‘আমি ভোটেরও লাগিয়া ভিখারি সাজিনু…ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে’

এমন গান বাংলার ভোটের ইতিহাসে অচিরেই নতুন অধ্যায় তৈরি করেছিল

ভোট (election) পর্ব আর কাটছেই না! ‘টুম্পা সোনা’ থেকে ‘পিসি যাও’, ২০২১-এ বঙ্গের ভোট-বাজারে আছড়ে পড়েছিল প্যারোডি। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও রাজনৈতিক দলগুলি গানকে করেছে অস্ত্র। তৃণমূলের জনগণের গর্জন/ বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন থেকে সিপিএমের জামাল কুদু-র প্যারোডি সাম্প্রতিককালে নেটমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।  কিন্তু, আজ থেকে প্রায় শতবর্ষ আগে ভোট নিয়ে গান বেঁধেছিলেন ‘বোতলপুরাণ’, ‘বিদূষক’ স্রষ্টা শরৎচন্দ্র পণ্ডিত (Sarat chndra Pandit) ওরফে ‘দাদাঠাকুর’ (Dadathakur)। কথার কারিকুরি, নিখাত রসিকতা আর ভেঁপু-ঢাক-চটপটির সঙ্গতে দাদাঠাকুরের ভোটের গান (Vote Song) এখনকার রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘হাওয়া গরম’ করতো না, মানুষের মনে ছুঁয়ে দিত ফুরফুরে হাওয়ার জিয়নকাঠি।

দাদাঠাকুরের জীবনের একটি বড়ো কীর্তি হল তেলেভাজা ও চানাচুর দোকানের মালিক কার্তিকচন্দ্র সাহাকে জঙ্গিপুর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার করা। কার্তিকচন্দ্র ছিলেন হাসিখুশি, প্রানবন্ত, সাহসী, স্পষ্টবাদী এক মানুষ। এই কার্তিকচন্দ্রকে খুব স্নেহ করতেন, ডাকতেন ‘কাত্তিকে’ বলে। এক বার কার্তিকচন্দ্রের ত্রৈমাসিক ট্যাক্স মিউনিসিপ্যালটি এক ধাক্কায় তিন আনা থেকে বাড়িয়ে করে দেয় ছ’আনা। এই বর্ধিত ট্যাক্সে স্বল্পআয়ী কার্তিকচন্দ্র ক্ষুণ্ণ হয়ে দাদাঠাকুরের দ্বারস্থ হন। দাদাঠাকুরও তাঁর ‘কাত্তিকে’-কে আশ্বস্ত করেন- ‘যাঁরা তোর দরখাস্তকে এ ভাবে অগ্রাহ্য করল সেখানেই বসাব তোকে’।

৫ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত মিউনিসিপ্যালিটির তৎকালীন চেয়ারম্যান পরলোকগমন করলে সুযোগ পেয়ে যান কার্তিকচন্দ্র। ওয়ার্ডে শুরু হয় উপনির্বাচন। সে সময় নিয়ম ছিল, যে বছরে দেড় টাকা ট্যাক্স দেয়, সে-ই মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচনে কমিশনারের পদপ্রার্থী হতে পারে। কার্তিকচন্দ্রের বাৎসরিক ট্যাক্স দেড় টাকা হওয়ায় তাঁর প্রার্থী হওয়ায় বাধা রইল না। তেলেভাজা-চানাচুরের দোকানের মালিক ভোটে প্রার্থী হয়েছে শুনে সারা শহরে সাড়া পড়ে গেল। বিপক্ষে দাঁড়ালেন স্থানীয় এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি।

‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ এ সম্পাদকীয়তে দাদাঠাকুর লিখলেন— ‘জঙ্গিপুর মিউনিসিপ্যালিটির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের অন্যতম কমিশনার বাবু ইন্দ্রচন্দ্র মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের মৃত্যু হওয়ায় তাঁহার স্থানে জনৈক কমিশনার নির্ব্বাচনের দিন ছিল ২৮ শে জুলাই। প্রার্থী ছিলেন দুইজন।… শ্রীযুক্ত কার্ত্তিকচন্দ্র সাহা অধিক সংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত হইয়া কমিশনার নির্ব্বাচিত হইয়াছেন। এই নির্ব্বাচনে একটু আন্দোলন উত্থিত হইয়াছে, যেহেতু নির্ব্বাচিত ব্যক্তি শিক্ষিত বা ধনাঢ্য নহে।…করদাতাগণ যাহাকে যোগ্য মনে করেন তিনিই যোগ্য। শুধু কমিশনার হইলে হয় না, দেশের কাজ করিবার প্রবৃত্তি থাকা চাই। সব বন তুলসী ভাবে সব সে শিলা শালগ্রাম,সব পানি গঙ্গা ভাবে যব ঘটমে বিরাজে রাম। দেখা যাক সাহাজীর দ্বারা কি হয়’ (বানান অপরিবর্তিত)।‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ থেকেই প্রকাশ্যে কার্তিকচন্দ্রের হয়ে প্রচার শুরু করেন দাদাঠাকুর। লিখে ফেলেন ভোটের গান, ছড়া। এই গান-ছড়ার মধ্যে ‘দাদাঠাকুর’ চলচ্চিত্রের সুবাদে বিখ্যাত-

 ‘ভোট দিয়ে যা-/ আয় ভোটার আয়/ মাছ কুটলে মুড়ো দিব/ গাই বিয়োলে দুধ দিব…।’

এবং

‘আমি ভোটের লাগিয়া ভিখারী সাজিনু

ফিরিনু গো দ্বারে দ্বারে

আমি ভিখারী না শিকারী গো

আমায় আসল কেউ না বলিল না…

 

তাদের মুখের ভাষায় ভুলিনু আশায়

জানি না বুকের ভাষা

তাদের মনের কথা মনই জানে

ভোট দিবে কি নাহি দিবে

বুঝি গাছে তুলে মই কেড়ে নেবে

আশায় খাটিনু চাষা

বুঝি খেটে খেটে খাটো হনু

ভাগ্যে আমার এই ছিল…

 

বলে সেন্ট পারসেন্ট ভোট তব

আমি তাতে রিলাই করি

দুহাতে বিলাই করি অভিনয়

আমি নেতা কি অভিনেতা

ঐ মালুম করিবে কে তা

আমি এই রূপে গত বারে

ফিরেছিনু দ্বারে দ্বারে…

 

মোরে ভুলাইয়ে প্রলোভনে

ভোট দিল অন্য জনে

মোর ডিপোজিট মানি হল জব্দ

আমার মান গেল মানিও গেল

আমি আসমান হতে পারলাম না দাদা

আমার আশা মান দুই চূর্ণ হল’।

দাদাঠাকুরের এই ‘ভোট রঙ্গের গান’ নিয়ে মহা সমারোহে নির্বাচনী প্রচার করার পর, ফল বেরোলে দেখা যায় বেশ ভাল ভোটের ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে বিজয়ী হন কার্তিকচন্দ্র। বিরোধী প্রার্থীর হয়ে, তাঁর বিরুদ্ধেই যায় দাদাঠাকুর রচিত এমন ছড়া বাংলার ভোটের ইতিহাসে অচিরেই নতুন অধ্যায় তৈরি করে। শুধু তাই নয়, দাদাঠাকুরের ‘ভোট রঙ্গের গান’ বুঝিয়ে দেয় যে, ভোট আসে ভোট যায়, রাজনীতির পরিকাঠামো আগেও যা ছিল, স্থান-প্রেক্ষিত-মুখ হেরফেরে এখনও সেখানেই গিয়েছে।

   

Developed by DXDasia