
ঐতিহাসিক মংপুর রবীন্দ্র ভবনের দেখভাল করেন শিশির রাউথ
করোনার জেরে এখন চারদিকে লকডাউন চলছে । আর এই লকডাউনের সময়ও প্রতিদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মংপু নিবাসী শিশির রাউথ। গতকাল অর্থাৎ পঁচিশে বৈশাখে কবির স্মৃতি বিজড়িত মংপু রবীন্দ্র ভবনে কবিকে শ্রদ্ধা জানালেন তিনি। বছরের প্রত্যেকটা দিন হৃদয়ে থাকেন রবীন্দ্রনাথ।

শিশির রাউথ ঐতিহাসিক মংপুর রবীন্দ্র ভবনের দেখভাল করেন। সেখানে কবির ব্যবহার করা কোনও চেয়ার টেবিলে ধুলো পড়লে তা নিজের হাতে কাপড় দিয়ে মুছে দেন। কোনও পর্যটক এলে কবির স্মৃতি বিজড়িত ভবনটি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেন। কখনও খালি গলায় গেয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের গান। দেশি বিদেশি পর্যটকরা তাঁর এই কবি প্রেম দেখে মুগ্ধ হন। কেউ কেউ তাঁর ব্যবহারে খুশি হয়ে হাতে কিছু টাকাও গুঁজে দেন সাম্মানিক হিসেবে। যদিও এখন লকডাউন চলতে থাকায় কোনও পর্যটক নেই পাহাড়ে। ফলে মংপুর রবীন্দ্র ভবন এখন শূন্য। শিশিরবাবু জানান, ২০০০ সাল থেকে এই ভবনের প্রতি তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। কবির কাছে আলাদা করে কোনো জাতধর্ম ছিল না। সবাইকে বিচার করতেন মানুষ হিসেবে। শিশিরবাবু চেষ্টা করেন তাঁর নিজের জীবনেও তার প্রভাব ফেলার।
মংপুরে বারবার এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। প্রথমবার আসেন ১৯৩৭ সালের ২১ মে। তারপর ১৯৩৯ ও ১৯৪০ সালে একাধিকবার রবীন্দ্রনাথ মংপুতে সময় কাটিয়েছেন। এখানে শুধুমাত্র লেখালেখিই করেননি, ডাক্তারিও করেছেন। আজও মংপুরের সেই ভবনে কিছু বায়োকেমিক মেডিসিনের শিশি রয়েছে। ম্যালেরিয়া ছাড়াও অন্য অনেক রোগের জন্য কবি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বায়োকেমিক ওষুধ বিলি করতেন। চিকিৎসাশাস্ত্র বিশেষ করে হোমিওপ্যাথি ও বায়োকেমিক ওষুধের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল রবীন্দ্রনাথের। এমনকি বিশ্বভারতীতে একবার ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী প্রবেশের আগে তিনি সকলকে তেউরি, নিম, গুলঞ্চ, নিশিন্দা, থানকুনি বেটে তৈরি করেছিলেন ভেষজ পঞ্চতিক্ত পাচন। তা খাওয়াতে বিশ্বভারতীতে ইনফ্লুয়েঞ্জা আর দাঁত ফোটাতে পারেনি। রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধিতে তিনি ভাত, ডাল, শাকসবজি, ফল খাওয়ার ওপর জোর দিতেন বেশি। অল্প আহার এবং বেশি আহার দুটোই শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক বলে কবি অভিমত দিয়ে গিয়েছেন। নিয়মিত বিভিন্ন মেডিকেল জার্নাল পড়ে তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতেন। আজ করোনা মহামারীর সময় কবির জন্মদিন পালনের মুহূর্তে তাঁর স্বাস্থ্য চেতনা নিয়ে বেশি বেশি করে আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন শিশির রাউথ।

শিশিরের বাবা প্রয়াত দেবীরাম রাউথ একসময় রবীন্দ্র ভবন গ্রন্থাগার দেখভাল করতেন। শিশির বলেন, "আজ আমাদের বড়ো অহংকার হয়ে গিয়েছে। আমরা পরম শক্তিমানকে বিশ্বাস করি না। মংপু সিঙ্কোনা প্ল্যানটেশনের সামনেই কবি এই রবীন্দ্র ভবনে আসতেন সাহস করে। তখন এই পাহাড়ি এলাকায় ম্যালেরিয়া ছিল নিত্যকার ঘটনা। শুনেছি কবি এখানে সাহস করে এসে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি ম্যালেরিয়া, জ্বরের ওষুধ বিলি করতেন পাহাড়বাসীদের মধ্যে। আজ আমরা কবির বিজ্ঞান চিন্তাকে কতটা গ্রহণ করতে পেরেছি! এখানে এসে প্রকৃতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিতেন রবীন্দ্রনাথ। আর এই মংপুতেই কিন্তু ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক সিঙ্কোনা গাছের ছাল থেকে ক্যুইনাইন তৈরি হত। মংপুর পাহাড়ে অনেক ওষধি গাছ রয়েছে। আমরা সেসব নিয়ে গবেষণা করলে হয়তো অনেক রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারি নতুন করে। কে জানে, এসব ভেষজ থেকেই করোনার অন্ধকার মুক্তির কোনও আলো আসবে না? কবির জন্মদিন পালনের সঙ্গে কবির চিকিৎসা ভাবনা, প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম থেকে শিক্ষা নিলে আমরা আমাদের অহংকার মুক্তির দাওয়াই পাব কিনা, প্রশ্ন তোলেন শিশির।
ছবিঃ প্রতিবেদক।
