রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ

বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার ব্যঙ্গের কী জবাব দিয়েছিলেন তিনি?

রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম অধ্যক্ষ স্বামী ব্রহ্মানন্দ পরিচিত ছিলেন 'রাজা মহারাজ' বলে। কারো কাছে আবার 'রাখাল মহারাজ'। স্বামী বিবেকানন্দের চেয়ে ছিলেন ন'দিনের বড়। একবার স্বামীজির কথা প্রসঙ্গে রাজা মহারাজ বলেছিলেন – "স্বামীজিকে কে বুঝেছে, কে বুঝতে পারত?  তাঁর বই পড়ে তাঁকে বোঝা, আর তাঁর কাছে থেকে তাঁকে বোঝা, এক জিনিস নয়।" 

আসলে স্বামীজির সঙ্গে নানান বিষয় নিয়ে রাজা মহারাজের মান-অভিমান লেগেই থাকত। একবার স্বামীজির কাছে বকুনি খেয়ে অভিমানে দরজা বন্ধ করে রাজা মহারাজ কাঁদছেন। হঠাৎ দরজায় টোকা। দরজা খুলে রাজা মহারাজ দেখলেন স্বামীজি দাঁড়িয়ে। স্বামীজির চোখ ছলছল করছে। স্বামীজি রাজা মহারাজকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন – 'রাজা, ঠাকুর তোমাকে কত আদর করতেন, ভালোবাসতেন, সেই তোমাকেই আমি বকি, কত কটু কথা বলি,আমি আর তোমাদের কাছে থাকবার যোগ্য নই।"

কথা বলতে বলতে স্বামীজিও কেঁদে ফেললেন। রাজা মহারাজ স্বামীজির চোখ মুছিয়ে বললেন – "তুমি ভালবাসো বলেই বকো, বুঝতে পারি না বলে অনেক সময় কান্না পায়।"

আর একবার স্বামীজি রাজা মহারাজকে বললেন – "দেখ রাজা, একটা কাজ করতে পারো? রেসিং হর্স অকেজো হয়ে পড়ে তখন কী করে জানো? তাকে বন্দুকের গুলিতে মেরে ফেলে। আমি তোমাকে একটা রিভলবার জোগাড় করে দেব, তুমি আমাকে গুলি করে মারতে পারবে? আমাকে মারলে কোনও ক্ষতি হবে না,আমার কাজ ফুরিয়ে গেছে।" রাজা মহারাজ শুনে কেঁদে ফেললেন।

এই রাজা মহারাজ বেলুড় মঠে পাঁচটি বাতাবি লেবু গাছ লাগিয়েছিলেন। কারণ ডাক্তাররা স্বামীজিকে বাতাবি লেবু খেতে বলেছিলেন। কিন্তু স্বামীজি তার আগেই মারা যান। গাছে তখন সবে ফুল এসেছিল।

স্বামী ব্রহ্মানন্দের পূর্বাশ্রমের নাম রাখালচন্দ্র ঘোষ। জন্মেছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার সিকরা-কুলীনগ্রামে। বারো বছর বয়সে কলকাতায় এসেছিলেন পড়াশোনা করতে। সেখানেই নরেনের সাথে প্রথম আলাপ রাখালের। নরেনেই তাঁকে নিয়ে যান ব্রাহ্মসমাজে। নরেনের কথায় রাখাল যোগ দেন ব্রাহ্মসমাজে। বাল্যবিবাহের রীতি মেনে রাখালের বিবাহ হয়েছিল অনেক কম বয়সে। স্ত্রীর নাম বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু সংসার নিয়ে রাখাল বরাবরই উদাসীন প্রকৃতির। কারণ ঈশ্বরে ভক্তি তাঁর প্রবল। স্ত্রী বিশ্বেশ্বরীর দাদা মনোমোহন মিত্র ছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত। তিনিই রাখালচন্দ্রকে একদিন নিয়ে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। ঠাকুর রাখালের ভক্তি দেখে আকৃষ্ট হলেন।

কয়েকবার দক্ষিণেশ্বরে আসাযাওয়া করার পর রাখালচন্দ্র শ্রীরামকৃষ্ণের কথাবার্তায় এতটাই প্রভাবিত হলেন যে ঠাকুরের সঙ্গেই বসবাস শুরু করে দিলেন। সে সময় শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে নিয়মিত আসা শুরু করেছেন নরেন ছাড়াও কলকাতার নামীদামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্ররা। ঠাকুর স্বয়ং রাখালকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া শুরু করেন।

১৮৮৬ সালে ঠাকুরের মহাসমাধির পর বরাহনগরের ভাঙা পোড়োবাড়িতে রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলনের আতুঁড়ঘর হিসেবে যখন প্রথম রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন স্বামীজি ও অনান্য সন্ন্যাসীদের সাথে রাখালচন্দ্রও মঠে যোগ দেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় স্বামী ব্রহ্মানন্দ।

দুই বছর পর রাখাল মহারাজ বরাহনগর মঠ ত্যাগ করে পরিব্রাজক সন্ন্যাসীর জীবন নিয়ে বারাণসী, ওঙ্কারনাথ, বৃন্দাবন, হরিদ্বার প্রভৃতি তীর্থস্থান দর্শনে বের হন। পরিব্রাজক জীবনে তিনি অদ্বৈততত্ত্বের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান। এই সময় দিনের পর দিন তিনি সমাধিস্থ হয়ে থাকতেন।

পরিব্রাজক জীবন শেষে মঠে ফিরলেন। এদিকে স্বামী বিবেকানন্দ তখন পাশ্চাত্য পরিভ্রমণ সেরে সদ্য ফিরেছেন এবং রামকৃষ্ণ মঠকে পুনর্গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। অনেক সন্ন্যাসী মঠ তৈরির ভাবনার বিরোধিতা করেন। এই সময় স্বামী ব্রহ্মানন্দ স্বামীজিকে নানান বিষয়ে সাহায্য করেন। বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার পর স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠকে একটিট্রাস্ট হিসেবে নথিভুক্ত করেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দ এই রামকৃষ্ণ মঠের প্রথম সঙ্ঘাধ্যক্ষ বা প্রেসিডেন্ট হন। আজীবন তিনি এই পদ অলংকৃত করেছিলেন।

সন্ন্যাসীবৃন্দকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে স্বামী ব্রহ্মানন্দ সংঘকে স্থায়ী রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর রাজোচিত পরিচালন ক্ষমতা দেখে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর নাম দেন ‘রাজা’। সেই থেকে সংঘে তিনি 'রাজা মহারাজ' নামে পরিচিত হন।

একবার স্বামী ব্রহ্মানন্দের কাছে এসেছেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। মেঘনাদ সাহা কথা প্রসঙ্গে হাসতে হাসতে ব্রহ্মানন্দকে বললেন -"আমাদের বিজ্ঞান সবাইকে হাতেনাতে প্রমাণ করে বোঝানো যায়; আপনার ধর্মের ক্ষেত্রে কিন্তু তা সম্ভব নয়।" ব্রহ্মানন্দ বললেন – "না, তোমার বিজ্ঞানও তুমি সবাইকে হাতেনাতে কোনোভাবেই প্রমাণ করে বোঝাতে পার না।" এই বলে ব্রহ্মানন্দজী বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহাকে জানালার কাছে নিয়ে গিয়ে অদূরে গাছের নিচে ঘুমন্ত এক চাষিকে দেখিয়ে বললেন – ''যাও ওই দেখ গাছের নীচে গিয়ে ওই নিরক্ষর চাষিকে তোমার নতুন আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক তত্ত্বটি হাতেনাতে প্রমাণ করে বুঝিয়ে এস। দেখি তোমার কত ক্ষমতা।" মেঘনাদ সাহা নীরব। কারণ, ব্রহ্মানন্দজীর ইঙ্গিত তিনি বুঝতে পেরেছেন। আসলে বিষয়গত প্রাথমিক জ্ঞান না থাকলে কোনও তত্ত্বই বোঝা যায় না, ধর্মতত্ত্ব তো নয়ই।

স্বামী ব্রহ্মানন্দের বাড়িতে ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হত। যা শুরু করেন বংশের পূর্বপুরুষ দেবীদাস ঘোষ। সেইসময় মাটির দেওয়ালের উপর আটচালা গোলপাতায় ছাওয়া মণ্ডপে পূজা হত। ১৮১০ সালে পরিবারের সদস্য কালীপ্রসাদ ঘোষ মাটির ও পাতায় ছাওয়া মন্দির ভেঙে চুন সুরকি ও ইট দিয়ে পাকা দুর্গা দালান তৈরি করেন। তারপর থেকে সেই দুর্গা দালানেই পুজো শুরু হয়। প্রথমদিকে এই পুজোয় বলি প্রথা ছিল। কিন্তু, স্বামী ব্রহ্মানন্দ একটু বড় হওয়ার পর তাঁরই আপত্তিতে উঠে যায় সেই প্রথা। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী, রথের দিন ঠাকুরের কাঠামো পুজো হয়। কাঠামোর মূল কাঠটি ছিল আড়াইশো বছরেরো প্রাচীন। বেলুড় মঠের প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন হলে স্বামীজির সঙ্গে পুজার বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেন রাজা মহারাজ।

স্বামীজি মারা গেলে দুর্দিনে নিবেদিতার পাশেও ছিলেন রাজা মহারাজ। সামান্য রোগভোগের পর, ঊনষাট বছর বয়সে কর্মযোগী স্বামী ব্রহ্মানন্দ, মহাসমাধিতে লীন হন। বেলুড় মঠে যে স্থানটিতে তাঁর পার্থিব দেহ পঞ্চভূতে লীন হয়, সেখানেই আজ তাঁর স্মরণে ব্রহ্মানন্দ মন্দির প্রতিষ্ঠিত।

Developed by DXDasia