পেনেটির গুপো সন্দেশ: শতাব্দী প্রাচীন এক মিষ্টির সফরনামা

ভোজনরসিকরা আজও দূরদূরান্ত থেকে গুপোর খোঁজে ছুটে আসেন

বাঙালির খাবার হল যথার্থ ব্যালেন্সড ডায়েটের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ, তেতোয় শুরু হয়ে মিষ্টিতে এসে শেষ। শেষ পাতে মিষ্টি সাম্রাজ্যের অন্যতম দাপুটে সম্রাট ‘সন্দেশ’। রবি ঠাকুর থেকে বাংলার বাঘ আশুতোষ, সন্দেশের প্রেমে পড়েননি এমন বঙ্গ সন্তান খুঁজে পাওয়া দায়। বাংলার ময়রারা যে কত কিসিমের সন্দেশ বানান, তা গুনে শেষ করা যাবে না। গুপো তাদেরই মধ্যে অন্যতম।

তবে, উনিশ শতকের পানিহাটিতে গুপোর আগমন ঘটে। সে সময় পেনেটির গুপো বেশ খ্যাতি পেয়েছিল। লোকজন গুপো কিনতে ছুটে আসতেন গঙ্গা তীরের এই জনপদে। মহেন্দ্রনাথ দত্ত, তাঁর কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা বইতে লিখে গিয়েছেন, (প্রাক রসগোল্লা আমলের কথা, যে সময় ভোজবাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে গুপো সন্দেশ পরিবেশন করা হত) “পেনেটির গুপো সন্দেশ বড়ো বিখ্যাত ছিল। সেটা দেখতে ছিল দুখানা ফেনী বাতাসা একসঙ্গে জোড়া করার মত। তখনকার দিনে গুপো সন্দেশের খুব নাম ছিল।” (কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা, দ্বিতীয় সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৭১) আজও পানিহাটির বেশ কিছু দোকানে গুপো তৈরি হয়। স্থানীয়দের মধ্যে এর চাহিদা এখনও কমেনি। ভোজনরসিকরা আজও দূরদূরান্ত থেকে গুপোর খোঁজে ছুটে আসেন। 

গুপো আদতে নরম পাকের একটি সন্দেশ। মিষ্টি খুব একটা নয়। দেখতে মণ্ডা বা দেদো মণ্ডার মতো। এটি মাখা সন্দেশের পরিবর্তিত রূপ। দুটো চ্যাপটা সন্দেশ হাতের চাপে চেপে জুড়ে এই সন্দেশ বানানো হয়। জনশ্রুতি রয়েছে গুপোর আরেকটি নাম নাকি গুঁফো। কারণ হিসেবে শোনা যায়, গুপো সন্দেশ খুবই নরম এবং একদা এর মাঝে নাকি জলীয় অংশ থাকত। খেতে গেলে তা গোঁফে লেগে যেত, তার থেকে গুঁফো নামের জন্ম। যদিও অধিকাংশ খাদ্য গবেষক একে নিছক জনশ্রুতি হিসেবেই মনে করেন। 

গুপো নিয়ে কথা বলতে গেলে গুপ্তিপাড়ার কথা এসে পড়ে। প্রচলিত ইতিহাস এবং বহু খাদ্য ঐতিহাসিকদের গবেষণায় দাবি করা হয়, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় গুপোর জন্ম। ১৮৫০-১৮৭০-র মধ্যেই গুপ্তিপাড়ার গুপো গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। গুপ্তিপাড়া থেকেই গুপো নামটির উৎপত্তি বলেও দাবি করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুপো সন্দেশের জিআই ট্যাগের জন্যে গুপ্তিপাড়ার তরফে আবেদন করা হয়েছে।

পানিহাটির গুপোর অন্যতম প্রস্তুতকারক হল শম্ভুচরণ পাল সুইটস। শতাব্দী প্রাচীন তিন পুরুষের এই দোকানে দীর্ঘ আশি-নব্বই বছর যাবৎ গুপো সন্দেশ তৈরি হচ্ছে। এক ক্রেতা বললেন, “আগে কোন্নগর থেকে গঙ্গা পেরিয়ে লোক এই দোকানে গুপো সন্দেশ কিনতে আসতো।” (দোকানটি এক সময় গঙ্গার পাড়ে অবস্থিত ছিল)

দোকানের কারিগর সুশান্ত দাস জানালেন, “খাঁটি দুধের ছানা থেকে গুপো সন্দেশ তৈরি হয়। গরু বা মহিষের দুধের ছানা আর চিনি দিয়েই গুপো বানানো হয়। তবে শীতকাল নলেন গুড় দিয়ে গুপো বানানো হয়।” এ প্রসঙ্গে বলি, অনেকেরই ধারণা রয়েছে গুপো কেবল নলেন গুড় দিয়েই তৈরি হয়। এ কথা সম্পূর্ণ ভুল, গুপো চিনির পাকে বানানো হয়। শীতে যেমন রসগোল্লা বা অন্যান্য সন্দেশ নতুন গুড় দিয়ে তৈরি হয়, গুপোও তেমন শীতকালে গুড় দিয়ে বানানো হয়। গুড়ের গুপো মরশুমি রকমফের বই কিছু নয়। দোকানের অন্যতম কর্ণধার প্রশান্ত পাল জানান, “আমাদের আদি দোকান ছিল গঙ্গার ধারে (বাজারপাড়া) আর এখন দোকান রয়েছে, এই মিত্রপাড়ায়। আমার ঠাকুরদা শম্ভুচরণ পাল গুপো বানানো শুরু করেন।” তিনি বলেন, তাঁর বাবা পশুপতি পাল ছিলেন দ্বিতীয় পুরুষ, তিনি তৃতীয় পুরুষ হিসেবে দোকান সামলাচ্ছেন। দণ্ড মহোৎসবের ভোগে তাঁদের দোকান থেকেই গুপো সন্দেশ যায়। মিষ্টি তৈরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ঘরে কাটা ছানায় এই সন্দেশ বানানো হয়। সন্দেশটা বেশি থাকে না, দিনের দিন খেতে হয়। মিহি, দানা দানা পাক হয়, নরম, একটু ছানা ছানা গন্ধ ছাড়ে। এলাচ গুঁড়ো দেওয়া হয়। শীতে এলাচ গুঁড়ো আর নলেন গুড় সুন্দর গন্ধ তৈরি করে, দুর্ধর্ষ খেতে হয়।” মিষ্টির চাহিদা খুব ভালো রয়েছে বলেও জানালেন তিনি। বললেন, “সারা বছর আমাদের দোকানে গুপো পাওয়া যায়। সাত টাকা ও দশ টাকা দুই দামের গুপো পাওয়া যায়। বিভিন্ন এলাকার মানুষ এসে নিয়ে যায়। উৎসব, অনুষ্ঠানে অর্ডার দেন। পিস হিসেবে ধরলে চার-পাঁচশো পিস বিক্রি রয়েছে দিনে। তবে পুরনো মানুষরাই গুপো বেশি খোঁজেন।” 

সাত টাকার গুপোটি আকারে কিছুটা ছোটো, দশ টাকারটা বড়ো। কালের নিয়ম সেই গুপো সন্দেশের উপর বাদাম, কিশমিশ এসে পড়েছে। শোভা বাড়িয়েছে।

সোদপুরের আরেকটি দোকান, আপ্যায়ন; সেখানেও গুপো সন্দেশ পাওয়া যায়। তবে তাঁরা কেবল শীতকালে গুপো বানান। আপ্যায়নের মিষ্টি-কারিগর পাঁচু গড়াইয়ের সঙ্গে ক্ষেত্র সমীক্ষা করতে গিয়ে কথা বলেছিলাম। তিনি বিগত কুড়ি বছর ধরে গুপো বানাচ্ছেন। তিনি জানালেন, তাঁদের দোকানে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি অবধি গুপো পাওয়া যায়। দাম দশ টাকা। প্রতিদিন প্রায় একশো পিস গুপো বিক্রি হয় তাঁদের। সন্দেশ বানানো প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “আমরা মহিষের দুধে গুপো সন্দেশ বানাই। গরুর দুধে রসগোল্লা ভালো হয় আর মহিষের দুধে সন্দেশ ভালো হয়। দুধ জ্বাল দিয়ে ছানা বানানো হয়। তারপর চিনি, নলেন গুড় দিয়ে পাক দিই। কাঠের পাটায় ফেলা হয় (মণ্ডার মতো) তারপর কিছুটা শক্ত হয়ে এলে, তুলে দুটো সন্দেশ নিয়ে হাত দিয়ে চেপে দেওয়া হয়।” 

 

মণ্ডা আর গুপোর পার্থক্য সম্পর্কে পাঁচুবাবু জানান, “মণ্ডায় চিনির ভাগ বেশি, তাই শক্ত হয়। গুপোতে চিনির ভাগ কম, তাই নরম হয়। কম চিনির পাক বলেই গরমকালে গুপো বানাই না। নষ্ট যায় যায়। শীতকালে আমাদের দোকানে এলে গুপো পাবেন।”

গুড়ের গুপো

গুপো নিয়ে কথা বলতে গেলে গুপ্তিপাড়ার কথা এসে পড়ে। প্রচলিত ইতিহাস এবং বহু খাদ্য ঐতিহাসিকদের গবেষণায় দাবি করা হয়, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় গুপোর জন্ম। ১৮৫০-১৮৭০-র মধ্যেই গুপ্তিপাড়ার গুপো গোটা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। গুপ্তিপাড়া থেকেই গুপো নামটির উৎপত্তি বলেও দাবি করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গুপো সন্দেশের জিআই ট্যাগের জন্যে গুপ্তিপাড়ার তরফে আবেদন করা হয়েছে। হয়তো গুপ্তিপাড়া থেকেই পানিহাটিতে গুপো এসে পৌঁছেছিল। আজও উত্তর ২৪ পরগনার এই প্রাচীন জনপদ গুপোর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেনি। তার একটা কারণ অবশ্যই বাঙালির খাদ্য প্রেম, গুপো সন্দেশের চাহিদা। তবে গঙ্গা পাড়ের নগর-শহরগুলোর মধ্যে পুরনো জিনিসকে বাঁচিয়ে রাখা, প্রাচীনের সঙ্গে ইতিহাস আঁকড়ে বেঁচে থাকার একটা তাগিদ চোখে পড়ে। সেই তাগিদই হয় পেনেটির গুপো সন্দেশকে আজও সজীব রেখেছে।

____________________________
তথ্য ঋণ:
ক্ষেত্র সমীক্ষা
শম্ভুচরণ পাল সুইটসের সন্ধান পেয়েছি অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়ের কাছে, তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাই।

Developed by DXDasia