
এখানে যে-দুটো পক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে, তারা কামুক পুরুষ আর অবলা নারী
‘যেতে দাও গেল যারা’ বলে পাশ কাটানোর উপায় নেই বা নিন্দুকে যা বলছে বলুক, ‘তাতে তোমার কী আর আমার কী’ বলে সুর ভাঁজাও বৃথা। গত একপক্ষকাল ধরে সে এসে পড়েছে ঘাড়ের ওপর। এবং সপাটে ব্যাটিং করেই চলেছে একটানা। বীরেন্দ্র শেহবাগের মারকুটে ইনিংস বা নিম্নচাপের মনখারাপ করা বৃষ্টি, যার সঙ্গে খুশি তুলনা করা যায় তাকে। কিন্তু একেকটা উন্মোচন মানে একেকটা মানব বোমা বা আরো স্পষ্ট করে মানবী বোমা বললেই বোধহয় সঠিক ব্যঞ্জনা ধরা পড়ে তার। হ্যাশট্যাগ মিটু । মূলত পুরনো কাসুন্দি নিয়ে নাড়াচাড়া, তবে সময়ের ধুলো পড়ে আসলে যা ফ্যাকাশে বা বিস্বাদ হয়ে যাওয়ারই কথা ছিল, আদপে তা হাওয়া-বাতাসের গুণে চনমনে। যার থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে নতুন নতুন বিতর্ক, আনকোরা ‘দাদার কীর্তি’, নতুন নতুন নায়করা নিমেষে পরিণত হচ্ছেন খলনায়কে। চাষিরা ন্যায্য ফসলের দাম পাবেন কি না বা জ্বালানি তেলের দাম কমানো যায় কি না কিংবা দেশের পড়তি অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা যখন আলোচনারই অবকাশ পান না, তাঁরাও এই ক্ষেত্রে নড়েচড়ে বসে গড়ে ফেলেছেন এক শক্তিশালী মন্ত্রীগোষ্ঠী। ভাবা হচ্ছে এইসব অভিযোগের বিচার করার জন্য আলাদা আদালত তৈরির কথা। অথচ গুরুতর সব সমস্যা নিয়ে মামলার পাহাড় রোজই একটু একটু করে বেড়ে যাচ্ছে আপনমনে! ঝড়ের দাপটে যখন একেকদিন একেকজন সেলিব্রিটি নক আউট হয়ে যাচ্ছেন, আজ ফিল্মের ডিরেক্টর তো কালকে সংবাদপত্রের সম্পাদক- তখন প্রতিদিনের কাগজ হাতে আসার আগেই এক রোমাঞ্চ, আজ কে গেলেন! কে? এও এক উত্তেজনা বটে, টি-টোয়েন্টির লাস্ট ওভারের থেকে কম কীসে? সুতরাং টিআরপি থাকলে যেহেতু প্রযোজকের অভাব হয় না এক্ষেত্রেই বা তার অন্যথা হবে কেন? অর্থাৎ খেলা জমে গেছে।
কিন্তু এসবের মাঝে কিছু খটকা যা নিচু গলায় বলাটাই সম্ভবত বুদ্ধিমানের কাজ। যে সব মহিলা ইতিমধ্যেই নিজেদের পুরনো নানা অভিজ্ঞতার কথা বলে শিরোনামে এসেছেন তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি আমার সমবেদনা। কর্মক্ষেত্রে বা পেশাগত জীবনে যারা কোনও কারণে তাঁদের ওপরওয়ালার কাছে নিগৃহীত হয়েছেন, অবশ্যই সকলেই এই গোত্রে পড়েন না, তবু এই নিগ্রহ ও কেবল মহিলা বলেই যৌন হেনস্থা কোনোভাবেই সমর্থন করা চলে না, কোনো যুক্তি দিয়েই একে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। এটাও ঠিক, এত বছর পরে সেই বিশেষ পরিস্থিতির থেকে কিছুটা সুবিধেজনক দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাঁরা যে পুরনো অভিজ্ঞতা প্রকাশ করছেন, এটা কিছু দোষের নয়। দুনিয়ায় সবাই যে র্যাডিকাল বিপ্লবী হবেন এমন তো আর হতে পারে না। এতদিন পরে কোনও অপরাধ প্রকাশ হল বলে বা এখন তা প্রমাণ করার কোনও জোরালো সংস্থান নেই বলে অপরাধটাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায় না। আমাদের বিচারব্যবস্থায় খুনের অভিযোগও প্রমাণের অভাবে বেকসুর খালাশ হয়ে যায়; সেটা বিচারের দর্শন হতে পারে কিন্তু তাতে যিনি খুন হলেন তার পরিবারের বেদনা কমে আসে না, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েই যায়। হাতের কাছেই তো সারদা কেলেঙ্কারির উদাহরণ। যেসব মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন, যাদের পরিবার ভেসে গেছে তাঁদের বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করল, তাদের কবে কতদিনে কী সাজা হবে বা আদৌ হবে কি না, সে আজও লাখ টাকার প্রশ্ন। তার ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হলেন তাদের কোনও সান্ত্বনা নেই, এখানেও তাই।
আরও পড়ুন
এখনও গেল না ‘আধার’- ১
এখন কথাটা হল, সমস্যাটার ঠিক ঠিক ব্যাখ্যা হচ্ছে কি? ক-বাবু একটি ফিল্মের প্রযোজক হিসেবে মিস খ বা মিসেস গ-কে নিজের ফিল্মে নেবেন বলে তাকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করলেন। অথবা ঙ-সংবাদপত্রের জাঁদরেল সম্পাদক, যার হাতে জুনিয়র সাংবাদিকদের কেরিয়ার নির্ভর করছে, তিনি শ্রীমতী প বা কুমারী ফ-কে কিছু সুবিধে দেওয়ার বিনিময়ে যৌন-পীড়ন করলেন। কাজ হারানোর ভয়ে তারা এই বিষয়ে তখন উচ্চবাচ্য করলেন না কিন্তু মনে পুষে রাখলেন এই অপমান, পরে নিজেদের সঙ্গে সেইসব নিপীড়কদের যোগ, বলা ভালো স্বার্থের যোগ, ছিন্ন হলে এখন তাঁরা সেইসব অতীত প্রসঙ্গগুলোকে প্রকাশ্যে সামনে আনছেন। কেউ সাংবাদিকদের জানাচ্ছেন, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখছেন, কেউ আইনের কাছেও যাচ্ছেন। যাঁরা অপরাধ (মানে এইসব ছিঁচকে অপরাধ) করে থাকেন তাঁরা সচরাচর দুঃসাহসী হন না, তাই তাঁদের এগুলো মনে থাকে। তাই এইসব ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতিক্রিয়া মাছি তাড়ানোর মতো উড়িয়ে দেওয়ার। আসলে তাঁরা জানেন যে অবস্থানে থেকে ওইরকম কুবুদ্ধি ও লালসা তাদের লিবিডো-প্রবণ করেছিল, সেই অবস্থানের তেমন কোনও বদল ঘটেনি। যিনি সেইসময় ফিল্ম বানাতেন আজ তিনি মাল্টিপ্লেক্সের সিকিউরিটি গার্ড হয়ে যাননি, নামী কাগজের দামী সম্পাদক এখন বাড়ি বাড়ি কাগজ দিয়ে বেড়ান না। সুতরাং এসবে তাঁরা তেমন বিচলিত নন, এমনটাই স্বাভাবিক।
অথচ কিছুটা প্রচারের বাড়াবাড়িতে যেটা আড়ালে চলে যাচ্ছে তা হল এই পুরো বিষয়টার মধ্যে একটা ক্ষমতার চেনা ছক আছে। এটা কেউ এখনও বলেছেন বলে চোখে বা কানে আসেনি। এখানে যে-দুটো পক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে, তারা কামুক পুরুষ আর অবলা নারী। কিন্তু এই সমীকরণ কি সত্যি ও বিশ্বাসযোগ্য? কারণ, এখানে যিনি নিপীড়কের ভূমিকায়, তিনি আগে ক্ষমতার রক্ষক ও প্রতিনিধি পরে তিনি পুরুষ, পুরুষ না হয়ে তিনি নারীও হতে পারতেন, হয়তো তেমন উদাহরণ পাওয়াও সম্ভব। আর যিনি নিপীড়িত হলেন তিনি আসলে ক্ষমতার দাপটের কাছে নতজানু ও সহায়হীন ক্রীড়নক, পরিচয়ে তিনি নারী, না হলেও তাঁর নিস্তার ছিল এমন নয়। হয়তো নারী বলেই তাঁর শরীরের একটা অন্যরকম মাত্রা আছে- তাই নির্যাতনের অভিমুখ তার শরীর। এর সবটাই ঘৃণ্য, প্রতিবাদের যোগ্য। সেই প্রতিবাদ হচ্ছেও।
যৌন নিপীড়নের কথাই যদি ধরতে হয় তাহলে তো তার মস্ত একটা অংশই ঘটে চলে পরিবারের ভিতর, যার মধ্যে প্রত্যক্ষ শারীরিক নির্যাতনও বাদ পড়ে না। সেখানে পারিবারিক ক্ষমতার কেন্দ্রে আছে স্বামী ও তার পরিবার, আর নৈতিকভাবে উচিত না হলেও বাড়ির বধূটি সেই ক্ষমতার ওপর সাধারণভাবে নির্ভরশীল। তাই তাকে, তাদের মতো আরো অনেককে, প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজের একটা ভগ্নাংশ দখল করে থাকতেই হয়। কিন্তু তারা হ্যাশট্যাগ মিটু ব্যাপারটা আসলে কী বা কাকে বলে জানেই না। জানলেও কী কতটা সুবিধে হত বলা মুশকিল। হ্যাঁ, তাদের নিরাপত্তার জন্য আইন আছে, সামর্থ্য থাকলে তারা তার দুয়োরে সুবিচার চাইতে যেতেই পারে। তবে শ্বশুরবাড়ি বা স্বামীর যদি কোনও ‘কানেকশন’ থাকে তাহলে পুলিশ-প্রশাসন তাদের ক্ষমতাকে তির্যকভাবে প্রয়োগ করতে পারে, সুবিচারের পথে তখন ছড়িয়ে পড়বে এবড়ো খেবড়ো পাথর। আসলে এখানেও সেই লাঠি হাতে পথে দাঁড়িয়ে গেল ক্ষমতা।
বিপরীতে যদি দেখি আইনের অন্যদিক, যেখানে পরিবারের বধূটি নিজে রোজগারপাতি করে, স্বামীর রোজগারের সঙ্গে পাল্লা দেয়- শ্বশুরবাড়ি ও স্বামীকে শায়েস্তা করতে সে যেতেই পারে পুলিশে প্রশাসনে আদালতে, এই ‘শায়েস্তা প্রয়াস’ ও তার কারণ যে সব সময়ই খুব স্বচ্ছ ও নৈতিক এমনটা খুব বুক বাজিয়েও বলা যায় না। তখন সেই প্রশাসন-পুলিশ এরাই তার ক্ষমতার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করতে দাঁড়িয়ে পড়ে। বিনাদোষে স্বামী ও তার পরিবারকে গ্রেফতার করা হয়, একটা পরিবার তছনছ হয়ে যায়। শতকরা নব্বইভাগ অভিযোগ শেষপর্বে ভুয়ো প্রমাণিত হয় বলে সর্বোচ্চ আদালতেরই পর্যবেক্ষণ কিন্তু ক্ষমতার দাপট ততক্ষণে যা ক্ষতি করার করেই দিয়েছে। মানে সবটাই কিন্তু কোনো না কোনো ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর্থিক সামাজিক পারিবারিক প্রশাসনিক যাই হোক না কেন। শ্রীমতী রূপান বাজাজ নামক যে আইএএস অফিসার বহুকাল আগে পাঞ্জাব পুলিশের “কৃতী” প্রধান কেপিএস গিলের প্রকাশ্য অসভ্যতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তিনি এটা করতে পেরেছিলেন। কারণ তিনি নিজে প্রশাসনিক ক্ষমতার শরিক ছিলেন, আর গিল ওই গা ঘিনঘিনে কাজটা করতে পেরেছিলেন কারণ, তিনি মনে করতেন নিজের পদাধিকারের ক্ষমতায় তিনি এটা করলে কোনও শাস্তি পাবেন না। কার্যত তিনি শাস্তি পাননি, রাজনৈতিক প্রভুদের কৃপায় তিনি পরেও পদোন্নতি পান, আরও উচ্চপদে আরও ক্ষমতার আস্বাদ উপভোগ করেন। এখানে আবার রাজনীতির ক্ষমতা গিলের অপরাধকে প্রশ্রয় দিয়ে বুঝিয়ে দেয় আসলে ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়ান ক্ষমতার প্রতিনিধিরাই। পুলিশবিভাগে একটা সাধারণ প্রবণতা হল, নিচু পদের পুলিশ কর্মচারীদের দিয়ে উঁচু পদের পুলিশ অফিসারদের ব্যক্তিগত কাজ করানো- প্রায় সমস্ত আইপিএস অফিসাররা অন্তত যাঁরা জেলাস্তরে কাজ করেন, তাঁরা হোমগার্ডদের দিয়ে নিজের বাড়ির বাজার বা দোকানপাট করান। বেচারা হোমগার্ডরা মুখ বুজে নির্বিবাদে ‘বড়সাহেব’-এর খিদমত খাটেন (পুলিশমহলে জেলার পুলিশ সুপারের নাম বড়সাহেব) যদি তাঁদের চাকরি স্থায়ী হওয়ার একটা ব্যবস্থা সাহেব খুশি হয়ে করে দেন। এরা কোনোদিনই হ্যাশট্যাগ মিটু লিখতে বা বলতে পারবেন না। আসলে ক্ষমতার দাপটই শেষকথা।
(চলবে…)
