
স্বামীজির আদর্শেই নিবেদিতা নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন পরাধীন ভারতের মুক্তির আগুনে
একশো তেইশ বছর আগের এক নভেম্বর। ভারতের ইতিহাসে যেন বা একটি নতুন যুগের সূচনা হল সেইদিন। লন্ডনে আসা এক তরুণ ভারতীয় সন্ন্যাসীর সঙ্গে দেখা হল আয়ারল্যান্ডের এক তরুণীর। সন্ন্যাসী-যুবা চান অধ্যাত্মবাদের সঙ্গে পরাধীন দেশের আত্মপরিচয় তৈরির সাধনাকে মিলিয়ে দিতে। আর সেই নবীনা, যিনি বেড়ে উঠেছেন আইরিশ বিদ্রোহের পরিবেশে, যার বাবা প্রত্যক্ষ বিপ্লবী আন্দোলনের শরিক, তখন লন্ডনে রয়েছেন কিছু বিপ্লবী গুপ্তসমিতির পরিচালনার দায়ভার নিয়ে। দুই মনীষার চোখে দু-রকম স্বপ্ন, কিন্তু স্থান-কাল-পাত্রে আলাদা হলেও তা মৌলিক অর্থে অভিন্ন। একজন চান পরাধীন দেশের আত্মিক মুক্তি যার অবলম্বন ধর্ম ও কর্ম। অন্যজন প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক মুক্তির মন্ত্রে দীক্ষিত, কারণ তাঁর মাতৃভূমিও তখন পরাধীন। দুই দেশেরই অভিন্ন শাসক । স্বামী বিবেকানন্দ ও মার্গারেট নোবেল। লন্ডন, ডেট লাইন ১৫ নভেম্বর, ১৮৯৫।

নরেন্দ্রনাথ দত্ত থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার মাঝখানে দীর্ঘ ঝড়বাদল, নিবিড় অধ্যাবসায়, সুতীব্র কৃচ্ছসাধন, স্বপ্নের নির্মাণ। অন্যদিকে মিস নোবেল জন্ম থেকেই বিপ্লবী পরিবারের কন্যা। তাঁর চোখে মাতৃভূমিকে মুক্ত করার স্বপ্ন। দুজনের স্বপ্নের অভিমুখ একই ছিল তাই বিবেকানন্দের সান্নিধ্যে মুগ্ধ হলেন নোবেল। এই সাক্ষাতের তিন বছরের মধ্যে তিনি ভারতে এসে স্বামীজির নির্দেশে জাতীয়তাবাদ প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। এই বিবেকানন্দ একটু ভিন্ন চেহারার মানুষ, সচরাচর আমরা যাকে চিনি, তেমন নয়। ইনি তখন রামকৃষ্ণ মিশন নিয়ে বৃহত্তর স্বপ্ন দেখছেন, সেটা যতটা হিন্দুধর্মের পুনরুত্থানের লক্ষে তার থেকে অনেক বেশি একটা স্থবির সমাজের মধ্যে সেবা ও কাজের জোয়ার তোলার প্রয়াসে। এই বিবেকানন্দ সেই মানুষ যিনি পুণায় প্লেগ কমিশনার র্যান্ড ও লেফটেন্যান্ট আয়ার্স্টকে হত্যার অভিযোগে চাপেকার ভাইদের ফাঁসি হলে (১৮৯৮) সোচ্চারে বলেন, বোম্বাইতে ওই দুজনের স্বর্ণমূর্তি স্থাপন করা উচিত। আর, ওই বছরেই মিস মার্গারেট নোবেল হয়ে উঠলেন সিস্টার নিবেদিতা। কিন্তু, তাঁর ভিতরের গড়ন রয়ে গেল একই। ভারতের গুপ্ত বিপ্লবী আন্দোলন তখন সদ্য পাপড়ি মেলছে, এই উন্মোচনের আড়ালে আছেন অন্য নিবেদিতা।
স্বামীজির সঙ্গে নিবেদিতার পরিচয় ও যোগ পুরো সাত বছরেরও নয়— ১৯০২-এর ৪ জুলাই যখন স্বামীজি প্রয়াত হন তার আগেই মিশনের সঙ্গে নিবেদিতার প্রত্যক্ষ যোগ বন্ধ হয়ে যায়। স্বামী বিবেকানন্দকে তিনি যেহেতু নিজের জীবনের পথপ্রদর্শক বলে মেনে নিয়েছিলেন তাই ব্যক্তিগতভাবে স্বামীজির সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তার উদ্বোধিত সেবার আদর্শেই তিনি আত্মনিয়োগ করেছেন ভিন্নভাবে। বিবেকানন্দের প্রয়াণ-সংবাদ পেয়ে যখন তিনি শেষ মুহূর্তে ছুটে আসেন, তখন মরদেহে অগ্নিসংযোগ হয়ে গিয়েছে। জীবনের আদর্শ পুরুষের প্রয়াণের পর নিবেদিতা শুরু করেন ভারত-ভ্রমণ আর প্রথমেই যান চাপেকার ভাইদের শোকস্তব্ধ মায়ের কাছে। নানা প্রদেশে ঘুরে মানুষের কাছে নিয়ে যান স্বাধীনতা আর জাতীয়তাবাদের বার্তা। মাত্র একপক্ষকালও হয়নি এমন মতিগতি দেখে মিশনের তৎকালীন প্রধান স্বামী ব্রহ্মানন্দ তাঁকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন: ‘হয় তোমাকে রাজনীতি ছাড়তে হবে, নয়তো ত্যাগ করতে হবে বেলুড় মঠ-কে।’ নিবেদিতা দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান, রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। মিশনের ক্ষুব্ধ সর্বাধিনায়ক দাবি করেন, এই বক্তব্য তাঁকে প্রকাশ্যভাবে জানাতে হবে। ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় চিঠি লিখে ভারতের বিপ্লবী আন্দোলনের একান্ত সহযোদ্ধা সিস্টার নিবেদিতা তাঁর এই মতামত জানিয়ে দেন। স্বামীজির মৃত্যুর মাত্র দুসপ্তাহের মধ্যে অমৃতবাজার পত্রিকায় একটি সংবাদে মিশন-সূত্র উদ্ধৃত করে লেখা হয়, এরপর থেকে নিবেদিতা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবেন, তাঁর কাজের ওপর মঠের কোনও অনুমোদন বা কর্তৃত্ব থাকবে না (১৯ জুলাই, ১৯০২)।
স্বামী বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা
কার্যত, সেই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার সুযোগ নিবেদিতা রাখেননি। পরবর্তী ন’বছর (১৯১১ পর্যন্ত) যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদিত রেখেছিলেন বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের নানা ধরনের কাজে। তা সে বোমা তৈরির রসায়ন শেখানোই হোক বা কোনও বিপ্লবীর হয়ে জামিন দাঁড়ানোই হোক, কিংবা হোক গুপ্তসমিতির পত্রপত্রিকা চালানো অথবা ভারতের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের নিপীড়ণ নিয়ে হাউস অফ কমন্সে গণমত গড়ে তোলা। বিপ্লবের আঁতুড়ঘর আয়ারল্যান্ডের কন্যা নিজেকে উৎসর্গ করেছেন আরেক পরাধীন দেশের মুক্তির আগুনে।
গতবছর, ২০১৭-তে সিস্টার নিবেদিতার দেড়শ বছরের উদযাপন শুরু হল এই রাজ্যে। চিরকুমারী নিবেদিতার কোনও উত্তরসূরি ছিল না, তাই রাজ্য সরকার বাগবাজারে নিবেদিতার বসতবাড়িটি অধিগ্রহণ করে তুলে দিয়েছিল রামকৃষ্ণ মিশনের হাতে। এর পরে সেই বাড়ি সংস্কার করে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি সংগ্রহশালা, সেখানে রয়েছে এক অসামান্যা নারীর জীবনযাপনের স্মারক। এখনো নানা কাজ চলছে সেই বাড়ি ঘিরে, উদযাপনের আরো নানা মুহূর্ত স্তরে স্তরে উন্মোচিত হবে যার প্রতিটিই সাধুবাদের যোগ্য। আমরা খুব একটা ইতিহাসসচেতন জাতি নই, ফলে এমন কাজেকর্মে আমাদের স্বস্তি জাগে। কিন্তু এক্ষেত্রে স্বস্তির পাশাপাশি একটা সংশয়ের কাঁটা । এই বিষয়টা কি ঠিক ইতিহাস মেনে হল? অবশ্য, ইতিহাস তো অতীত। অতীতের মূল্যায়ন বদলে বদলে যায় বর্তমানের মাটিতে দাঁড়িয়ে। সে যাই হোক, এ দেশের বিপ্লবী আন্দোলনে ভগিনী নিবেদিতার ভূমিকাকে অন্তত যেন ভুলে না যাই আমরা। তাহলে, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।
তথ্যঋণ : ভগিনী নিবেদিতা ও ভারতের বিপ্লব প্রয়াস — দেবজ্যোতি বর্মণ
(অনুবাদ – সন্দীপ বন্দ্যোপাধ্যায়) সূত্রধর প্রকাশন কলকাতা
