সাবেক কলকাতার ভিস্তিওয়ালাদের নিয়ে এই প্রথম তথ্যচিত্র, পরিচালক ফারহা খাতুন

ফারহা খাতুনের তথ্যচিত্র ‘রিপলস আন্ডার দ্য স্কিন’ দেখানো হবে KIFF-এ

শেখ নাজিম, ৬৫ বছর বয়সী কলকাতা শহরের একজন পুরোনো ভিস্তিওয়ালা। শহরের চলমান ইতিহাস। প্রান্তিক সেই মানুষের জীবন নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘রিপলস আন্ডার দ্য স্কিন’ দেখানো হবে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে।

শেখ নাজিম (Sheikh Nazim), ৬৫ বছর বয়সী কলকাতা শহরের একজন পুরোনো ভিস্তিওয়ালা। শহরের রাজপথ থেকে গলিপথ যিনি হেঁটে চলেন প্রতিদিন। শহরের ইট, কাঠ, পাথরের কত কত ইতিহাস যেন তিনিও ধারণ করে আছেন। দ্রুত বদলে যাওয়া শহরটায় আজ তিনি প্রায় একা। অথচ তাঁর বিরাম নেই। এই বিরামহীনতাই নাজিমকে পৌঁছে দিচ্ছে মানুষের কাছে। ভিস্তিওয়ালাদের কাছে মশকই হল তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন। যার মধ্যে শুধু জল নয়, ধরা থাকে অতীত। তথ্যচিত্র নির্মাতা ফারহা খাতুনের ‘রিপলস আন্ডার দ্য স্কিন’ (Ripples Under the Skin)-এ বর্ণিত আছে শহরের ইতিহাস। তথ্যচিত্রের প্রধান মুখ ভিস্তিওয়ালা শেখ নাজিম।

এই তথ্যচিত্র আসলে কলকাতার গল্প। তবে গ্ল্যামারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রায়ান্ধকার মানুষের গল্প বলতে চেয়েছেন ফারহা। তথ্যচিত্রটির বিষয় একজন অভিবাসী শ্রমিক সম্প্রদায়ের মানুষের রোজনামচা। একসময় নাজিমের মতো বহু মানুষ বিহার বা ঝাড়খণ্ড থেকে কলকাতায় এসেছিলেন জীবিকা নির্বাহ করতে। তারপর এই শহরটা তাঁদের কাছে হয়ে উঠল ভরসার জায়গা। মাথা গোঁজার ঠাঁই দিল, দুমুঠো খাবার দিল, সামান্য টাকাকড়ি দিল। এই শহরেই কোনোরকমে একটা বাড়ি তৈরি করলেন ভিস্তিরা কেউবা ভাড়া ভাড়িতেই কাটিয়ে দিলেন আজীবন। কলকাতা এমন একটি শহর, যা নাজিম চাচাদের মতো বহু মানুষের পরিশ্রমে পুষ্টি যোগায়, জল দেয়, তবুও মানুষ সময়ের সঙ্গে তাঁদের ভুলে যায়। যদিও ভিস্তিদের জল ধরে রাখার গল্প আজ ইতিহাসের পাতায় বুকমার্ক হয়ে গেছে।

তথ্যচিত্রটির বিষয় একজন অভিবাসী শ্রমিক সম্প্রদায়ের মানুষের রোজনামচা। একসময় নাজিমের মতো বহু মানুষ বিহার বা ঝাড়খণ্ড থেকে কলকাতায় এসেছিলেন জীবিকা নির্বাহ করতে। তারপর এই শহরটা তাঁদের কাছে হয়ে উঠল ভরসার জায়গা।

ফারহা খাতুন (Farha Khatun) পরিচালিত এবং ফিল্মস ডিভিশন প্রযোজিত ‘রিপলস আন্ডার দ্য স্কিন’ প্রদর্শিত হতে চলেছে ২৮তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (28th KIFF) শর্ট এবং ডক্যুমেন্টারি প্যানোরমা বিভাগে। ছবিটির কথা বলতে গিয়ে ফারহা বলেন, “আমি নিজেও এই শহরে একজন অভিবাসী হিসেবে, জীবিকা নির্বাহের জন্য এসেছিলাম। নাজিম চাচার জীবনের গল্প আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। প্রবল সংগ্রামের মধ্যে তাঁদের মতো কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য একসঙ্গে লড়াই করেন, একে অপরকে সাহায্য করেন। আমার এই ছবি সংগ্রামী মানুষদের সংহতির গল্প বলে, যা নাজিম চাচার মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়েছিলাম।”

তথ্যচিত্রের ট্রেলার

ফারহা খাতুন। মেদিনীপুরের বেলদা নামক এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে তিনি। কলকাতার রূপকলা কেন্দ্রে পড়তে এসেছিলেন চলচ্চিত্র সম্পাদনা নিয়ে। এখানেই কাজের হাতেখড়ি। একজন মহিলা সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে এই সমাজ শুরুতে তাঁকে স্বাগত জানায়নি। স্বাগত জানায়নি ফারহার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানকেও। শেখ নাজিমের মধ্যে ফারহা যেন নিজেকেই খুঁজে পেলেন। এক সাংবাদিক বন্ধুর সূত্রে যোগাযোগ হয় মধ্য কলকাতার ৬৫ বছর বয়সী ভিস্তিওয়ালা শেখ নাজিমের সঙ্গে। নাজিম এখনও প্রতিদিন কাঁধে করে বয়ে বেড়ান জল। ফারহা বলেন, “এই তথ্যচিত্রে আমি প্রান্তিক মানুষের কথা বলতে চেয়েছি। জলের সঙ্গে মানুষের সংযোগ রয়েছে। নাজিম চাচাও যেন সেই সংযোগের অংশ।”

ফারহা খাতুন

‘আই অ্যাম বনি’ (I am Bonnie) নামক এক তথ্যচিত্রের অন্যতম পরিচালক ছিলেন ফারহা (এই তথ্যচিত্রের আরও দুই পরিচালক শতরূপা সাঁতরা এবং সৌরভ কান্তি দত্ত)। নিজে পরিচালনা করেছেন তথ্যচিত্র ‘হোলি রাইটস’ (Holy Rights)। যে ছবিটি ২০২১ সালে জাতীয় পুরস্কার পায়। উর্দু ভাষায় নির্মিত ৫৩ মিনিটের সেই তথ্যচিত্রের বিষয়বস্তু ছিল মুসলিম মহিলাদের কাজি হওয়ার প্রশিক্ষণ। তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি ‘রিপলস আন্ডার দ্য স্কিন’। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ছাড়াও এ ছবি প্রদর্শিত হয়েছে স্পেনের বার্সেলোনা ইন্টারন্যাশনাল এনভাইরনমেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (Barcelona International Environmental Film Festival, Spain), আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের কুইনস ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল (Queens World Film Festival, USA), হিমাচল প্রদেশের সিমলা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (International Film Festival of Shimla, India) মতো জায়গায়।

একটা সময় যখন শহরগুলোতে পাইপলাইন দিয়ে জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না, তখন ভিস্তিওয়ালাদের ওপরই নির্ভর করতে হত শহুরে মানুষকে। ছাগলের চামড়ায় তৈরি এক ধরনের ব্যাগে তাঁরা জল ভর্তি করে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে দিতেন। এই বিশেষভাবে তৈরি ব্যাগকে বলা হত ‘মশক’। ভিস্তিওয়ালাদের মশকে জল থাকত ঠান্ডা। ‘বেহেশত’ একটি ফার্সি শব্দ, যার বাংলা অর্থ ‘স্বর্গ’। এই ‘বেহেশত’ থেকে ‘ভিস্তি’ কথাটি এসেছে। কাঁধে মশক নিয়ে ভোরবেলা থেকেই মহানগরীর পথে পথে ঘুরে বেড়াতেন তাঁরা। রান্না আর স্নানের কাজে লাগত তাঁদের সরবরাহ করা জল। ১৯৪০-৫০ সাল পর্যন্ত কলকাতার কয়েকটি রাস্তা ধোয়ার কাজেও ভিস্তিওয়ালাদের জল কাজে লাগত। কলকাতা আর ঢাকাতে ছিল আলাদা ভিস্তিপল্লি। এখন অবশ্য পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভিস্তিওয়ালাদেরও বেছে নিতে হচ্ছে অন্য পেশা। তবে এখনও কিছু ভিস্তিওয়ালা নিয়মিত জল সরবরাহ করেন মধ্য কলকাতার কয়েকটি গৃহস্থ বাড়ি আর দোকানে। তাঁদের মধ্যে একজন শেখ নাজিম।

তথ্যচিত্রের অফিশিয়াল পোস্টার

বৃদ্ধ বয়সে এই জীবিকা নির্বাহ করা খুবই কঠিন। শেখ নাজিম একতলায় জল সরবরাহের জন্য ১০ টাকা এবং উপরের তলার জন্য ২০-৩০ টাকা পারিশ্রমিক নেন। একটা সময় নাজিম প্রতিদিন চল্লিশ মশক জল সরবরাহ করতেন। বর্তমানে তা পৌঁছেছে আট থেকে দশ মশকে। আগে কিছু পরিবার ভিস্তিদের থেকে জল নিতেন, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শেখ নাজিম শুধুমাত্র মাংস বিক্রেতা ও চায়ের দোকানে জল সরবরাহ করেন। তথ্যচিত্র তো অনেক দূরের বিষয়, শেষ কবে নিজেকে দেখেছেন তাও তিনি মনে করতে পারেন না।

জানা গিয়েছে, কলকাতার জনা চল্লিশেক ভিস্তিওয়ালা এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন এই পারিবারিক পেশা। তাঁদের বেশিরভাগই আদতে বাস করেন বিহারের কাটিয়ারে। মধ্য কলকাতায় ঘর ভাড়া করে থাকেন তাঁরা। কেউ কেউ কলকাতাতেই বাড়ি করেছেন। একটি মশকে জল ধরে ৩০ লিটারের কাছাকাছি। রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড, বৃন্দাবন দাস লেন, মারকুইস স্ট্রিট, ইলিয়ট রোড, মার্কুইস স্ট্রিটের বাড়ি এবং দোকান মিলিয়ে একেকজন ভিস্তিওয়ালা দিনে দুবেলা মোটামুটি ৩০টি বাড়িতে জল পৌঁছে দেন। কলকাতা ছাড়াও এই পেশা টিকে রয়েছে রাজধানী দিল্লিতেও।

একটা সময় যখন শহরগুলোতে পাইপলাইন দিয়ে জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না, তখন ভিস্তিওয়ালাদের ওপরই নির্ভর করতে হত শহুরে মানুষকে। ছাগলের চামড়ায় তৈরি এক ধরনের ব্যাগে তাঁরা জল ভর্তি করে শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে দিতেন।

ছবিটি শুটিংয়ের সময় বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের বিতর্কিত আইন সিএএ (CAA) নিয়ে দেশজুড়ে প্রতিবাদ চলছিল। প্রতিবাদ কি অনুরণিত হচ্ছিল শেখ নাজিমের মধ্যেও? হয়তো সে প্রতিবাদ ভীষণ চাপা। তবুও যেন জলের মতো বয়ে যাচ্ছিল হিমশীতল লড়াই। ভোর থেকে শুরু হয় পথে পথে ঘোরা, তারপর বাড়িতে বা দোকানে জল দেওয়া। পারিশ্রমিক হিসেবে যা পান, তাতেই সন্তুষ্ট তিনি। এই কাজে মনের জোরের পাশাপাশি লাগে কাঁধের জোরও। অত সহজে নুইয়ে গেলে ইতিহাস ধারণথ করে রাখবেন কী করে! চলমান এই ইতিহাসের কথাই উঠে এসেছে ফারহা খাতুনের তথ্যচিত্রটিতে। সাঁকো হিসেবে কাজ করেছে ক্যামেরা এবং অ্যাকশন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, হিন্দি ভাষায় নির্মিত ২৯ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘রিপলস আন্ডার দ্য স্কিন’ কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে আগামী ১৯ ডিসেম্বর, দুপুর ২টোয়, নন্দন-৩ এবং ২১ ডিসেম্বর, দুপুর দেড়টায়, শিশির মঞ্চে।

____

ফারহা খাতুনের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা

Developed by DXDasia