ফোর জি ইন্টারনেট পরিষেবার যুগেও লাইব্রেরি পুরোপুরি গুরুত্বহীন হয়ে যায়নি
মোটামুটি মাঝারি মাপের একটা লম্বা ঘর। নোনাধরা চওড়া দেওয়ালের গায়ে গায়ে বেশ কিছু নিচু কাঠের র্যাক। দুটো তিনটে আলমারি। তারই একদিকে নড়বড়ে একটা কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপারে লোহার জং-ধরা চেয়ারে বসে সেই বৃদ্ধ। সারা মুখে শ্বেতির দাগ। চওড়া ইন্দ্রলুপ্তের ওপর তার দাপট যেন আরো বেশি। ইনি প্রতি রবিবার দরজা খুলে অপেক্ষা করেন। যদি পাড়ার একটা-দুটো ছেলেমেয়ে আসে। আসেন একজন আধজন প্রবীণ, প্রবীণা। এই গ্রন্থাগার কবে কীভাবে আরম্ভ হয়েছিল তার ইতিহাস যারা জানতেন তাঁরা আজ আর কেউ জীবিত নেই। রয়ে গেছেন ওই নাছোড় বৃদ্ধ। রবিবার সকালে তার সময়ের কোনও ঘাটতি নেই। ঘড়িতে দশটা বাজলেই তিনি চাবি খোলেন। ঘর সাজান। অপেক্ষা করেন। আবার চলে যান। তেমন কেউ আসে না। বারোটার সময় দরজায় চাবি লাগানোর সময় তাঁর আপাত কুৎসিত মুখেও এক বিষণ্ণতার আলপনা।
কলকাতার উত্তর শহরতলির আরেকটি পাড়ার লাইব্রেরি সামলান এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। এলাকার মানুষের একদা-উৎসাহে সেই গ্রন্থসত্রের সূচনা। পরে সবাই বড় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপর চারদিনের এক নাগাড়-বৃষ্টিতে লাইব্রেরি ঘর ডুবে গেলে প্রচুর বই আর বাঁচানো যায়নি। মাত্র কিছু ভিজে বই জরুরি ভিত্তিতে সরানো গিয়েছিল অন্যত্র। এখন সেগুলির প্রচ্ছদ উধাও, কিছু পাতা দুষ্পাঠ্য । তবু তাঁরা আগলে রেখেছেন সেগুলি। কেউ চাইলে যত্ন করে এগিয়ে দেন। কিন্তু সন্ধ্যের মশা-অধ্যুষিত সেই ঘরে ধূপ জ্বালিয়ে বসলেও পাঠকের আনাগোনা নিতান্ত সীমিত। প্রৌঢ়া নিজেই বসে বসে বই পড়েন আবার সময় হলে বন্ধ করে চলে যান।
পশ্চিমবাংলার শহর, গ্রামগঞ্জ, মফস্বলের গ্রন্থাগারগুলির কোনও ইতিহাস লেখা হয়নি কোনোদিন, হবে এমন আর ভরসা নেই। যদিও কলকাতা বা বৃহত্তর কলকাতার অভিজাত সুসংস্কৃত জনপদগুলিতে কিছু হাতেগোনা গ্রন্থাগার বাদ রাখলে বেশিরভাগ আঞ্চলিক গ্রন্থাগারগুলি স্থাপিত হয়েছিল স্থানীয় মানুষের আগ্রহে, উদ্দীপনায়। কলকাতার চারপাশ জুড়ে যেসব এলাকা ক্রমে ছিন্নমূল মানুষের উপনিবেশে রূপান্তরিত হয় সেখানে একটা বারোয়ারি পুজোমণ্ডপের পাশে পাশে তৈরি হয়েছে সাধ্যমতো অন্তত একটা প্রাইমারি স্কুল ও লাইব্রেরি — হয়তো তার নাম নেতাজী পাঠাগার বা দেশবন্ধু লাইব্রেরি কিংবা স্বাধীন সঙ্ঘ পাঠচক্র । আমাদের ছেলেবেলার মফস্বলের এমনই এক উদ্বাস্তুপল্লিতে তৈরি হয়েছিল ছিটেবেড়া আর মাটির মেঝের ঘরের লাইব্রেরি ‘অক্ষরমুখ’, এলাকার উদ্যোগী যুবকদের আন্তরিকতায় তা চলেওছিল কিছুদিন। তারপর সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেন অক্ষরের বিপরীতে।
কথাটা একমাত্র এই নয় যে, বেশিরভাগ মানুষ, যাদের আমরা জনগণ বলতে অভ্যস্ত, তাঁরা গ্রন্থাগারের ছায়া মাড়াতে ভুলে গেছেন। বিনোদনমূল্যে গ্রন্থাগারকে বিচার করা হয়তো সমীচীন নয় কিন্তু একটা সময় ছিল যখন গ্রন্থাগার থেকে সাধারণ পাঠক আখ্যানসাহিত্যের বই নিতেন; নিজেদের অবসরে তা পাঠ করে একরকম রস আস্বাদন করতে পারতেন। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরিগুলি প্রধানত সেই রসের জোগান দিত। নামী লাইব্রেরির প্রয়োজন মূলত সিরিয়াস পাঠকের এবং গবেষকের। সেই প্রয়োজন এখনো ফুরোয়নি, কারণ, দুর্বার ইন্টারনেট পরিষেবার বাইরেও এখনো গবেষণার বেশিটাই জোগান দেয় লাইব্রেরি, বিশেষ করে মানবীবিদ্যার ক্ষেত্রে তা আরো প্রবলভাবে সত্যি। তবু লাইব্রেরি বিষয়টা এখনো সাধারণ সাহিত্যপিপাসু পাঠকদের জন্যই, তাদের কুতূহলী সাহিত্যতৃষা নিবারণের প্রশস্ত মঞ্চ। সাহিত্যের পাঠক কমে গেছে কি না এটা এক নিঃশ্বাসে বলে দেওয়ার মতো বিষয় নয় কিন্তু লাইব্রেরি ঘরে পাঠকের আনাগোনা কমেছে নিশ্চয়ই।
সবাই জানেন এই দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিশন না গড়লেও চলে। ইতিহাস বলে, আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র চালু হওয়ার পরে বাংলা গানের পরিধি বিস্তৃততর হয়েছিল কিন্তু কলকাতায় দূরদর্শনের প্রচলন বাঙালির সাহিত্যপাঠকে কোনও নতুন মাত্রা দিতে পারেনি। ক্রমশ টেলিভিশন মাধ্যমটির প্রকাণ্ড থাবার নীচে চাপা পড়ে গেছে বাংলার আখ্যান-সাহিত্য। না-পড়ে যদি দেখে নেওয়া যায় এবং দেখাই হয়ে ওঠে অনিঃশেষ বিনোদনের ভাঁড়ার , তাও আবার নিজের ঘরে বসে— তাহলে বেশিরভাগ মানুষ বই পড়বেন কেন ? আমরা সবাই বুঝি পড়ার থেকে দেখা তুলনায় সহজ ও অনায়াস। পরের প্রজন্মে এসে ইন্টারনেট আরেকবার নতুন করে পাঠকের হাত থেকে একদিকে যেমন সাবেকি বই কেড়ে নিল অন্যদিকে তাঁর সামনে খুলে দিল ই-বইয়ের এক নতুন মাত্রা। বিভিন্ন অনলাইন লাইব্রেরিতে অনেক পাঠক বই পড়েন আর তার মধ্যে আখ্যান-সাহিত্যের পাঠকই বেশি। বাংলা ভাষায় দুই বাংলার সমস্ত জনপ্রিয় ও বিশিষ্ট লেখকের বই বিনি পয়সায় ইন্টারনেটে পড়ে নেওয়া যায়। তাহলে সন্ধের অবসরে পাঠক লাইব্রেরি যাবেন কেন?
সমান্তরালে এটাও ঠিক যে গত কয়েক দশকে রাজ্যে গ্রন্থাগার ব্যবস্থার খোল-নলচে বদলে গেছে । সারা রাজ্যের গ্রন্থাগারগুলিকে স্তরে স্তরে বিন্যস্ত করে সেখানে কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে, গ্রন্থাগার দফতরের জন্য একজন মন্ত্রী আছেন, রয়েছে তাদের দফতরের নিজস্ব কৃত্যক। গ্রন্থাগারবিজ্ঞান পড়াশোনার জন্য স্বতন্ত্র বিভাগ রয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে । সরকারি লাইব্রেরির আধিকারিকরা মোটা মাইনে পান। প্রযুক্তির সঙ্গে যোগ রেখে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাকেও সাজানো চলছে প্রতিনিয়ত। এই মুহূর্তে রাজ্যের সমস্ত সরকারি লাইব্রেরিকে একটি সাধারণ যোগাযোগের আওতায় আনার কাজ চলছে। চেষ্টা চলছে প্রাচীন, দুর্মূল্য বই ও নথিকে ডিজিট্যাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণের আওতায় আনা ও আগ্রহী পাঠকের কাছে তা ওয়েবপোর্টালে তুলে ধরার।
তবু মোবাইল ফোনের সর্বগ্রাসী আবহে যেমন এখনো কোথাও রয়ে গেছে সাবেকি ল্যান্ডফোন তেমনি লাইব্রেরিগুলি সব শুকিয়ে মরে গেছে এইকথা বলা অনৃতভাষণ। এখনও সাধারণ আগ্রহী পাঠকের জন্য রয়ে গেছে তাদের প্রতীক্ষা। কিন্তু সেই প্রতীক্ষারও আছে এক অবয়ব। অভিজ্ঞতা বলে, লাইব্রেরিতে নিয়োগ-হওয়া সাধারণ কর্মীরা সচরাচর বইবিমুখ এবং পারতপক্ষে বইয়ের খবর তারা রাখেন না। কিন্তু এর বাইরে আছেন একদল মানুষ যারা আজও বইয়ের নিবিড় পাঠক, সরকারি বেসরকারি গ্রন্থাগারগুলিতে তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজেদের অন্বিত রেখেছেন। গ্রন্থাগার মানে যে আসলে মানবসভ্যতার সঞ্চিত জ্ঞানসমুদ্র আর সেই সূত্রেই সেগুলি হয়ে উঠতে পারে আলাদা একরকম সামাজিক শিক্ষাসত্র— এই নাছোড় বিশ্বাস তাদের দেখলে নতুন করে রোপিত হয় আমাদের মনে। ওই বিষণ্ণ বৃদ্ধ বা অবসৃত শিক্ষিকা এবং আরো আরো এরকম অনেকে নিজেদের বানানো ব্যস্ততা থেকে এখনো সরিয়ে রাখতে পারেন কিছুটা অনাবিল সময়। তাঁরা এলাকার গ্রন্থাগারে যান, পরিষেবায় নিজেরা স্বেচ্ছাশ্রম দেন কোনও নগদ ফেরতলাভের প্রত্যাশাকে মুলতুবি রেখেই। এখনও যেসব পাঠক আসেন সেখানে, তাঁদের এরাই বাতলে দেন নতুন বইয়ের ঠিকানা, কখনও বা উদ্যোগী হয়ে হাতে করে এনে দেন কোনও দুর্মূল্য বইয়ের কপি। সরকারের কর্মীদের তুলনায় বই বিষয়ে এঁদের ওপরেই বেপরোয়া পাঠকের ভরসা বেশি, এরাই কার্যত জ্বেলে রেখেছেন বই নামক মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ সম্পদের দীপ্যমান শিখাটিকে। বইপত্রের আড়াল থেকে অধিকাংশ দেখা যায় না এঁদের প্রচ্ছদ।
হায়, আমাদের গ্রন্থাগারের ইতিহাসে এরা আজও উপেক্ষিতই থেকে গেলেন !
ছবি সূত্র – দ্য আর্কিটেক্ট’স গাইড