
প্রদীপ ভট্টাচার্যের থিয়েটার থেরাপি
মুক্তির জন্য ব্যাকুল খাঁচার পাখি দেখেছেন কখনও? যন্ত্রণায় ডানা ঝাপটানো লক্ষ করেছেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনুভব করতে পেরেছিলেন সেই যন্ত্রণা, সৃষ্টি করেছেন ‘দুই পাখি’-র মতো কবিতা। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব প্রদীপ ভট্টাচার্য তাই বহরমপুর সংশোধনাগারের বন্দিদের জীবন বদলানোর জন্য বেছে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, জেলবন্দিরাও ‘খাঁচার পাখি’-র মতো বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষা করেন। কোনো না কোনো অপরাধ করে কারাগারের অন্ধকারে শাস্তি পাচ্ছেন ঠিকই, তবুও মনে জেগে থাকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন।
প্রদীপবাবু চেয়েছিলেন জেলবন্দিদের আরও উন্নত মানুষ করে তুলতে। তাঁর মতে, “জন্ম থেকে কেউ অপরাধী হয় না”। তাই অপরাধীদেরও সংশোধন করা সম্ভব, যে অপরাধই করে থাকুক না কেন। নরম্যান ম্যাককিনেলের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য বিশপ’স ক্যান্ডলস্টিকস’-এর কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। প্রদীপ ভট্টাচার্য বুঝেছিলেন, থিয়েটারই হতে পারে সবথেকে শক্তিশালী হাতিয়ার, যেখানে কথা আর কাজ একসঙ্গে মিলে যায়। যাঁদের বেশিরভাগই আগে কখনও অভিনয় করেননি, নির্ভুল বাংলা উচ্চারণ করতে পারেন না, তাঁদের নিয়েই ‘রক্তকরবী’র মতো নাটক মঞ্চস্থ করার উদ্যোগ নিলেন। ঝুঁকি ছিল, মননশীল দর্শকেরা তৃপ্তি মিত্র-শম্ভু মিত্র অভিনীত কালজয়ী ‘রক্তকরবী’-র তুলনা এনে সমালোচনা করবেন। প্রদীপবাবু তাঁর প্রয়োজনার নাম রাখেন ‘যক্ষপুরী’, যেখানে অন্ধকার কুঠূরিতে শ্রমিকরা দিন-রাত এক করে রাজার জন্য সোনা তুলতে ব্যস্ত। কারাবন্দিরা সহজেই এই নামের একাত্ম হতে পারেন।
প্রদীপ ভট্টাচার্য
কলকাতার আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে এই নাটক পরিবেশন করেন বহরমপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের প্রায় ২৩ জন বন্দি। স্বাধীন জীবন এবং মানবতার নতুন দিগন্ত খুলে গেল তাঁদের সামনে। রবীন্দ্রনাথ সর্বদা যা চাইতেন – ‘আত্মার মুক্তি’। এঁদের আচরণ পরিশীলিত নয়, ভাষা ত্রুটিপূর্ণ, উচ্চারণে খুঁত রয়েছে – তা সত্ত্বেও জয়জয়কার ছড়িয়ে পড়ল। প্রদীপবাবু জেলখানার ভিতরে পৌঁছে দিলেন রবীন্দ্রনাথকে, বন্দিদের প্রিয় করে তুললেন। আরোগ্যের স্পর্শ পেলেন কারাবাসীরা।
২০০০ সাল থেকে জেলখানাগুলি পরিচিত হয়ে ওঠে সংশোধনাগার নামে। ২০০৫-২০০৬ নাগাদ বহরমপুর সংশোধনাগারে ডাক পান প্রদীপবাবু, বন্দিদের সাহায্য করার জন্য। তিনি প্রথম চেয়েছিলেন ‘তাসের দেশ’ মঞ্চস্থ করতে। যাতে রয়েছে পুরোনো রক্ষণশীল নিয়ম ভাঙার গল্প। অংশ নিয়ে জেলবন্দিরা খুব আনন্দিত হন। ২০০৬-এর ২৯ নভেম্বর বহরমপুর কারাগারে অভিনীত হয় নাটকটি। এদিকে নারী চরিত্রে একজন মহিলা বন্দির দরকার ছিল। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ প্রথমে নারীপুরুষের একসঙ্গে অভিনয়ের বন্দোবস্ত করতে রাজি ছিলেন না। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল কারাগারের আইনকানুন। যদিও শেষ পর্যন্ত একজন মেয়েকে ‘যক্ষপুরী’-তে অভিনয়দের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়।
প্রদীপ ভট্টাচার্য
এভাবেই বিপ্লব নিয়ে এসেছেন প্রদীপ ভট্টাচার্য। পরবর্তীকালে নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়ের সাহায্যে বন্দিদের নিয়ে মঞ্চস্থ করেন ‘তাসের দেশ’। সেবারেও বেছে নেন রবীন্দ্রনাথকেই। ‘তোতাকাহিনী’-ও মঞ্চস্থ করেন। সেই পাখির গল্প, যাকে বিদ্বান করার জন্য কাগজ খাওয়ানো হত। যদিও এমন শিক্ষাব্যবস্থা সফল হয়নি, কারণ পাখিটি মারা যায়। প্রদীপবাবুর মতে জেলবন্দিরা অপরাধী নন, তাঁরা অভিনেতা। কয়েকশো বন্দির সঙ্গে বছরের পর বছর তিনি কাজ করেছেন। ‘থিয়েটার থেরাপি’-র মাধ্যমে জীবন বদলে দিয়েছেন। কোভিড পরিস্থিতিতে ভিড় কমানোর জন্য কারাবন্দিদের বাড়ি পাঠানো হয়েছে প্যারোলে। তাঁদের প্রবলভাবে মিস করেন প্রদীপবাবু। কখনও বন্দিদের জিজ্ঞেস করেননি, কোন অপরাধে শাস্তি পাচ্ছেন। সবাইকে তিনি ‘থিয়েটার পরিবার’-এর অংশ করে নিয়েছেন।
আরও পড়ুন: জীবন বদলে দেওয়া থিয়েটার
বাংলার বেশিরভাগ জেলখানাই তৈরি হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। এখনও সেগুলির দেহ থেকে ঔপনিবেশিক যুগের অন্ধকার মুছে যায়নি। দেওয়ালেরা আজও নির্যাতন আর ভয়ের স্মৃতি বয়ে নিয়ে চলেছে। মিশেল ফুকো তাঁর ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ বইতে বেন্থামের প্যানপটিকন কারাগারের বর্ণনা যেমন দিয়েছেন, সেরকমই অনেকটা। যদিও প্রদীপ ভট্টাচার্যের মতো মানুষেরা সেখানে নতুন প্রাণের আনন্দ বয়ে নিয়ে যান। ‘অপরাধী’দের পরিণত করেন ‘মঞ্চাভিনেতা’-য়। মুক্তির আলো এমনই।

