
‘অনুসন্ধান’ মানুষের একাকিত্বকে ব্যক্ত করেছে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে
নিষ্পলক মধ্যবিত্ত জীবনের চাওয়া আর পাওয়াগুলো গুলিয়ে যায় অনেক সময়। সময়ের সঙ্গে যুঝতে না পারা মধ্যবিত্ত মানসিকতার ঝোঁক তখন উচ্চাকাঙ্ক্ষার দিকে ছুটতে থাকে৷ হয়ে ওঠে একে অপরের প্রতিযোগী। কিন্তু এই ইঁদুর দৌড়ে হারিয়ে যেতে থাকে মনের জৌলুস আর আস্ত একটা বেঁচে থাকা। বাঁচার মতো করে বাঁচার খিদে তখন হয়ে দাঁড়ায় লোভ-প্রতিহিংসা-ক্ষমতার খিদে। পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক ছবি ‘অনুসন্ধান’ দেখে এই কথাগুলোই বারবার পাক খায়। মাথার ভিতর গিজগিজ করে। ইচ্ছা করে নিজেকে প্রশ্ন করি, নিজেকেও কোর্টরুমে দাঁড় করিয়ে দেখি।
‘অনুসন্ধান’ ছবিটি নির্মিত হয়েছে ফ্রেডরিক ডুরেনম্যাট-এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আ ডেঞ্জারাস গেম’ (১৯৫৬) অবলম্বনে। এর আগে এই টেক্সটের আধারে তৈরি হয়েছে কানাডিয়ান, হিন্দি ও মারাঠি ছবি। বাংলায় মঞ্চস্থ হয়েছে ‘চোপ! আদালত চলছে’-র মতো নাটক। তারই নবতম সংযোজন কমলেশ্বরের এই ছবি। ছবির পরতে পরতে রহস্য। একটা অ্যাক্সিডেন্ট, একটা বাড়ি, একটা সাজানো কোর্টরুম সবকিছু মিলে জড়ো হয়েছে অপরাধ আর অপরাধীকে চিহ্নিত করবে বলে। তবে মূল উপন্যাস থেকে ‘অনুসন্ধান’ অনেকখানিই আলাদা। এখনকার রূঢ় বাস্তব সমাজ ও জীবনকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক।
কাজের জরুরি ডাকে পুজোর মধ্যেই লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন ছবির প্রোটাগনিস্ট (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়)। লন্ডনের রাস্তায় হঠাৎ এক দুর্ঘটনার সম্মুখীন হন তিনি। বিপদে পড়ে ঢুকে পড়েন এক বাংলোতে, যেখানে সকলেই উকিল (জয়দীপ মুখার্জি, চূর্ণী গাঙ্গুলি, ঋদ্ধি সেন, প্রিয়াঙ্কা সরকার)। বাড়িতেই কোর্ট রুম বানিয়ে সেখানে অপরাধ নিয়ে চলে ‘খেলা’। পরিবারের সকলের জেরায় রহস্য একটু একটু করে জট খোলে। কী সেই রহস্য জানতে অবশ্যই ছবিটি দেখতে হবে।
পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় এ ছবি প্রসঙ্গে লিখেছেন, “রবি ঠাকুর বর্ণিত ‘পথের প্রান্তের তীর্থে’-র দিকে দ্রুত ছুটে চলে আমরা মোক্ষলাভের চেষ্টা করছি। কিন্তু সেই রবি ঠাকুরেরই ‘পথের দুধারে’ থাকা মানুষের ‘দেবালয়ের’ দিকে তাকিয়ে দু-দণ্ড এ কথা ভাবার অবকাশ আমাদের নেই, যে আমার সতীর্থ বা আমার প্রতিবেশী অথবা আমার সহনাগরিক ঠিক কেমন আছেন! মুহূর্তে হয়তো আমরা পৌঁছেও যাচ্ছি সাফল্যের শিখরে। কিন্তু সেই অনন্যসাধারণ উচ্চতায় পৌঁছতে আমরা বারংবার সাধারণের কাছে অপরাধী হয়ে যাচ্ছি না তো?”
প্রিমিয়ারে ছবির কলাকুশলীরা
এই সমাজে লড়তে লড়তে যাঁরা একটু পিছিয়ে পড়লেন, তাঁদের প্রতি মানুষ কতটা দায়বদ্ধ, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে ‘অনুসন্ধান’। অনুসন্ধান আসলে নিজেকে সন্ধানের দিকটি চিহ্নিত করেছে আঙুল তুলে। পরিচালকের ভাষায়, “আমাদের সিঁড়ি ও শিরদাঁড়া ভেঙে রোজকার সেই সমৃদ্ধি আর খ্যাতির পাহাড় চড়ার পথে যে নিত্তনৈমিত্তিক অপরাধ আমরা করেই চলেছি — তা আইন বা আদালতের চোখে হয়তো অপরাধ নয়। কিন্তু কখনও জনান্তিকে নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কি আমাদের একবারও এ কথা মনে হয় না, যে আপাত উন্নতির মুকুট মাথায় চড়াতে গিয়ে আমরা একা হচ্ছি, অমানুষ হচ্ছি, অপরাধী হচ্ছি রোজ।”
তাই এই বিচারসভা। হয়তো অলীক, হয়তো অলীক নয়। সাইকোলজিক্যাল এই থ্রিলারে সঙ্গত আবহ নির্মাণ করেছেন দেবাশিস সোম এবং অভিজিৎ বিশ্বাস। ফ্রেম, চরিত্র আর কাহিনির মেজাজ অনুযায়ী আবহ মন ছুঁয়ে যায়। অনুপম রায়ের সংগীত পরিচালনা মানানসই। টুবানের চিত্রগ্রহণ এবং রবিরঞ্জন মৈত্রের সম্পাদনা টানটান রহস্য বজায় রাখতে সফল হয়েছে। আর রইল বাকি অভিনয়। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, জয়দীপ মুখার্জি এবং চূর্ণী গাঙ্গুলি অনবদ্য। চরিত্রকে অসম্ভব করে তুলেছেন তাঁরা। চারিত্রিক গঠন এবং মেজাজ অনুযায়ী তুলনামূলকভাবে বেমানান ঋদ্ধি সেন ও প্রিয়াঙ্কা সরকার৷ বিশেষত, প্রিয়াঙ্কাকে তাঁর চরিত্রের অভিনয়ে মানানসই বলে মনে হয়নি। স্বল্প চরিত্রে স্বয়ং পরিচালকের উপস্থিতি নজর কেড়েছে। কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় পরিচালক তো বটেই, পাশাপাশি তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী অভিনেতাও। এই ছবিতেও তার প্রমাণ দিয়েছেন।
যন্ত্র আর ব্যস্ততার দুনিয়ায় মানুষ বড়ো একা। ‘অনুসন্ধান’ এই একাকিত্বকে ব্যক্ত করেছে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে। অতএব সময়ের দাবি মেনে এ ছবিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতেই হচ্ছে। সিনেমা দেখার পর যা যা প্রশ্ন নিয়ে বেরোলাম আর যা যা উত্তর এখনও খুঁজছি — সেসব বড়োই জটিল। সুবিধার্থে এক ঝলক এ লেখার শেষে দেওয়া রইল।
১. কথা দিয়ে কথা না রাখা কি অপরাধ?
২. আইন সুবিচার দেয়। তাহলে সেই আইন বদলে যায় কী করে?
৩. গতকাল যা অপরাধ, আজ তা অভিযোগ, আগামিকাল তাই কি আইনসিদ্ধ?
পরিচালক আর আমার প্রশ্ন মিলেমিশে একাকার। দুজনেই উত্তর খুঁজছি। ছবিতে তার সংকেত রয়েছে, যাচাই করবেন আপনিও। মনে রাখবেন, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে”।
