে দৃশ্যেই দার্জিলিং-এর সেই কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় লাল পাড় সাদা শাড়িতে এক প্রৌঢ়ার চরিত্রে উনি এমন এক সংবেদী অভিনয়ের নিদর্শন রেখে যান যা সমসাময়িক বাংলা ছবির জগতে অভাবনীয়!     

সত্যজিৎ রায়ের উল্লিখিত ছবিগুলো ছাড়াও আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে অভিনয় করেন করুণা। যার একটি হল ১৯৫৯-এ মুক্তিপ্রাপ্ত শম্ভু মিত্র-অমিত মৈত্র পরিচালিত ‘শুভ বিবাহ’  – সদ্য পাস হওয়া হিন্দু বিবাহ আইনের (১৯৫৫ সালে ভারতীয় সংসদের আইন দ্বারা গঠিত) প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ছবিটি প্রশ্ন তোলে বিবাহ সামাজিক না ব্যক্তিক? ওই বছরই মুক্তিপ্রাপ্ত ভিন্ন স্বাদের ‘হেডমাস্টার’ (অগ্রগামীর পরিচালনা) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তর বাংলায় মধ্যবিত্ত সমাজের অসহায়তার দলিল আবার সেই অন্ধকার সময়ে কীভাবে জেগে ওঠে সংগ্রামী জীবনবোধ ও আত্মপ্রত্যয় তারও কাহিনি। এ ছবিতে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনয় করেন ছবি বিশ্বাস, শোভা সেনের সঙ্গে। পরবর্তীকালে মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’তে (১৯৭০) ‘এফর্টলেস’ অভিনয়ের এক ভিন্ন নান্দনিক রূপ দেখি করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত চরিত্রে।   

‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ চলচ্চিত্রে লাবণ্যরূপী করুণা 

ছবি ও মঞ্চের অভিনয়ের জগতের বাইরে করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় সক্রিয় ছিলেন লেখালেখিতেও। তাঁর রচিত গ্রন্থ  ও চিঠি এবং ডায়েরির সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। লিখেছেন পত্র-পত্রিকায়ও আর সেখানেও চমৎকৃত করে তাঁর শিল্পবোধ ও সুলেখনী। ১৯৬৩-এর শারদীয়া নহবতে লিখছেন, “সিনেমা তো শুধু ছবি আঁকা নয়, শুধু লেখা নয়, গান নয়। সিনেমা হল যৌথ শিল্পসৃষ্টি। পরিচালকের কাছে সমস্ত ধ্যান ধারণা আছে, কিন্তু একলা তাকে রূপ দেবার ক্ষমতা তাঁর নেই। ক্যামেরা ছাড়াও তাঁর দরকার একটি বুদ্ধিমান, গতিপ্রখর সহকারী দল। যে সহকারী দল শুধু যান্ত্রিকভাবে পরিচালকের কথা মানে না, পরিচালকের দৃষ্টির সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয়, কিছুটা শিল্পজ্ঞান ও কল্পনার প্রসার থাকে বলেই সে পরিচালকের ভাবনাকে রূপ দিতে সাহায্য করতে পারে”। এই শিল্পজ্ঞান ও কল্পনার প্রসার ছিল বলেই তো ছবির পর্দায় সম্ভব হয়েছিল সর্বজয়া, হরিসুন্দরী বা লাবণ্যর এরকম সমৃদ্ধ নির্মাণ। একথাও বলা জরুরি যে, সুস্পষ্ট এক রাজনৈতিক চেতনায় জারিত ছিল তাঁর শিল্পবোধ। দিনবদলের স্বপ্ন চোখে নিয়ে অভিনয় করছেন নাটকে-চলচ্চিত্রে আর কাজ সারা হলে প্রগতি আন্দোলনের পোস্টার মারছেন রাস্তায় রাস্তায়। এরকমই এক শিল্পী ছিলেন করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

___________

তথ্যঋণঃ 
করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার, “দ্য ক্রিয়েটিভ পার্সনঃ সত্যজিৎ রায়ঃ সত্যজিৎ রায় অ্যাট ওয়ার্ক; ইন্টারভিউ উইথ কোলাবোরেটরস” ইউটিউব লিঙ্কঃ
https://www.youtube.com/watch?v=k0_P5IwJqEE
শারদীয়া নহবত, ১৯৬৩।
এখন সত্যজিৎ, পঞ্চদশ বর্ষ, ১ম ও ২য় সংখ্যা, জানুয়ারি-মার্চ ২০২০।
“সর্বংসহা, সর্বজয়া করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়”, সুদেষ্ণা বসু, ২৭ জুলাই, ২০১৯, আনন্দবাজার পত্রিকা।

“সারাদিন শুটিং করার পর রাত্রে রাস্তায় রাস্তায় আন্দোলনের পোস্টার মারতেন ‘সর্বজয়া’”, বঙ্গদর্শন, ৯ অগস্ট, ২০১৯।

Developed by DXDasia