
পুরুলিয়ার অন্যতম গর্ব রয়্যাল ছৌ একাডেমি
পুরুলিয়ার এক শান্ত গ্রাম বলরামপুর। রোডরুটে পুরুলিয়া থেকে ঠিক ৩৩ কিমি দূরে এই গ্রাম, যেখানে স্টেশনের নাম বরাভূম হলেও এলাকা বলরামপুর ডাকেই চেনেন সকলে। এখন প্রসঙ্গে আসা যাক। স্টেশন থেকে রেললাইনের ধারের কয়েকটি ক্ষেত জমি পেরোলেই এক বিরাট ঘেরা বাগান। তার খয়েরি গেটে লেখা ‘রয়্যাল ছৌ একাডেমি’। বলরামপুরের অন্যতম গর্ব এই ছৌ-এর ট্রুপ। ডাঃ সুখেন্দু বিশ্বাসের হাতে শুরু হয় এই একাডেমির। সাল ১৯৬২। তারপর বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে ১৯৮০ থেকে নতুন উদ্যমে শুরু হয় তাঁদের পথচলা। এরপর বহু শো, বহু জায়গায় ঘোরা। দেশ বিদেশ নানা জায়গায় পাওয়া পুরস্কারের ঝুলি ভারি হতে থাকে রয়্যাল ছৌ একাডেমির।
এই মুহূর্তে জনা চল্লিশ সদস্য তাঁদের দলে। যাঁদের অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী। লেখাপড়া সূত্রে আশপাশের গ্রাম থেকে এসে তাঁরা বাস করেন বলরামপুরেই। অধিকাংশেরই বয়স পঁচিশের নীচে। কেউ কেউ স্থানীয় বাসিন্দাও। সারাবছর নিজের অন্যান্য কাজ বা চাকরি সামলেও এভাবে টিকিয়ে রেখেছেন নিজেদের শিল্পীসত্ত্বা। সারা বছরে ঘুরে ফিরে নানা জায়গাতে শো করলেও পুরুলিয়া বইমেলা, ব্লক লেভেল প্রতিযোগিতা এবং বলরামপুর থানার পরিচালনায় কিছু অনুষ্ঠানে প্রতিবছরই দেখা যায় তাঁদের উপস্থাপনা। একটু সময় আন্দাজ করে ঘোরার রুটিন সাজাতে পারলে পুরুলিয়া ট্যুরে এ এক উপরি পাওয়া হয়ে উঠবেই আপনার।

এবছরের ব্লক লেভেল প্রতিযোগিতা সংগঠিত হয় বলরামপুরেই। সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করে রয়্যাল ছৌ একাডেমি। বর্তমানে কর্ণধার প্রণয় সিংসরদার জানান তাঁদের শো-পিছু খরচ প্রায় ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। এছাড়া থাকা, গাড়িভাড়া ও খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করে থাকেন উদ্যোক্তারাই। এছাড়াও তাঁর থেকে জানা যায় এখন তাঁদের এক-একটি মুখোশের দাম প্রায় তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকার কাছাকাছি। পোশাকের দামও সাড়ে চার হাজার টাকা প্রায় মাথাপিছু। এসমস্ত খরচা দলের পক্ষ থেকেই করা হয়ে থাকে। পোশাক বা মুখোশের খরচা নিয়ে ভাবতে হয় না শিল্পীদের। পুরুলিয়ার খুব কম জায়গাতেই ছৌ-এর মুখোশ ও পোশাক একইসঙ্গে কিনতে পাওয়া যায়। মুখোশের গ্রাম হিসাবে চড়িদা-র নাম সকলেই জানেন এখন। এছাড়া ঝালদার কোঁচাহাতু গ্রামে, বরাবাজার ও সোনাঝুরি নামক আরেক গ্রামেও পাওয়া যায় ছৌ-এর সাজপোশাক। এসমস্ত জায়গা থেকেই তাঁরা কিনে থাকেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
এ তো গেল পর্দার আড়ালের কথা। এবার আসা যাক সাফল্যের তালিকা। বলরামপুরের অন্যতম অভিভাবক সুখেন ডাক্তার অর্থাৎ ডাঃ সুখেন্দু বিশ্বাস এবং বর্তমান কর্ণধার প্রণয়বাবুর হাত ধরে একাধিকবার বিদেশযাত্রা হয় এই দলের। ১৯৯৯ সালে প্রথমবার রাশিয়ায়, মস্কো ফেস্টিভাল। দলকে দায়িত্ব সহকারে নিয়ে যান প্রণয় সিংসর্দার। এরপর ২০০১-এ নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, সিডনি ও ক্যানবেরা লাগাতার যাত্রা। দলের সঙ্গে যান সুখেন্দুবাবু। ২০০৫ সালে জার্মানিতে ছৌ বিষয়ক এক বক্তৃতায় নিমন্ত্রণ পান সুখেন্দুবাবু। সেখানে গিয়ে তিনি দীর্ঘ আলাপচারিতায় বিশ্ববাসীকে জানান ভারতের এই ঐতিহ্যের সম্পর্কে। এরপর আবার ২০০৯। সাংহাই এক্সপো ফেস্টিভালে দলকে নিয়ে যোগদান করেন প্রণয়বাবু। প্রণয়বাবুর কথায় জানা যায় সবচেয়ে বেশি শো হয় তাঁদের মেট্রো সিটিগুলিতে। কলকাতা, দিল্লি ও বম্বে।

২০০৫ সালেই ডেলিফিক কালচারাল গেমস’এ সাউথ কোরিয়ায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে এই দল। এছাড়া দিল্লি রিপাবলিক ডে ফেস্টিভ্যালে ২০০০ সালে ও ২০১৩ সালে দুবার প্রথম স্থান অধিকার করেন তাঁরা। ২০০০ সালে এই ফেস্টিভ্যালে রয়্যাল ছৌ একাডেমির তরফে অংশগ্রহণ করেন ১৫২ জন শিল্পী, যাঁদের প্রত্যেকেই ছাত্রছাত্রী। ইস্টার্ন জোন কালচারাল সেন্টারের স্পনশরশিপে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁরা।
বলতে গেলে এমন আরও হাজার গল্প আসে। হাজার সাফল্যের উল্লেখ করতে হয়। সেই খয়েরি দরজা খুলে বাগানে ঢুকলে ডানহাতের লম্বা চালাঘরটির শেষ ঘরে তিন আলমারি ভর্তি ট্রফি আর মেমেন্টোর কথাও আজ থাক। লম্বা বারান্দা জুড়ে টাঙানো ছৌ-এর মুখোশগুলি দেখে ভয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম ছোটবেলায়। সুখেন্দুবাবুর স্বপ্ন বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রণয়বাবু। দেশে বিদেশে ছুটে বেড়াচ্ছে এই দল। নিজেদের প্রতিভা দেখাচ্ছেন শিল্পীরা। আমরা কলকাতায় বসে মাতৃভাষায় লাগাতার পাঁচ মিনিট কথা বলতে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছি। হোটেলে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করছি বাংলা বলতে। অথচ সংস্কৃতির বোঝা কাঁধে নিয়ে রানারের মতো ছুটে চলেছে রয়্যাল ছৌ একাডেমি। নিজেদের ঐতিহ্যের বীজ ছড়িয়ে দিয়ে আসছে বিদেশের মাটিতেও।
