ছবির অন্তরালে ‘ছবি’ : রনি সেনের ‘ক্যাট স্টিকস’

ছবি জুড়ে পারস্পরিক নির্ভরতার দৃশ্য


নি সেনের ‘ক্যাট স্টিকস’ (২০১৯) ছবিটির একেবারে শুরুতেই রয়েছে একটি জরুরি ঘোষণা — “This is to call my dead friends back from the night”। অর্থাৎ, এই ছবির উদ্দেশ্য, পরিচালকের কিছু মৃত বন্ধুদের রাতের অন্ধকারের ভিতর থেকে ডেকে আনা। বন্ধুরা মৃত কেন? আমরা যাদের ছবিতে দেখতে পাই, তারা কি প্রেত? কেনই বা একটি ছবির উদ্দেশ্য, মৃত বন্ধুদের ডেকে আনা? রনি সেনের ছবির প্রারম্ভিক ঘোষণা এই প্রশ্নগুলিকে জাগিয়ে তোলে। কারণ ছবি ও দৃশ্যের তত্ত্বের সঙ্গে এই প্রশ্নগুলির গভীর যোগ।

‘মৃত বন্ধুদের ডেকে আনা’ বলতে হয়তো পরিচালক যে-কোনও ছবি ও দৃশ্যের সেই দার্শনিক উদ্দেশ্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন। আর এভাবেই ‘ক্যাট স্টিকস’ হয়ে উঠছে, “A film on the philosophy of an image”।

রোল্যাঁ বার্থ তাঁর বিখ্যাত বই ‘ক্যামেরা লুসিডা’-য় যে-কোনও ছবিকে মৃতের প্রত্যাবর্তন বলে কল্পনা করেছেন। তার কারণ, প্রত্যেকটি ছবি তার দৃশ্যের মাধ্যমে কোনও এক বিগত মুহূর্তকে বারবার ফিরিয়ে দেয় আমাদের কাছে। যখন আমরা কোনও ছবি দেখি— তা হয়তো আমাদের নিজেদেরই কোনও পুরোনো ছবি, তখন সেই ঘটে যাওয়া সময়, হারিয়ে যাওয়া বয়স, সবকিছুই আবার জীবন্ত হয়ে ফিরে আসে। ছবির কাজ যেন অনেকটা প্ল্যানচেটের মতো।

যদিও বার্থ তাঁর বইতে ‘ছবি’ বলতে স্থিরচিত্রের উপরই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, এই একই চিন্তা আমরা মুভিং ইমেজ বা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করতে পারি। মনে রাখতে হবে, আমরা এখানে একটি ছবির (স্থিরচিত্র কিংবা চলচ্চিত্র) বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করছি না। একটি ছবি ও তার দৃশ্যকে একটি entity বা সত্ত্বা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করছি— যে ছবি ও দৃশ্য তৈরি হয় ফটোগ্রাফার, চলচ্চিত্রকার, তার সাবজেক্ট এবং তার দর্শকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। তাই ‘মৃত বন্ধুদের ডেকে আনা’ বলতে হয়তো পরিচালক যে-কোনও ছবি ও দৃশ্যের সেই দার্শনিক উদ্দেশ্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন। আর এভাবেই ‘ক্যাট স্টিকস’ হয়ে উঠছে, “A film on the philosophy of an image”।

এই ছবির প্রকৃত বিষয় দৃশ্য। দৃশ্য কী এবং কী তার তাৎপর্য, এই হল ছবির অন্বেষণ। এই ছবির কাহিনি দৃশ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং অনেকক্ষেত্রে দৃশ্যকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে কাহিনি এগিয়েছে। এই প্রসঙ্গে ট্রান্সজেন্ডার চরিত্রটিকে ঘিরে একটি দৃশ্য আলোচনা করা যেতে পারে। আমরা প্রথম এই চরিত্রকে খাবার টেবিলে তাঁর ছেলের সঙ্গে বসে থাকতে দেখি। আমরা তখনও তাঁর লিঙ্গ পরিচয় পাইনি। এই দৃশ্যে দেখি, তিনি খালি গায়ে বসে নেশা করছেন। টেবিলের অন্য প্রান্তে তাঁর ছেলে ভাত খাওয়া শেষ করছে। সাদা দেওয়ালে একটি তাজমহলের ছবি এবং তার ঠিক পাশেই একটি ছোটো পারিবারিক ছবি— যে ছবিতে সম্ভবত তাঁর স্ত্রী রয়েছেন, তাঁকে এবং তাঁদের সন্তানকে নিয়ে। এই ছবিটি কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই খুব অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যাতে ছবিটির দিকে চোখ না যায়। পরবর্তী দৃশ্যে তাঁর লিঙ্গ পরিচয় পাওয়ার পর যদি আবার আমরা ফিরে যাই আগের দৃশ্যে, তখন এই অস্পষ্ট পারিবারিক ছবিটি হঠাৎ খুব সজাগ হয়ে ওঠে, যা এই মানুষটির জীবনের একটি দিক আমাদের সামনে তুলে ধরে। হয়তো তাঁর লিঙ্গ পরিচয় জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁরা হয়তো ডিভোর্সি। হয়তো তাঁদের সন্তান কখনও থাকে মায়ের কাছে, কখনও বাবার কাছে। সেই ছেলের একা একা ভাত খেয়ে থালা নামিয়ে রাখতে যাওয়ার মধ্যে এক অদ্ভুত কাঠিন্য প্রকাশ পায়। রাতে বাড়ি ফিরে একা ঘুমিয়ে থাকা ছেলের গায়ে চাদর টেনে দেন ক্লান্ত বাবা। বিছানার আরেক পাশে পড়ে থাকে শূন্য বালিশ। এই জন্যই কি তিনি নেশা করেন? যেমন ছবিতে অন্য চরিত্রেরাও বিভিন্ন কারণে নেশা করে— পালিয়ে যাওয়ার জন্য, ভুলে থাকার জন্য? দৃশ্যগুলিকে নিশ্চয় অন্যভাবেও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কারণ এই ছবির প্রত্যেকটি দৃশ্য একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের চিন্তাশক্তিকে উস্কে দেয়।

 


আমরা সাধারণ দর্শক সিনেমা বলতে মূলত বুঝি গল্প, যা না থাকলে সচরাচর আমরা কোনও ছবি উপভোগ করি না। ‘ক্যাট স্টিকস’ কাহিনি প্রধান ছবি না হলেও, একেবারে যে কাহিনি বিমুখ তা-ও নয়। এই ছবির আখ্যান প্রথাগত ভাবেই নির্মিত হয় চিত্রনাট্যের সংলাপ ও কার্যকলাপের দ্বারা, যার বিষয় অস্তিত্বের সংকট। এই সংকট সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আমাদের দেশের উপর বয়ে চলা এক চরম বিভ্রান্তিকর সময়ের মধ্যে থেকে উঠে এসেছে এই ছবি। ফ্যাসিস্ট সরকার, সাম্প্রদায়িক হিংসা, বেকারত্ব ইত্যাদি— যার ইঙ্গিত ছবির সংলাপে রয়েছে, ক্রমশ আমাদের গ্রাস করছে। আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। পথ খুঁজছি। ড্রাগ হয়ে উঠছে সেই পথের চাবিকাঠি। কিন্তু তারপর ঠেলে দিচ্ছে আরও কোনও গভীর সর্বনাশে। তবে, দৃশ্য নির্মাণের দিক থেকে এই ছবি যতটা গভীর, কাহিনির দিক দিয়ে ততটা নয়। কিছু জিনিস সন্দেহের উদ্রেক করে। যেমন, কেন ইদানীং ড্রাগ আসক্তি, অশালীন ভাষার প্রয়োগ ও এক ধরনের টক্সিক ম্যাসক্যুলিনিটির বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠছে তথাকথিত ভদ্রলোক মানসিকতার বিরোধিতা ও সামাজিক প্রথা ভাঙার একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি? কেনই বা ছবিতে মহিলা চরিত্ররা প্রান্তিক হয়ে থেকে গেলেন? এবং কেন একজন ট্রান্সজেন্ডার চরিত্রকে চিরাচরিত অবমাননার পরিসরে বেঁধে রাখা হলো?

‘ক্যাট স্টিকস’ কাহিনি প্রধান ছবি না হলেও, একেবারে যে কাহিনি বিমুখ তা-ও নয়। এই ছবির আখ্যান প্রথাগত ভাবেই নির্মিত হয় চিত্রনাট্যের সংলাপ ও কার্যকলাপের দ্বারা, যার বিষয় অস্তিত্বের সংকট। এই সংকট সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ আমাদের দেশের উপর বয়ে চলা এক চরম বিভ্রান্তিকর সময়ের মধ্যে থেকে উঠে এসেছে এই ছবি।

ছবিটি চিন্তা করতে বাধ্য করে বলেই এই প্রশ্নগুলি মাথায় আসে। তবে একদম শেষে পরিচালক এক অদ্ভুত সুন্দর পারস্পরিক নির্ভরতার দৃশ্য এঁকেছেন। একদিকে পাবলো নোংরা ঝোঁপের মধ্যে আরও অনেক অচেনা মানুষের সঙ্গে বসে ‘মাল’ ভাগাভাগি করে নেয়। তারা নেশা করে একসঙ্গে। অন্যদিকে ব্যাং তার বন্ধুকে বলে, ‘সমুদ্র দেখাবি বলেছিলি, নদীতে কেন নিয়ে এলি?’— এই কথাটির মধ্যে একটি আশা লুকিয়ে রয়েছে। নদী হয়তো কোনওদিন সমুদ্রে গিয়ে মিশবে— সেই ভরসাতেই দুই বন্ধু নৌকায় উঠে বসে। এন্ড ক্রেডিটসে মৌসুমী ভৌমিকের গান বাড়তি পাওনা।

___________________ 
ক্যাট স্টিকস (২০১৯) | স্ক্রিনপ্লে ও পরিচালনা: রনি সেন | অভিনয়: তন্ময় ধানানিয়া, জয়রাজ ভট্টাচার্য, সৌমককান্তি দে বিশ্বাস প্রমুখ | ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার: স্ল্যামড্যান্স ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, লস এঞ্জেলেস | ছবিটি বর্তমানে দেখা যাচ্ছে প্রাইম ভিডিওতে

 

Developed by DXDasia