ব্রিটিশ আমলে জেলখানায় কীভাবে সরকার-বিরোধী লেখাপত্র পৌঁছত?

ইতিহাসের ভিতর মহলে কত অজানা কাহিনির আসা যাওয়া

আর পাঁচটা বিষয়ের মতো ইতিহাসেরও আছে এক অন্দরমহল, অ্যাকাডেমিক চর্চার বহিরঙ্গে সহজে যার মুখ দেখা যায় না। কিন্তু দেখা যায় না মানে এই নয় যে সেই ভিতর মহল আসলে খুব ম্লান ও বিবর্ণ। সেখানেও জমে থাকে নানা আশ্চর্য কাহিনির বুনট, নানা অশ্রুত ঘটনার চলাচল। কথাটা উঠে এল এই কারণে যে আমাদের দেশের ও এই রাজ্যের সমাজতন্ত্রী ধারার রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে প্রায়শ জুড়ে দেওয়া হয় বিদেশি রাজনীতির সূত্র, যেন বা সোভিয়েত রাশিয়ার ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ এর পরেই রাতারাতি এই দেশের বা এই রাজ্যের রাজনীতি তাতে প্রভাবিত হয়ে নির্মাণ করে ফেলল নবজীবনের এক ধারাপাত। অথচ ব্যাপারটা আদৌ তেমন নয়।

বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনকে সামনে রেখে বিংশ শতকের গোড়ায় যে সশস্ত্র বিপ্লবী রাজনীতির পত্তন হয়, তার সলতে পাকানোর কাজ শুরু হয়েছিল আরো আগেই। যখন দেশের নানা জায়গায় এবং বাংলাতেও গুপ্ত সমিতিগুলি আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে আরম্ভ করে এবং একটা সময়ের পরে মূলত বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ ও বিবেকানন্দের ‘কর্মযোগ’ কে ভিত্তি করে তারা তাঁদের সংগঠনগুলিকে নীতিগতভাবে কাঠামো দেয় । শুরু হয় অগ্নিযুগ। কিন্তু অল্প কয়েক বছরের মধ্যে তাঁদের সেইসব কর্মসূচি পরিত্যক্ত হয় যার অন্যতম প্রধান কারণ এই আন্দোলনের প্রাণপুরুষ অরবিন্দ ঘোষের সরে আসা ও বাকি বিপ্লবীদের ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া, এবং যার মূল কারণ সরকারি দমননীতি।

কিন্তু বিপ্লবী আন্দোলনের শিখা ওইভাবে নির্বাপিত হয় না, কারণ দেশ তখন পরাধীনতার শেকলে বাঁধা। গান্ধিজির অসহযোগ আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পরে দেশের যুব সমাজে তৈরি হয়েছিল এক চরম হতাশা যার প্রতিক্রিয়ায় আবার নতুন কিছু করার অভিপ্রায়ে সারা দেশেই কমবেশি কিছু কিছু বিপ্লবী সংগঠন গঠিত হতে থাকে। এটা বিশ শতকের দুইয়ের দশকের কথা – মনে পড়তে পারে, এই সময়েই পুরোনো যুগান্তর দল ও অনুশীলন সমিতি নতুন করে বিপ্লবী আন্দোলনের ভাবনায় নিজেদের যুক্ত করছেন – দেশব্যাপী আজাদির লড়াই গড়ে তোলার জন্য তৈরি হল হিন্দুস্থান রিপাবলিকান আর্মি (১৯২৫)।

কিন্তু ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পরে সারা পৃথিবীতেই তার একটা প্রভাব পড়তে থাকে, আমাদের দেশও তার বাইরে ছিল না। বিশেষ করে দুই বিশ্রুত বাঙালি মানবেন্দ্রনাথ রায় ও বিবেকানন্দ-অনুজ ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়ায় গিয়ে সেখানকার নেতৃত্বের সঙ্গে মতামত বিনিময়ের সুযোগ পেলে তার একটা অভিঘাত তাত্ত্বিক রাজনীতির জগতে এসে পড়ে। এই নতুন ভাবনার আলোয় আমরা দেখতে পেলাম দেশের চটকল, রেলপথ ও কয়লাখনিতে শুরু হওয়া শ্রমিক ধর্মঘটের নতুন পরিচ্ছেদ (১৯২০-২২) – যার নেতৃত্বে এলেন নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস, আজকের এআইটিইউসি। যদি ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখা যায় তাহলে দু’য়ের দশকের শেষার্ধ এমন কিছু ঘটনার সাক্ষী, যার মধ্যবর্তিতায় নতুন একটা রাজনৈতিক ডিসকোর্সের আভাস খুব স্পষ্ট। এর মধ্যে আছে কানপুর বলশেভিক মামলা (১৯২৪), কৃষক-শ্রমিক দলের প্রতিষ্ঠা (১৯২৬), মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯) – এরই পাশাপাশি ১৯২৬এ ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের দেশে ফেরা এবং নতুন রাজনীতির সপক্ষে ব্যাপক প্রচার, ১৯২৮-২৯ নানা স্তরে শ্রমিক আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠা।

এই সময়টা কিন্তু নতুন উদ্যমে জড়ো হওয়া বিপ্লবীদেরও নানান কর্মসূচি চলছে। ১৯৩০এ চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠ হয়ে তৈরি হল স্বাধীন চট্টগ্রাম সরকার, কলকাতায় বিনয় বাদল দীনেশ দেখিয়ে গেলেন তাঁদের অকুতোভয় শৌর্য, মেদিনীপুরে চলছিল একের পর এক ম্যাজিস্ট্রেট নিধন। এর পাশাপাশিই জারি ছিল সরকারি তরফের পাল্টা সন্ত্রাস। আগের যুগের মতোই এই পর্বের বিপ্লবী আন্দোলনের মতাদর্শ ছিল ‘একটিভ হিরো প্যাসিভ মাস’ – অর্থাৎ কি না জনসাধারণের অংশগ্রহণের চাইতে একক বা গোষ্ঠীগত হিংসার মূল্য বেশি। বিপরীত পক্ষে, শ্রমিক আন্দোলনের হাত ধরে যে নতুন সমাজতন্ত্রী ভাবধারা, তাঁদের কাছে জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছিল মুখ্য।

তথ্য বলছে এই বিপরীত মতের দ্বন্দ্ব কিছুদিন সহাবস্থান করে যদিও তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ যে ছিল না তা নয়। ঠাকুর পরিবারের কৃতী সন্তান সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষক শ্রমিক দলের পক্ষে বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ রক্ষা করতেন। অনুশীলন সমিতির বিখ্যাত ছাত্র নেতা সত্যেন্দ্র নারায়ন মজুমদার একটা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ছাত্রাবস্থায় তিনি জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ ও লেনিনের ‘ইম্পিরিয়ালিজম’ বই পড়ে সাম্যবাদে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এইরকম দৃষ্টান্ত আরো আছে।

কিন্তু একটা সময় এল যখন বিপ্লবী আন্দোলন একেবারে নিস্তেজ, অনেকে ফাঁসিতে ঝুলেছেন, বাকিরা কারাবন্দি। চারদিকে একটা হতাশার আবহ। এই ক্রান্তি লগ্নে হতোদ্যোম বিপ্লবীরা অনুভব করতে থাকলেন একটা বিকল্প পথের সন্ধানের। সেই বিকল্প সন্ধানের সেই আত্মজিজ্ঞাসা থেকেই কিন্তু দেশে ও রাজ্যে সাম্যবাদী ভাবধারার রাজনীতির সূত্রপাত।

কিন্তু সেটা হতে পারল কী করে? এই চর্চা শুরু হয়েছিল মূলত কারাগারে – সেলুলার জেল থেকে ছড়িয়ে থাকা আরো নানা বন্দিশিবিরে। সাম্যবাদী চেতনার বইপত্র, পত্রিকা ছড়িয়ে পড়া শুরু হল সেখানে, আরম্ভ হল মার্ক্সবাদের নানা ধারণা নিয়ে আলোচনা। এই পর্বে কলকাতা জেলার কমিউনিস্ট দলের একটা বড় ভূমিকা ছিল, তারা একটি পুস্তিকা ছাপিয়ে ব্যক্তিগত হিংসার থেকে গণ সংগ্রামের গুরুত্ব যে বেশি তার একটা ধারনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন যা পড়ে অনেকেই উদ্বুদ্ধ হন। শুধু আত্মজিজ্ঞাসী বিপ্লবীরাই নন, অনেক জাতীয়তাবাদী নেতাও এইসব চর্চায় আগ্রহী হন। আন্দামানের বিপ্লবী নলিনী দাস লিখছেন, “মাথা গরম হয়ে গেছে, উধাও হয়েছে রাতের ঘুম, তবু প্রতিদিন উন্মাদের মতো পথের সন্ধানে ১২-১৪ ঘন্টা পড়েছি”। সতীশ পাকড়াশী আন্দামানে বসে মার্ক্সীয় সাহিত্য পড়ে বলেন, “…সাম্যময় সমাজজীবনের সাধনাই মানবের মুক্তির সাধনা”। মার্ক্সবাদী বই পত্রের চাহিদা এত বেড়ে গেল যে কখনও কখনও হাতে কপি করে নিয়ে বই পড়তে হত। আন্দামানের পাশাপাশি হিজলি, বক্সা, দেউলি বা বহরমপুরের কারাগারেও ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই চর্চা। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর ও অন্যান্য দলের মধ্যে এইভাবেই আলোড়ন ফেলে সাম্যবাদী ভাবনা – ১৯৩৬ সালে তৈরি হয়ে যায় কমিউনিস্ট কনসলিডেশন, যা আরও এগিয়ে নিয়ে যায় এই স্রোতকে।

কিন্তু জেলের মধ্যে মার্ক্সবাদী বইপত্র পত্রিকা আসত কী করে? কেউ কেউ মনে করেন, সন্ত্রাসবাদ থেকে দেশের যুব শক্তিকে আটকাতে ব্রিটিশ সরকার দরাজ হাতে মার্ক্সবাদী সাহিত্য বিতরণ করতেন এবং পরে মার্ক্সবাদের বিপদ বুঝে তা নিয়ন্ত্রণ করেন। সরকারি দলিলে অবশ্য এই বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট নীতির উল্লেখ পাওয়া যায় না বরং এটা একেবারেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করত। তবলা বাজানো বিষয়ক বই ‘তবলা তরঙ্গিণী’ হিজলি বন্দিশিবিরে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল (১৯৩৩), কারণ, ‘তরঙ্গ’ শব্দটাই জেল প্রশাসনের কাছে মনে হয়েছিল আতঙ্কের, আবার প্রেসিডেন্সি জেলে ‘ক্যাপিটাল’ কে ছাড় দেওয়া হয়েছিল নিছক অঙ্কের বই হিসেবে (১৯৪২)। আবার মজার ব্যাপার এই যে আন্দামানের সেলুলার জেলে এঙ্গেলস-এর ‘প্রাইভেট প্রপার্টি অ্যান্ড স্টেট’ বইটি প্রাথমিকভাবে বাজেয়াপ্ত করেও পরে জেলার সেই বইয়ের ওপর মন্তব্য লিখে বইটি ফেরত দেন – মন্তব্যে লেখা হয়েছিল “Bad, very bad. No love, no adventure. It induces sleep”.!

সত্যি ইতিহাসের ভিতর মহলে যে কত অজানা কাহিনির আসা যাওয়া !

(মতামত লেখকের ব্যক্তিগত) 

 

Developed by DXDasia