
কবির শিক্ষার্দশের বাস্তব রূপ
‘জীবনস্মৃতি’ গ্ৰন্থে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – “একদিন দেখিলাম, দাদা এবং আমার বয়োজ্যেষ্ঠ ভাগিনেয় সত্য ইস্কুলে গেলেন, কিন্তু আমি ইস্কুলে যাইবার যোগ্য বলিয়া গণ্য হইলাম না। উচ্চৈঃস্বরে কান্না ছাড়া যোগ্যতা প্রচার করার আর-কোনো উপায় আমার হাতে ছিল না।… যিনি আমাদের শিক্ষক ছিলেন তিনি আমার মোহবিনাশ করিবার জন্য প্রবল চপেটাঘাতসহ এই সারগর্ভ কথাটি বলিয়াছিলেন, এখন ইস্কুলে যাইবার জন্য যেমন কাঁদিতেছ, না যাবার জন্য ইহার চেয়ে অনেক বেশি কাঁদিতে হইবে।” পরে আরও দেখি – “বিদ্যালয়ের দেউড়ি পার হইয়া তাহার সংকীর্ণ আঙিনার মধ্যে পা দিবামাত্র তৎক্ষণাৎ সমস্ত মন বিমর্ষ হইয়া যাইত – অতএব, ইস্কুলের সঙ্গে আমার সেই পালাইবার সম্পর্ক আর ঘুচিল না।”

এইটি সন্তোষচন্দ্রের বাড়ি। এখানেই শিক্ষাসত্রের সূত্রপাত হয়
বাস্তবের সঙ্গে এই সংঘাতই কবির কাছে একটি নতুন বিদ্যালয় খোলার অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে শ্রীনিকেতনকে কেন্দ্র করে আরম্ভ হয়েছে তাঁর পল্লিভাবনার কর্মকাণ্ড। কবি এমন একটি বিদ্যালয় চাইলেন যেখানে তাঁর ভাবনা ও আদর্শ সার্থকভাবে রূপায়িত হবে।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই বিরূপ মনোভাব থেকেই ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠিত হল ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়। তাঁর বিদ্যালয়ে এমন একটি পরিবেশ তিনি সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন যেখানে প্রকৃতির একটি বিশেষ ভূমিকা থাকবে। তাঁর আশ্রম বিদ্যালয়ে এই নতুন ধারা, উন্মুক্ত প্রকৃতির কোলে শিক্ষাদান যথেষ্ট খ্যাতিলাভ করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথের মনে হচ্ছিল তাঁর আদর্শের সঙ্গে বাস্তবের এক অনিবার্য সংঘাত ঘটছে। ফলে তাঁর বিদ্যালয় আদর্শচ্যুত হয়ে গতানুগতিক আর পাঁচটা ইস্কুলের মতোই হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতির চাপে এবং অর্থাভাব লাঘব করতে প্রবল অনিচ্ছায় সবকিছুর সঙ্গেই তাঁকে আপোষ করতে হয়েছিল, এমনকি মানতে বাধ্য হয়েছিলেন পরীক্ষাব্যবস্থাকেও।
বাস্তবের সঙ্গে এই সংঘাতই কবির কাছে একটি নতুন বিদ্যালয় খোলার অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। ইতিমধ্যে শ্রীনিকেতনকে কেন্দ্র করে আরম্ভ হয়েছে তাঁর পল্লিভাবনার কর্মকাণ্ড। কবি এমন একটি বিদ্যালয় চাইলেন যেখানে তাঁর ভাবনা ও আদর্শ সার্থকভাবে রূপায়িত হবে। ১৯২৪ সালের ১ জুলাই শান্তিনিকেতনে সন্তোষচন্দ্র মজুমদারের গৃহপ্রাঙ্গণে মাত্র ছ’জন ছাত্রকে নিয়ে সূচনা হল দ্বিতীয় আর একটি বিদ্যালয়ের – কবির ইস্কুল : শিক্ষাসত্র। আজ যে সাড়ম্বরে তার শতবর্ষ পালনে উদ্যোগী।

শ্রীনিকেতনে স্থানান্তরিত হওয়ার পরবর্তীতে শিক্ষাসত্র
রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনে বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভেবেছেন, বলেছেন এবং লিখেছেন শিক্ষা বিষয়ে। বলা বাহুল্য, বাল্যকালের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আরও একটি অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল – শিলাইদহে জমিদারির কাজে গিয়ে হতদরিদ্র অশিক্ষিত মানুষদের সান্নিধ্যে আসা। তখনই তাঁর মনে হয়, শিক্ষা হবে প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অঙ্গ, সেটা ক্লাস নামধারী খাঁচার জিনিস হবে না। তাই দ্বিতীয় বার তিনি চেষ্টা করলেন তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার। সঙ্গীরূপে আরও অনেকের সঙ্গে পেলেন সন্তোষচন্দ্র এবং লেনার্ড নাইট এলমহার্স্টকে।

সূচনালগ্ন থেকেই শিক্ষাসত্র পরিচালনার ভার গ্ৰহণ করেছিলেন সন্তোষচন্দ্র। কিন্তু তিনি মাত্রই দুটি বছর শিক্ষাসত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯২৬ সালে তাঁর অকালপ্রয়াণ ঘটে। তবে এই দু’বছরের মধ্যেই তিনি রবীন্দ্রআদর্শকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সন্তোষচন্দ্রের মৃত্যুর পর শিক্ষাসত্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন উইলিয়ম আরিয়ম আর্যনায়কম। ১৯২৭ সালে শিক্ষাসত্র স্থানান্তরিত হয় শান্তিনিকেতন থেকে শ্রীনিকেতনে। এই স্থানান্তরণের কয়েকটি কারণ ছিল।

প্রথমত, সন্তোষচন্দ্রের মৃত্যুর পর এমন একজন দক্ষ প্রশাসক প্রয়োজন ছিল যিনি এই বিদ্যালয়ের প্রকৃত দায়িত্ব গ্ৰহণে সক্ষম। সেজন্য গ্ৰামজীবনের সঙ্গে জড়িত ও গ্ৰামসেবায় নিবেদিতপ্রাণ এলমহার্স্টের কথা কবির ভাবনায় আসে। কারণ এলমহার্স্ট তখন শ্রীনিকেতনের সঙ্গে মনেপ্রাণে যুক্ত। দ্বিতীয়ত, আশ্রম বিদ্যালয়ের ছাত্ররা অপেক্ষাকৃত ধনীগৃহের সন্তান ছিল। কিন্তু তৎকালীন শিক্ষাসত্রের অধিকাংশ ছাত্রই আসত দরিদ্রঘর থেকে। ফলে তাদের মধ্যে একটা হীনমন্যতাবোধও তৈরি হত। তৃতীয়ত, পরীক্ষা পাশ করাটাই শিক্ষাসত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল না। তাই এই ভৌগোলিক দূরত্বেরও আবশ্যিকতা ছিল।
জন্মলগ্ন থেকেই শিক্ষাসত্র ছিল আবাসিক বিদ্যালয়। ছাত্রাবাসে থাকা-খাওয়া প্রায় অবৈতনিকই ছিল। প্রয়োজনে ছাত্ররা বাড়ি থেকে চাল আনতে পারত। শিক্ষাসত্রে প্রথম থেকেই বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হত। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের পাশাপাশি তারা বয়নশিল্প, দারুশিল্প, বই-বাঁধাই, চর্মশিল্প, উদ্যানচর্চা, কৃষিকার্য ইত্যাদি বিষয়েও শিক্ষালাভ করত।

কিন্তু ১৯৩৯-৪০ সালের পর থেকে অভিভাবকদের প্রত্যাশার চাপে শিক্ষাসত্র রবীন্দ্রআদর্শ থেকে কিছুটা হলেও সরে আসতে বাধ্য হয়। ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়রূপে ঘোষিত হয়। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীনিকেতন বালিকা বিদ্যালয়টি ১৯৫৪ সালে শিক্ষাসত্রের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং শিক্ষাসত্রে সহ-পাঠক্রমিক শিক্ষা আরম্ভ হয়। ১৯৬২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাঠক্রমের নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষাসত্রের প্রথম দল পরীক্ষা দেয়। ১৯৬৪ সালে শিক্ষাসত্র বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। এর আগে বর্তমান শিক্ষাচর্চার স্থানে শিক্ষাসত্রের ক্লাস হত। রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ১৯৭২ সাল থেকে শিক্ষাসত্রে আবাসিক ছাত্রছাত্রী ভর্তি বন্ধ করা হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে শিক্ষাসত্র সম্পূর্ণ অনাবাসিক চরিত্র লাভ করে। সর্বভারতীয় মাধ্যমিক পাঠক্রমের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ১৯৭৪ সাল থেকে শিক্ষাসত্র দশম শ্রেণীর বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। ১৯৮৮ সালে শিশুদের জন্য সন্তোষ পাঠশালার পঠনপাঠন শুরু হয়। ২০০৯ সালে উত্তর-শিক্ষাসদনের অবলুপ্তি ঘটে এবং শিক্ষাসত্র ও পাঠভবনে একাদশ শ্রেণীর পাঠ শুরু হয়। বর্তমানে প্রায় এক সহস্র ছাত্রছাত্রী নিয়ে শিক্ষাসত্র শিশু শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

কোনও প্রতিষ্ঠান যখন শতবর্ষের শিখর স্পর্শ করে, তখন সেই মহীরুহের মধ্যে শিশুবৃক্ষটিকে খুঁজতে যাওয়া বৃথা। শিক্ষাসত্রের শতবর্ষের পথচলার চুম্বকসার আমার এই সংক্ষিপ্ত লেখায় বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি। বহিরঙ্গে যত পরিবর্তনই হোক না কেন শিক্ষাসত্র আজও স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। আগামী দিনে শিক্ষাসত্রের আরও উজ্জ্বল ও গৌরবময় ভবিষ্যতের জন্য অকুণ্ঠ শুভেচ্ছা রইল।
