‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর বিরুদ্ধে পোস্টার পড়ল সারা বাংলাদেশ জুড়ে

দুই বাংলার মহাকাব্য, ২য় পর্ব

‘ভারতীয় দালাল প্রতিরোধ কমিটি’-র এই পোস্টার তখন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। পোস্টারে বাঁ দিকে বেলাল চৌধুরী, মাঝখানে সুফিয়া কামাল এবং ডান দিকে নাসিরউদ্দিন ইউসুফের ব্যঙ্গচিত্র। 

১৯৯১তে প্রথম ঢাকা যাই ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিয়ে আলোচনা করতে। এটা আমার ওপার বাংলায় প্রথম পা ফেলা। সঙ্গে ছিলেন কলকাতা দূরদর্শনের তৎকালীন ডেপুটি ডিরেক্টর। সুনীলদার কাছে বিষয়টা উত্থাপনের  দু’তিন বছর আগে থেকে মাথায় এই পরিকল্পনাটা চলছিল। সেই সময় দূরদর্শনের জন্য বহু রকমের প্রযোজনার সুবাদে এই ডেপুটি ডিরেক্টরের সঙ্গে একটা সখ্য তৈরি হয়। আমার ওই বয়সের দৌড়ঝাঁপ আর ভাবনাচিন্তা মাঝেমাঝেই ওনার কাছে গিয়ে বলতাম। প্রশ্রয় এবং উৎসাহ দুটোতেই কার্পণ্য করতেন না। তাই, ৯১তে প্রথম বাংলাদেশে যাওয়া এবং কিছু পূর্ব-পরিকল্পিত লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলার সময় ওনাকে পাশে রাখাটা জরুরি মনে করেছিলাম, পাছে অনেক সূক্ষ্ম অথচ জরুরি বিষয় বাদ চলে যায় নেহাতই আবেগের স্রোতে। অনেক খোঁজ খবর নিয়ে ঠিক করা হল, এই ধারাবাহিক নির্দেশনা দেবেন ওপার বাংলার নাসিরউদ্দিন ইউসুফ, ডাকনামে যাঁকে বাচ্চু বলে তখন বা এখনও মানুষ চেনে। বাচ্চু একজন মুক্তিযোদ্ধা। ৭১-এর স্বাধীনতার পর মুক্তিফৌজের যে দল ঢাকা শহরে প্রথমে ঢোকে, তার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাংলাদেশের ‘ঢাকা থিয়েটার’ গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠা করেন এবং একের পর এক উঁচু মানের প্রযোজনা থিয়েটারপ্রেমীদের উপহার দেন। বাচ্চু তৎকালীন বাংলাদেশের বামপন্থী গোষ্ঠীর সক্রিয় সদস্যও ছিলেন। সব মিলিয়ে নাসিরউদ্দিন ইউসুফকে মনে করা হয়েছিল যে তিনি এই উপন্যাসের মূল বিষয়কে আত্মস্থ করে ধারাবাহিকটা নির্মাণ করতে পারবেন। 

কলকাতা থেকেও ৮০-র শেষ এবং পরবর্তীকালে ৯০-এর দশকের বন্ধু এবং সফল পরিচালক মিলন রায়চৌধুরীকে ভাবা হয়েছিল সহযোগী পরিচালক হিসেবে। মিলনের পারিবারিক শিকড় বরিশালের। থাকত যাদবপুর-বাঘাযতীন অঞ্চলে। তাই ওপার বাংলা প্রীতি বা বাঙলাপনায় সেও খুব একটা কম যেত না।  ৯১-র ঢাকা সফরে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের দিকে কিছু জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে, পরিচালক নির্বাচন নিঃসন্দেহে জরুরিতম। বাংলাদেশ সরকারের কাছে ‘Intelligence-Clearance’-এর জন্য আবেদন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অনুমোদন, বেশ কিছু নাটক দেখে নেওয়া, যার মাধ্যমে এক ধরনের শিল্পী বাছাই পর্ব আর ওপার বাংলার বন্ধুদের অতি-আতিথেয়তায় নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় – এই ছিল ১৯৯১-র ঢাকা-সফর বিন্যাস। 

ঢাকা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন

ফিরে আসি ১৯৯২-র কথায়। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের চাকা বাংলাদেশের মাটি ছুঁল। আধঘণ্টার এই ফ্লাইট টাইমে সুনীলদার সঙ্গে কিছু কথা সেরে ফেললাম। সাংবাদিক সম্মেলনে কী বলা, কতটুকু বলা, আর কীভাবে কিছু কিছু বিষয় বাঁচিয়ে বলা। আমরা দু’জনেই জানতাম, যে এই প্রযোজনা যদি শুধু পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস চাপা পড়ে যাবে। ঠিক অনুরূপ অবস্থা তৈরি হবে, যদি শুধু বাংলাদেশে এটি তৈরি করা হয়। 

বিমানবন্দরে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ ওর কিছু বন্ধুবান্ধব সঙ্গে নিয়ে সুনীলদাকে সাদর অভ্যর্থনার জন্য উপস্থিত। বাংলাদেশের কবি এবং ভারতীয় দূতাবাসে কর্মরত সুনীলদার প্রিয় বন্ধু বেলাল চৌধুরীও এসেছিলেন আমাদের নিতে। ওই সময়ে সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজে বেশ ভালোরকম অনুভব করলাম। ছোটো ছোটো আড্ডায়, বাংলাদেশের ‘Who’s who’-দের সঙ্গে আলাপচারিতায় দেখছিলাম, আপাতভাবে তাঁরা সুনীলদাকে যথেষ্ঠ মান্যতায় এবং ভালোবাসায় জড়িয়ে রেখেছিল। আর অবশ্যই সুনীলদার ওপার বাংলার শিকড় সেগুলোকে আরও মজবুত করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটায় ঢাকা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনের ব্যবস্থা করা হল।  প্রেস ক্লাব উপচে পড়ার জোগাড়, মূলত সুনীল গাঙ্গুলিকে দেখা এবং শোনার তাগিদে। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুনীলদা, বাচ্চু, আমি ছাড়াও বাংলাদেশের প্রথিতযশা নাট্যকার সেলিম আল দীন, বেলাল চৌধুরী, কবি ইমদাদুল হক মিলন প্রমুখ। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি পরিচালক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ‘একুশে’-র ভোরে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে প্রভাত ফেরির ওপর প্রথম ক্যামেরা ধরবেন। সাংবাদিক সম্মেলনে সুনীলদা বললেন, “বাংলাদেশ থেকে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমিয়েছেন, যাঁরা নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে সম্বলহীনভাবে দেশত্যাগ করেছে, মূল কাহিনিটি এখানেই আবর্তিত হবে। সিরিয়ালটি বিরাট ক্যানভাসের – কলকাতা, ঢাকা, লন্ডন, আমেরিকা জুড়ে। তাই, এই উপন্যাস থেকে সিরিয়ালে রূপ দেওয়া একটি জটিল ব্যাপার। তবু আশা রাখছি, ইন্দ্রজিৎ, বাচ্চুরা এটা করে উঠতে পারবে”।

পরের দিন সকালে দৈনিকগুলোতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ হেডলাইন হল। কবি-সাহিত্যিক আর নাট্যকর্মীদের মহলে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ আলোচনার একমাত্র বিষয় হতে শুরু করল। ঔৎসুক্য বাড়ল, বাংলাদেশের কোন কোন শিল্পীরা এই প্রযোজনায় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে, দুই বাংলার প্রথম ছোটোপর্দার এই যৌথ উদ্যোগকে বাংলাদেশের এক শ্রেণির মানুষরা খুশি মনে নিয়েছিল। 

বিভিন্ন সংবাদপত্রে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ নিষিদ্ধ করার দাবি নিয়ে খবর  

পাশাপাশি, শুরু হল এর বিরুদ্ধাচরণও, যা আগে কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাস ও এই ধারাবাহিকটি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠল। ঢাকা শহর ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় পোস্টার পড়ল ভারতীয় দালাল চিহ্নিত করে। আমার আর বাচ্চুর নামে দুই দেশকে এক করার চক্রান্ত করার ছবি দিয়েও বিভিন্ন প্রান্তে পোস্টার পড়ল (সেই পোস্টারের একটা কপি এখনও খুঁজে যাচ্ছি)। 

বলা বাহুল্য, এর কোনোটাকেই খুব একটা পাত্তা দিলাম না সেই সময়। একুশে ফেব্রুয়ারির ভোররাতে ‘পূর্ব-পশ্চিম’-এর প্রথম শট টেকিং-এর পরিকল্পনায় ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia