
দেকার্ত বোধহয় একবার তাঁর কোনো লেখায় বলেছিলেন, পুরোনো শতাব্দীর সঙ্গে কথা বলার একমাত্র মাধ্যম হলো বই। এতটা গভীর অর্থে না ভেবে দেখলেও আমাদের সকলেরই জীবনের কিছু কিছু সময় বইয়ের সঙ্গে ঘর করতে হয়, ইচ্ছেয়-অনিচ্ছেয়। স্কুলের পাঠ্য বই প্রথমে বেশ নতুন লাগে তারপর তাতে যখন দাগ দিয়ে দিয়ে বলা হয়, এইটুকু জরুরি, বাকিটা না পড়লেও চলে সেই প্রথম বইকে আমরা একটু সন্দেহের চোখে দেখতে শিখি। পরীক্ষার স্তর যত উঠতে থাকে বইয়ের ওজন ও আয়তন বেড়ে যেতে থাকে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বা স্নাতকের বইয়ের দিকে তাকিয়ে বুকের মধ্যে থরথর করে ওঠে, এখন এতটা পড়তে হবে ! তার থেকে বিরক্তি আর দূরত্ব। বইয়ের সঙ্গে পরীক্ষা ও তার ফলাফল জড়িয়ে গেলেই বিপদ। কিন্তু দেকার্ত যে অর্থে ওই কথা বলেন তার মধ্যে থাকে বই কে ঘিরে একরকম আশ্রয়ের দ্যোতনা। একে একটু বাড়িয়ে নিয়ে যদি কিছুটা বিনোদনের কথাও ভাবি, তাতেই বা ক্ষতি কী? সুকুমার রায় বা পরশুরাম অথবা শিব্রামের লেখা শুধু তো ভাল লাগে, তাতে কোনও মাথা ভারী করা কথা নেই বলেই – অথচ অনেক কিছুই আছে যা হয়তো বা থান ইট-সদৃশ দর্শনের বইয়ে নেই। তাকে নাকচ না করেইএঁদের পড়া যায়। তাই ‘বই’ বলতে, অন্তত যে বইকে আস্থা ও আশ্রয় বলে ভাববার কথা বলতে চাইছি, তা অবশ্যই কোনও স্কুল/ কলেজের অ্যাকাডেমিক পাঠ্য বই নয়, যে বইয়ের নির্মাণ হয় সিলেবাসের ঘেরাটোপে, যার বিভিন্ন অধ্যায়কে প্রথমেই পরীক্ষার পক্ষে দরকারি বা কম দরকারি শিরোনামে বিশেষিত করা হয়ে যায়।
খুঁজে বেড়াতে বেড়াতে যেমন মনের মানুষ বা মানবীকে আবিষ্কার করে ফেলা যায়, কোনও কোনও বইও তেমন এক আবিষ্কারের রোমাঞ্চ নিয়ে জড়িয়ে যায় জীবনের সঙ্গে, পরে জীবনযাপনের সঙ্গেও। তখন তাকে সযত্ন সংরক্ষণই একমাত্র দায়। বইয়ের মালিক নশ্বর কিন্তু বইয়ের তো মরণ নেই! স্কুলবেলা পেরিয়ে যাদবপুরের আন্ডার গ্র্যাজুয়েট ফ্যাকাল্টিতে যে কলেজবেলা শুরু হয়েছিল আমার, তিন দশকেরও বেশি আগে, সেদিন থেকেই কলেজপাঠ্য স্নাতকের বইয়ের পাশে পাশে হরেক বইয়ের অন্বেষণে আমি এক পর্যটক হয়ে আছি আজও। যেসব বইয়ের সঙ্গে সনাতন পদার্থবিদ্যা, উচ্চতর গণিত বা রাশিবিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞানের কোনও সম্পর্ক ছিল না – হয়তো সেই কারণেই অ্যাকাডেমিক জগত থেকে আমার কক্ষচ্যূত হওয়া ও স্রেফ বখে যাওয়া। এমনই এক বইয়ের কথা শোনানো যাক।
রবীন্দ্রনাথের সমকালে যারা তাঁর সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিলেন তাঁরা বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রসান্নিধ্যের স্মৃতিকথা লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন প্রমথনাথ বিশী, শান্তিদেব ঘোষ, সৈয়দ মুজতবা আলি, ক্ষিতিমোহন সেন, মৈত্রেয়ী দেবী, রাণী চন্দ প্রমুখ । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ঘরের মানুষের মধ্যে একমাত্র পুত্র রথীন্দ্রনাথই একটি স্মৃতিকথা লেখেন ইংরাজিতে – ‘থ্রু দি এজেস অফ টাইম’, পরে তিনি নিজেই তার একটা বাংলাভাষ্য করেন যা ‘পিতৃস্মৃতি’ নামে প্রকাশ হয় । সেই বইয়ের ইংরিজি সংস্করণ ছেপেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত ম্যাকমিলান প্রকাশনা সংস্থা, বাংলায় বইটি বহুকাল আগে প্রথমে প্রকাশ করে শিবনারায়ণ রায় প্রতিষ্ঠিত রেনেসাঁ প্রকাশনা, পরে কালীঘাটের ‘টেগোর রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ এর প্রকাশনা বিভাগ। লাইব্রেরিসূত্রে বইটি আমি দুবার পড়ি। প্রথমবার অসীম কৌতূহলে, বিশ্বখ্যাত বাবাকে তাঁর পুত্র কীভাবে দেখেছেন সেই অভীপ্সা থেকে। আর দ্বিতীয়বার বইটা আমার প্রয়োজন হয় ছোটো মাপের একটা গবেষণার সূত্রে। ২০১১ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ র শতবর্ষে এই অভাজন একটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন, সেই সূত্রে কিছু তথ্যসূত্র ইত্যাদি দরকার হয়েছিল এই বইয়ের। অথচ আশ্চর্য এই যে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষেও এই বইটি পুনরায় প্রকাশের কোনও আয়োজন ঘটেনি। আমি ব্যক্তিগত সূত্রে অন্তত তিনজন প্রকাশককে হাতে-পায়ে ধরে মিনতি করেছিলাম, বইটা আপনারা ছাপুন, লাইব্রেরি থেকে পুরো বই ফটোকপি করার দায়িত্ব আমি নেব! কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা। বইটা ছাপা হওয়া দরকার এবং তা না হলে আমার সংগ্রহে সেটা আসবেই বা কী করে? অথচ এই সময়কালে রবীন্দ্রনাথের জীবনের নানা আরোপিত ও অনৈতিহাসিক কেচ্ছাকাহিনি নিয়ে বেশ কিছু বই প্রকাশ পেয়ে ‘বেস্ট সেলার’-এর তকমা পেয়েছে । যাই হোক, এইসব নিয়ে কিছু না বলাই ভালো – বাজার বড় বালাই!
বলতে চাই, বরং সেই গনগনে দুপুরটার কথা। কলেজ স্ট্রিটের ‘দে বুক স্টোর’-এর কাউন্টারে বেশ কয়েকটা বইয়ের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছি। সেলস কাউন্টারের কর্মীটি নেহাত বইয়ের দোকানের মামুলি কর্মচারী হলেও, অনায়াস দক্ষতায় কোনও বইয়ের নাম বললেই বলে দিতে পারেন তা কোন প্রকাশনার এবং বইটি এখন ছাপা আছে কি না । এ বড় হেলাফেলার প্রতিভা নয়। নিয়মিত ক্রেতা হিসেবে আমায় একটু বাড়তি কমিশনও দেন। এই অপেক্ষার মুহূর্তেই একটা বই বোঝাই ভ্যানগাড়ি এসে দাঁড়ায় দোকানের সামনে। অপরিসর রাস্তায় দড়ি দিয়ে বাঁধা বইয়ের বান্ডিল নামতে থাকে একে একে। আর তেমনই এক বান্ডিলের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ স্থির হয়ে যায়। ‘পিতৃস্মৃতি’। পেপারব্যাক মলাট, নিতান্ত নিরলংকার প্রচ্ছদ। সেই বই? বেরল তবে ? চমকে উঠি। বলি, এই বই কবে বেরোল?
সেই কর্মীটি বলেন, এই তো দিন তিনেক আগে। আমরা আজকে একশো কপি তুললাম। কালক্ষেপ না করে বলি, বান্ডিল খুলুন, প্রথম কপিটা আমার। এক্ষুনি দিন। ক্যাশ্ মেমো তৈরি হওয়ার আগেই আমার হাতে উঠে আসে সেই প্রার্থিত বই । সাগ্রহে তাকাই প্রকাশন সংস্থার নামের দিকে । না, কোনও নামী প্রকাশন নন, এই বই বহু বছর পরে পুনর্মুদ্রণ করে আমাদের ঋণী করেছেন ‘বৈতানিক’। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৈরি প্রতিষ্ঠান। এর থেকে বড় দায়বদ্ধতা আর কী হতে পারে।
কোহিনুর নয়, সাকুল্যে আড়াইশো পৃষ্ঠার বই নিয়ে যখন বাড়ি ফিরি, মনে হয় এ যেন এক আশ্চর্য সমাপতন। আমি ঠিক ওই দোকানে ওই সময় হাজির তো নাই হতে পারতাম! তাহলে কী করে পেতাম ওই বই? না, আজও অবধি ওই বইয়ের পুনঃপ্রকাশের কোনও বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়েনি। কাঁচের পাল্লা সরিয়ে ওই বইটার প্রচ্ছদে হাত রেখে মনে পড়ে এক রৌদ্রদগ্ধ দুপুর, মনে হয় কোনও বন্ধুর হাত ধরে আছি। বন্ধুতারই তো অন্য নাম সখ্য। সই।
একটা আপ্তবাক্যের উচ্চারণে শুরু হয়েছিল এই লেখা – হ্যাঁ ঠিকই, বইই সেই আলাপন মঞ্চ যেখানে এক ফেলে আসা সময় এসে হাত ধরে চলতি সময়ের, তৈরি করে দেয় এক নিবিড় অনপেনয় সেতু। এ তো এক অনিঃশেষ যাত্রা !