ঈশ্বর, পৃথিবী আর ভালোবাসার ইফতারি জশন

হাওড়ার বাজে শিবপুরে ইফতারের দাওয়াত

জানে কিতনে দিনোঁ কে বাদ 
গলি মেঁ আজ চান্দ নিকলা…

ক কামরার ইটের ঘর। সিন্থেটিক কাপড়ের পর্দা গরম হাওয়ায় উড়ছে আনমনে। জানলার ফাঁক দিয়ে চোখ চলে যায় ঘরের ভিতরে। তক্তোপোশের পাশে রাখা ট্রানজিস্টারখানা। দুপুরের গায়ে গান ভেসে আসে। ৪০ ডিগ্রির গনগনে দুপুরে কে চাঁদ ডাকছে গলির দুপুরে! অন্য দিন এপথে দু’চারটে কুকুর ছাড়া আর কাউকে বিশেষ দেখা যায় না। সরু গলির একপাশে খাটিয়া পেতে জিরতে বসা মানুষজন। আরও পরে রঙিন বরফ আর কুলফিওয়ালা। হাওড়ার জিটি রোডে লম্বা লম্বা আকাশ ছোঁয়া বাড়ির আড়ালে লেন বাই লেন। চুলচেরা সরু গলি ধাঁধাঁ লাগায়। কেউ বা সবে নতুন রঙে রঙিন হয়েছে কেউ পুরোনো ইটের রঙে লাল। তবু এ পথে বড়ো বেশি টান। দেখতে জানলে সিনেমা দেখায় যখন তখন।

দুপুরের রোদ লম্বা বাড়ির মাথাগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে এসে ছায়া এলায় গলির ভিতর। ফ্রেমের পর ফ্রেম জুড়ে যেন বিছিয়ে আছে গালিবের হাতে লেখা অক্ষরমালা। 

তবে এ পথে আজ অনেক পায়ের শব্দ। হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে গলি। বদলে গিয়েছে শোরগোল। হাতের সঙ্গে  হাত মিলিয়ে জুড়ে যাচ্ছে লোহার কলকব্জা। পড়ছে টেবিল। আসছে চেয়ার। কী যেন জশনে ঘোর লেগেছে বাসিন্দাদের চোখে মুখে। এপ্রান্তে-ওপ্রান্তে গোলাপি ওড়না ঢাকা গেট। চিকচিক করছে তার গায়ের সলমা-জরির কাজ। ঝুল বারান্দার ওপর থেকে মুখ বাড়িয়ে প্রস্তুতি দেখছে মহল্লার জেনানারা। ঠিক যেন যজ্ঞি বাড়ির ব্যস্ততা!

জশনের গন্ধে ম-ম করছে সারা চত্বর। কেয়াদেবী নিজেও কামড় দেন খেজুরে। এই তাঁর জন্নত, চোখের সামনে তা এভাবেই জন্মায়। এই জন্নতের রং শুধু তাঁর একার নয়। চারপাশের সবার চোখেমুখে ছড়িয়েছে।

রোদ যত পাতলা হয় তত ব্যস্ত হয়ে ওঠে মহল্লা। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়চ্ছে রহমত, আসগার, সৌম্যরা। তেলেভাজা চপের আদল নিখুঁত করতে হাতে স্পিড তুলছে ভবানী, রমা, অহল্যারা। মাথার ওপরে ঢিমে তালে পাখা। কিন্তু হাওয়া কতটা গায়ে লাগল সে খেয়াল আর কে রাখে এখন! পুকুর মাপের কড়ায় টগবগিয়ে ফুটছে, ঘুরপাক খাচ্ছে পেঁয়াজি। টুপটুপে হয়ে ভেসে উঠছে গরম গরম ফুলুরে। চালান হয়ে যাচ্ছে থরে থরে ট্রেতে। ইয়া বড়ো জাহাজে মশলা চানা।

বাতাসে রুহআফজার মেহেক। সফেদ কন্টেনারে বিশালকার হান্ডি থেকে ভরে উঠছে স্বর্গীয় হালিম। ওপরে পালকের মতো ভাসছে মুচমুচে বেরেস্তা।  

ওপাশের ক্লাবঘরে চারপাশে বস্তা বস্তা তরমুজ। বাক্স বাক্স আপেল আর খেজুর। ঝড় তুলে কাটা হচ্ছে লাল টুকটুকে তরমুজের টুকরো। প্রতিটা টুকরো সমান হওয়া চাই। আর তলার সাদা খোসাটা যেন গায়ে লেগে না থাকে, খিদের মুখে জিভে পড়লে বড়ো খারাপ লাগে- একটানা কথাগুলো বলে একটা জলের বোতল খোঁজেন কেয়া মুখোপাধ্যায়। কপালে ঘামে লেপটে গিয়েছে কাঁচা-পাকা চুল। এদিকে হাত তবু থেমে নেই। বাকি পড়ে আছে ঢের কাজ। সঙ্গের বঁটিটি তাঁর একাজে বিশ্বস্ত সঙ্গী। একে ছাড়া হাত সরে না। এ বঁটি তাঁর বাড়ির দুগগা পুজোর সময় লাগে। আজ ইফতারের ফল কাটতে সেই সাথীকেই চাই। তিনি একা নন তাঁর সঙ্গীদেরও এমনটাই মত। তাই আসার আগে ব্যাগে বাড়ির বঁটি। কারও বা পুজোর ঘরের কারও বা রান্নাঘরের দৈনন্দিনের। 

এ পাড়ায় আজ ইফতার। তারই প্রস্তুতি চলছে সকাল থেকে। দুপুর বেলা ফল কাটার আসর। পাড়ার মহিলারা এসেছেন সেখানেই। কেয়া বয়োজ্যেষ্ঠা। প্রবীণতমা। হাজার ব্যস্ততার ফাঁকেও যেন তাঁর মন পড়ে থাকে ফোনে। কারও কাছে জানতে চান ‘লোকেশন’। কাকে যেন ঘন ঘন ফোনে ধরেন। অসীম ধৈর্য্যে বুঝিয়ে দেন কোন পথে আসতে হবে মহল্লায়—পিএম বস্তিতে। 

একসময় ফল কাটা, জোগাড় যন্ত্র শেষ হয়। কাজ ফুরায়। গলির মাথার ওপর আজ হাজার তারার আলো। একে একে জ্বলে ওঠে তারা। গলির ভিতর সারি সারি চেয়ার টেবিল বসেছে। এদিকে কেয়াদেবীর অপেক্ষা অন্তহীন। অচেনা দরজায় দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখ যাকে খুঁজছে সে আর আসছে কই!  

শরিফের সঙ্গে তার কেয়া দিদিমণি

শেষপর্যন্ত ইফতারি ভিড় ঠেলে নিজেই এগিয়ে যান। একাই একটু এগিয়ে দেখেন। খুব দূরে যেতে হয় না তাঁকে। তিনদিকে বেঁকে যাওয়া রাস্তার মোড়ে ওই তো আসছে মাথায় ফেজ ঢাকা শরিফ। তাঁর সন্তানসম ছাত্র। সবে ক্লাস সিক্স। আজ ম্যাম ডেকেছে। দাওয়াত দিয়েছে এক সঙ্গে ইফতার সারার।  

সারাদিন রোজা রাখে শরিফ। ভোর চারটে বাজলে ফোন আসে ম্যামের নাম্বার থেকে। ডেকে তুলে দেন দিদিমণি। এই ভিড়ে ছাত্রের হাতটা ধরে থাকেন শক্ত করে। ফাঁকা টেবিল দেখে বসান লাজুক বালকটিকে। তাঁতের শাড়ির নরম আঁচলে ঢেকে নেন নিজের মাথাখানাও। এখন একটু পরেই নামাজ শুরু হল। মাথাটা নামিয়ে মনে মনে ডাকতে থাকেন নিজস্ব ঈশ্বরকে। যিনি কেয়াদেবীকে প্রতিদিন বলে যান ‘এই ভালবাসাটুকুই সম্বল, এর টানেই তোমার কাছে ফিরে ফিরে আসবে মানুষ’… তাঁর মুখে লেগে তৃপ্তির হাসি। আজ এই গলির মাঝে সন্ধের আলোর ছটায় তা আরও মায়াময় হয়ে ওঠে। আজানের সুর বাতাসে মিশে গেলে বরফ ঠাণ্ডা জলের বোতলের ঢাকাটা খুলে হাতে ধরিয়ে দেন শরিফের। সারাদিন উপোসী ছেলেটা এবার গলা ভিজোক। 

জশনের গন্ধে ম-ম করছে সারা চত্বর। কেয়াদেবী নিজেও কামড় দেন খেজুরে। এই তাঁর জন্নত, চোখের সামনে তা এভাবেই জন্মায়। এই জন্নতের রং শুধু তাঁর একার নয়। চারপাশের সবার চোখেমুখে ছড়িয়েছে। এত আলো, এত উৎসব আর প্রেমের উদযাপন ভুলেই দেয় দিন পনেরো আগের দগদগে আগুনের স্মৃতি। মন থেকে উবে যায় দাউদাউ করে করে জ্বলতে থাকা গাড়িগুলো, ভাঙাচোরা দোকানপাট। চেনা রাস্তায় ভারি বুটের শব্দ। নিকষ রাতের পুলিশি টহল আর আতঙ্কের মুখ…

কেয়া মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে

কেয়াদেবী কোনও কল্প মানবী নন। তিনি রক্ত-মাংসের। ভীষণ সবাক এক ঐতিহ্য। সেই ট্রাডিশনে শুধু মুখ বদলায়, মানুষ বদলায়, বইতে থাকে ভালবাসার ধারা। এ দৃশ্য দুর্লভ নয়। ফি বছর হাওড়ার বাজে শিবপুরে পিএম বস্তিতে ‘প্রিয়নাথ মান্না বস্তি কমিউনিটি কিচেন’-এর আয়োজনে ইফতারের দাওয়াতে এভাবেই আসেন মানুষ। জড়ো হন এলাকার সীমানা পেরিয়ে। দাবী শুধু একটাই- ভালবাসা আর উদার হৃদয়…
 

Developed by DXDasia