বিশ্বভারতীর গ্রন্থ নির্মাণ সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটেছিল শান্তিনিকেতন প্রেসের হাত ধরে
১৩২৯ বঙ্গাব্দে ইন্ডিয়ান প্রেসের কর্ণধার চিন্তামণি ঘোষকে লেখা রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক পত্র—
“শান্তিনিকেতন বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠানটিকে যথাবিধি সর্বসাধারণের হাতে সমর্পণ করিয়াছি। আমার সমস্ত বাংলা বইগুলির স্বত্ব লেখাপড়া করিয়া বিশ্বভারতীর হাতে দিয়া আমি সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি লইয়াছি। এক্ষণে এই অধিকারের হস্তান্তর উপলক্ষে আমার গ্রন্থ প্রকাশের কোনো একটি সন্তোষজনক ব্যবস্থা হইতে পারিলে আমি অত্যন্ত নিশ্চিন্ত হইতে পারি। আশা করি বিশ্বভারতীর মঙ্গলের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া আপনি যথোচিত বিধান করিয়া দিবেন।” এরপর চিন্তামণি ঘোষ ১৯০৮ থেকে ১৯২৩ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান প্রেস থেকে প্রকাশিত একশোর বেশি বই ২৬,০০০ (ছাব্বিশ হাজার) টাকায় বিশ্বভারতীকে বিক্রি করে দিলেন। শুভারম্ভ হল বিশ্বভারতী গ্রন্থন-বিভাগের (Visva-Bharati Granthana Vibhaga)।

ইন্ডিয়ান প্রেসের কর্ণধার চিন্তামণি ঘোষকে লেখা রবীন্দ্রনাথের ঐতিহাসিক পত্র
গ্রন্থন-বিভাগ প্রতিষ্ঠার আগেই বিশ্বভারতীর গ্রন্থ নির্মাণ সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটেছিল শান্তিনিকেতন প্রেসের (Shantiniketan Press) হাত ধরে। ১৯১৭ সালে আমেরিকার লিঙ্কন শহরের বাসিন্দারা রবীন্দ্রনাথকে ‘দ্য লিঙ্কন প্রেস’ নামের একটি মুদ্রণযন্ত্র উপহার দেন। তাই দিয়ে শান্তিনিকেতনে স্থাপিত হয় ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’। এই প্রেস থেকেই ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় গ্রন্থনবিভাগের (তখন নাম ছিল বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়) প্রথম বই রবীন্দ্রনাথের ‘বসন্ত’ নাটিকা। এই প্রেস থেকেই ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি প্রবন্ধ, চিঠিপত্র, ডায়েরি, কথিকা নিয়ে প্রকাশিত হয় ‘সঙ্কলন’। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতন প্রেসের হাত ধরে বিশ্বভারতীর বইয়ের নিজস্ব ঘরানা তৈরি হোক। তথাপি, কলকাতায় ২১০ কর্নওয়ালিস স্ট্রিটে এবং জোড়াসাঁকোর ‘বিচিত্রা’ (Bichitra) বাড়িতে গ্রন্থনবিভাগের কাজ স্থানান্তরিত হয়, মূলত কাগজ, কালি, বাঁধাই, বিপণন ইত্যাদি সুবিধার জন্যই কলকাতার ‘মহতাশ্রম’ বাড়িতে গ্রন্থনবিভাগের স্থানান্তর। ভারতবর্ষে শুরু হয় মুদ্রণ জগতের নতুন যুগ।
১৯১৭ সালে আমেরিকার লিঙ্কন শহরের বাসিন্দারা রবীন্দ্রনাথকে ‘দ্য লিঙ্কন প্রেস’ নামের একটি মুদ্রণযন্ত্র উপহার দেন। তাই দিয়ে শান্তিনিকেতনে স্থাপিত হয় ‘শান্তিনিকেতন প্রেস’।
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্বভারতীর বইয়ের সমৃদ্ধ ঘরানা তৈরি করতে। বর্তমানে যে গৈরিক মলাটে বাঁধানো রবীন্দ্রনাথের বইয়ের নিরাভরণ অথচ পরিচ্ছন্ন রূপটি আমরা পাই, তা রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিদের পরিশ্রমের ফসল। অলংকরণের পথ পরিত্যাগ করছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘লাইব্রেরি’ রচনায় লিখছেন, “এখানে (বইয়ে) ভাষা চুপ করিয়া আছে, প্রবাহ স্থির হইয়া আছে, মানবত্মার অমর আলোক কালো অক্ষরের শৃঙ্খলে কাগজের কারাগারে বাঁধা পড়িয়া আছে।” এই কারাগার থেকে তাঁর লেখাকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বইয়ের ব্যাপারে জাপানিদের শৈলী তাঁর দৃষ্টিতে অনুসরণীয়, “জাপানীরা তলোয়ারে কারুকার্য্য করে, খাপ রাখে সাদা, যেহেতু তারা আর্টিস্ট…।” ক্রমেই বিভিন্ন ছবি সহযোগে বই ছাপানোর সংস্কৃতি থেকে সরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। গ্রন্থনবিভাগের সহকারী সচিব কিশোরীমোহন সাঁতরাকে নির্দেশ দিচ্ছেন, “মলাটে সাদা অক্ষরে বীথিকা যেন লেখা থাকে, আমি অলঙ্কৃত করে দেবো না।” গ্রন্থের বিষয়ই হল তার অলঙ্কার, হালকা গৈরিক বর্ণের মলাটে গ্রন্থ নাম এবং লেখক রবীন্দ্রনাথের নাম দিয়ে ছাপা বিশ্বভারতীর বই ভারতবর্ষের বইয়ের জগতে সন্ধান দিল নতুন পথের। বিশ্বভারতীর সংস্কৃতির ধারক হয়ে উঠল এইসব বই, নামহীনতার সংস্কৃতিকে তিনি এতদূর এগিয়ে নিয়ে গেলেন যে নামের পূর্বে ব্যবহৃত ‘শ্রী’ পর্যন্ত তুলে দিলেন। শ্রীবৃদ্ধি ঘটল বিশ্বভারতীর বইয়ের।

জোড়াসাঁকোর ‘বিচিত্রা’ বাড়িতে গ্রন্থনবিভাগের কাজ স্থানান্তরিত হয়
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের সুবাদে ছাপাখানা তথা প্রিন্টিং জগতে পরিবর্তন সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ অবগত ছিলেন। দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথকে জার্মানিতে প্রিন্টিং টেকনোলজি শিখতে পাঠাচ্ছেন, নীতীন্দ্রনাথ জার্মানি থেকে রবীন্দ্রনাথকে লিখছেন, “আমি এখন এখানকার এক ভাল ছাপাখানায় কাজ শিখছি। …এদের বিশেষত্ব রঙীন ছাপানো।” যদিও নীতীন্দ্রনাথ অকালেই প্রয়াত হন, তাঁর অভিজ্ঞতায় গ্রন্থনবিভাগ ঋদ্ধ হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ এই অভাব পূরণ করলেন। জার্মানিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরে ‘লেখন’ বা ‘বৈকালী’ মুদ্রণে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় বার্লিন থেকে শান্তিনিকেতন প্রেসের জন্য এমন একটি মেশিন আনার ব্যবস্থা করছেন, সেই প্রিন্ট মেশিন থেকে ছেপে বের হয় ‘স্ফুলিঙ্গের’ মতো কাব্যগ্রন্থ।
প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের পাশাপাশি কিশোরীমোহন সাঁতরা, পুলিনবিহারী সেন, চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রমুখ রবীন্দ্রানুরাগীর অক্লান্ত পরিশ্রমে গ্রন্থনবিভাগ সমৃদ্ধ হয়েছে। ‘রবীন্দ্র-রচনাবলী’-র ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে কী অসম্ভব নিষ্ঠা আর অধ্যাবসায়ে এঁরা রচনাবলীর একেকটি খণ্ড নির্মাণ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবৎকালে সম্পূর্ণ রচনাবলী দেখে যেতে পারেননি, পুলিনবিহারী সেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সম্পূর্ণ রবীন্দ্র রচনাবলী আজ বাঙালির ঘরে ঘরে শোভা পাচ্ছে।
জার্মানিতে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে রবীন্দ্রনাথের হস্তাক্ষরে ‘লেখন’ বা ‘বৈকালী’ মুদ্রণে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় বার্লিন থেকে শান্তিনিকেতন প্রেসের জন্য এমন একটি মেশিন আনার ব্যবস্থা করছেন, সেই প্রিন্ট মেশিন থেকে ছেপে বের হয় ‘স্ফুলিঙ্গের’ মতো কাব্যগ্রন্থ।
জনশিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছেয় গ্রন্থনবিভাগ ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’ ও ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ’ এই দুটি প্রকল্প হাতে নেয়। ‘লোকশিক্ষা গ্রন্থমালা’-র অন্তর্গত গ্রন্থের সংখ্যা ১৩টি এবং ‘বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ’-এর সংখ্যা ১৩৩টি। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর চারুচন্দ্র এবং পুলিনবিহারী এই প্রয়াস এগিয়ে নিয়ে যান।
বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ একশো বছর (Centenary Year of Granthana Vibhaga) অতিক্রান্ত করছে। বাংলা তথা ভারতবর্ষের মুদ্রণ ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ যে সমৃদ্ধির যাত্রা শুরু করেছিল এবং রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরেও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিদের হাত ধরে যাত্রাপথ আরও সুগম হয়েছিল। কিন্তু তার বর্তমান অবস্থাটি কেমন? রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত শান্তিনিকেতন প্রেস নানাকারণে বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রন্থস্বত্ব তুলে নেওয়ার পর থেকেই গ্রন্থনবিভাগ রবীন্দ্রনাথের বই প্রকাশের একচ্ছত্র অধিকার হারায়, ফলে অন্যান্য প্রকাশনী সংস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে থাকে তারা। তার অন্যতম একটি প্রধান কারণ হল বিশ্বভারতীর চেয়ে অন্যান্য প্রকাশনীর বই স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়। এছাড়া বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগের রয়েছে আউট অফ প্রিন্টের সমস্যা। যদিও অন্যান্য প্রকাশনীর বইগুলির মূল্য কম হলেও সেখানে অসংখ্য বানান ভুল। রুচিহীন এবং অযথা চাকচিক্যে পরিপূর্ণ সে সমস্ত বই। যে প্রবণতার হাত থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বইকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, আর যার জন্য গ্রন্থনবিভাগ স্থাপনের এত আয়োজন, স্বত্ব তুলে নেওয়ার পর সেটুকুও গেছে। যাঁরা রবীন্দ্রানুরাগী, তাঁরা এখনও বিশ্বভারতীর বই-ই খোঁজেন। তাই গ্রন্থনবিভাগ সম্বন্ধে আরও সচেতন হওয়া উচিত বর্তমান কর্মকর্তাদের। ২০২২ গ্রন্থনবিভাগের একশো বছর বর্ষপূর্তি। নিঃশব্দে কেটে গেল রবীন্দ্রনাথের অত্যন্ত সাধের গ্রন্থনবিভাগের গৌরবময় অধ্যায় উদযাপিত হওয়ার সুযোগ। ভারতীয় সাহিত্যে গ্রন্থনবিভাগের ইতিহাস বেঁচে থাকুক দীর্ঘ দীর্ঘ বছর।