শান্তিনিকেতন গৃহ: শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রথম বাড়ি

এই বাড়ির নাম থেকেই পরে সমগ্র এলাকাটির নাম হয় শান্তিনিকেতন

হর্ষি দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর বোলপুরে পদার্পণ না করলে শান্তিনিকেতনের সৃষ্টিই হত না। একথা সকলেই জানেন। ১৮৬৩ সালে দেবেন্দ্রনাথ ভুবনডাঙা গ্রামে কুড়ি বিঘা জমির মৌরসি পাট্টা গ্রহণ করেন রায়পুরের ভুবনমোহন সিংহের কাছ থেকে। ঐ বছরেই ধূ ধূ প্রান্তরের মধ্যে একটি অতিথিশালার নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এটিই শান্তিনিকেতন আশ্রমের প্রথম বাড়ি। অতিথিদের জন্য নির্মিত মহর্ষি বাড়িটির নাম রাখেন ‘শান্তিনিকেতন’, যা পরে সমগ্র এলাকাটির নাম হয়।

এই বাড়ি এখন ‘স্মারক সংগ্রহশালা’। বাড়ির সামনে আছে প্রখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেজের একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য। একসময় বিভিন্ন বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট ছিল এই ভবন। ইতিহাস বিভাগ ছিল। ওড়িয়া বিভাগ ছিল।

শুরুতে বাড়িটি ছিল একতলা। আকারেও খুব বড়ো ছিল না। পরে দ্বিতল হয়। ১৮৬৩ সালে বাড়ি তৈরির জন্য ব্যবহার হয় ইট চুন সুরকি এবং কাঠের কড়ি বরগা। ঘর লাগোয়া স্নানঘর। কাঠের সিঁড়ি। টালি। বড়ো বড়ো জানলায় কাঠের খড়খড়ি। তৎকালীন সময়ে যথেষ্ট আধুনিকতার ছাপ ছিল নির্জন ভূখণ্ডে প্রথম বাড়ি নির্মাণে। মনে রাখতে হবে মহর্ষি উপাসনার জন্যই এই নির্জন স্থানটি বেছে নিয়েছিলেন। বাড়িটির উপরিভাগে উপনিষদের বাণী খোদিত আছে। ব্রহ্মধর্মের জন্য উপাসনা মন্দির নির্মাণের পূর্বে এই বাড়িতেই উপাসনা হত। পরে এই বাড়িই ছিল ভক্তবৃন্দের অতিথিশালা। যাঁরা কলকাতা থেকে আসতেন তাঁরা এই বাড়িতেই থাকতেন। আক্ষরিক অর্থেই এক ঐতিহাসিক বাড়ি। এই বাড়িকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে আজকের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। এই বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপনয়ন হয়। ১৮৮৩ সালে শেষবার মহর্ষি শান্তিনিকেতন বাড়িতে আসেন।

১৯০১ সালে প্রথম ব্রহ্ম বিদ্যালয়ের সূচনা হয়। সেই সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সপরিবারে এই বাড়িতেই বাস করেছেন। বাড়িটির সঙ্গে গাড়ি বারন্দাও আছে। বাড়ির সমস্ত আসবাবপত্র ছিল মহর্ষির নিজের পছন্দের। শুধুই তো প্রাণহীন একটি কোঠাবাড়ি নয়। বাড়িকে কেন্দ্র করে চারিদিকে গাছ, সামনে দুই সারি আমলকি। এই বাড়িকে আশ্রয় করেই শান্তিনিকেতন আশ্রমের চেহারা পায়। প্রশিক্ষিত মালির সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়। এই শুষ্ক লাল মাটি বহু রকমের গাছের ছোঁয়ায় চমৎকার একটি উদ্যানে পরিনত হয়। ক্রমে ক্রমে আশ্রম বিস্তার লাভ করে। ব্রহ্ম বিদ্যালয় গতি লাভ করে। প্রয়োজনে আয়োজন বৃদ্ধি পায়। নির্মাণ হয় একের পর এক বাড়ি। সূচনা হয়েছিল এই শান্তিনিকেতন বাড়ি থেকে। এই বাড়ি এখন ‘স্মারক সংগ্রহশালা’। বাড়ির সামনে আছে প্রখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেজের একটি বিমূর্ত ভাস্কর্য। একসময় বিভিন্ন বিষয়ের জন্য নির্দিষ্ট ছিল এই ভবন। ইতিহাস বিভাগ ছিল। ওড়িয়া বিভাগ ছিল।

 

ব্রহ্ম বিদ্যালয়ের প্রারম্ভে যে বাড়িটিকে আশ্রয় করে বিদ্যালয়ের ক্রমবৃদ্ধি হয় তার নাম প্রাক কুটির। সেই সময়ের প্রাক কুটিরের চেহারা বর্তমানে অনেকটা আধুনিক রূপ পেয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। সমসাময়িক অনেকগুলো বাড়ি ছিল যেগুলো এখন আর নেই। সেসব কথা পরবর্তী পর্বে। 

বীজের আকার অতি ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্র দেহে কি বিশাল শক্তি নিহিত থাকে প্রারম্ভে দূরদর্শী ভিন্ন অন্য কাহারো কল্পনায় তাহা ধরা পড়ে না। যে ক্ষুদ্র শক্তির প্রথম প্রকাশ অঙ্কুরে তাহাই ক্রমে শাখা প্রশাখায়, পাতায় পাতায় শুরু করে পথ চলা। সবশেষে পরিপুষ্ট কাণ্ড বিস্তারিত শাখা প্রশাখায় পরিণত হয় মহীরুহে। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা পরিকল্পনার বীজ শান্তিনিকেতনের ক্ষুদ্র ‘ব্রহ্মচর্যাশ্রম’। বট বীজের অঙ্কুরের মতই শৈশব কাটিয়ে ক্রমপর্যায়ে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় আজ সেই আশ্রমের বর্তমান রূপ। সেই সময়ের শান্তিনিকেতন বর্তমান মানচিত্রে নেই। হারিয়ে গেছে অনেক কিছু। কালের নিয়মে নষ্ট বা বদলে গেছে বহুকিছু। শুধুমাত্র নামে বেঁচে আছে স্মৃতির পাতায়। একসময় সেটাও ঝাপসা হতে হতে হারিয়ে যাবে। আদি মানচিত্রে প্রয়োজনের তাগিদে নতুন নতুন কত কি যোগ হয়েছে। হয়ে চলেছে। 

Developed by DXDasia