ক্লাসে বইয়ের পাশে রঙের তুলি, বাঁশি থাকলে কেমন হত?

ছবি আঁকা, নাচ-গান, এসব স্কুলে দুয়োরানির মতো

ক্রিয়েটিভ রাইটিং এবং গল্প বলার আসর বসেছে। শিক্ষকও আমি, গল্পদিদাও আমি। আমাকে অবশ্য অনেক বাচ্চা ব্যাকরণ-ঠাকুমা বলেও ডাকে। সে যাই হোক। গল্পের আসরের কথায় আসি। আসরে উপস্থিতদের বয়স কারও ছয়, কারও আট। রেকর্ডে পাঁচ মিনিট হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার বাঁশি শোনানো হল তাদের। কেউ চোখ বন্ধ করে, কেউ চোখ খুলে মন দিয়ে শুনল। শুনে তাদের কার কী মনে হল এবার সে কথা বলার পালা। 

দু’এক জন বলল ভাল লেগেছে, কিন্তু তার বেশি কিছু তখন বলল না। ক্লাস সিক্সের একজন বলল, ‘মনে হচ্ছে, একটা ছেলে মাকে হারিয়ে ফেলেছে, মায়ের কাছে যাবে বলে বাঁশি বাজাচ্ছে’। বাঁশিতে করুণ সুর ছিল। তা ওর মধ্যে প্রিয়জনকে হারিয়ে যাওয়ার বেদনার জন্ম দিল। কিন্তু শুধু তো বেদনা নয়, বাঁশি যে ডাকও পাঠাল। বাঁশির ডাকের কত গান, কত কবিতা ও বড়ো হয়ে পড়বে। কিন্তু, এখনও তো ও সেসব পড়েনি। তবু, সুর শুনে জেনে গেল, সুর যেমন কথা বলে তেমনি সুর ডাক-ও দেয়। আমিও ওর থেকে শিখলাম সুরের আর এক মানে, নতুন অর্থ।

আরেকজন বলল, তার মনে হয়েছে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির সুর শুনেছে সে। প্রকৃতি-নির্ভর রাগ-রাগিনীর মধ্যে কত বড়ো সত্য লুকিয়ে আছে, কত বাস্তব তার ভিত্তি, নতুন করে জানলাম মনে হল, ওর কথা শুনে। প্রথম শ্রেণির এক শিশু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাঁশি শুনে তার মনে হয়েছে, সে একা একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আর ওর মন চলছে নীল আকাশের সঙ্গে ছুটে। বুঝলাম বাঁশির সুরে একাকিত্বের স্বাদ পেয়েছে ওই শিশু।

ছেলেবেলার একটি কবিতা প্রায়ই মনে আসা-যাওয়া করে। সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’। কবিতাটা এরকম- ‘আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাই রে,/ কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাই রে।/ পাহাড় শিখায় তাহার সমান– হই যেন ভাই মৌন-মহান,/ খোলা মাঠের উপদেশে/ দিল খোলা হই তাই রে’।  হ্যাঁ, আমরা শিখি চারিপাশের ছন্দ, চারধারের তাল, চারদিকের সুর আরও কত কিছু থেকে। এই সব কিছুই, মনের জলবায়ু, আকাশ, নদী, অরণ্যের সঙ্গে মিশে তৈরি হয় আমাদের ভালোলাগা, আমাদের নানান ইচ্ছে, স্বপ্ন।

কিন্তু শেখা, শেখানোর যে পদ্ধতির হাত ধরে আমরা বড় হয়েছি, সেখানে পড়ার সুর, গানের সুর, নাচের তাল, আঁকার রংকে আলাদা আলাদা করে, বিচ্ছিন্ন করে শেখানো হয়। শুধু তাই নয়, শিক্ষকজীবনেও ছাত্রীদের কাছে, এই যে নানা সুরে জগৎ বাঁধা, তা কতটা স্পষ্ট করতে পেরেছি জানি না। পড়াতে গিয়ে আমরা ক্লাসে লিখতে দিয়েছি, প্রশ্ন উত্তর করিয়েছি, সেখানে তো আসলে কিছুটা নিয়মই বেঁধে দিই। কিন্তু, ক্লাসে গান শোনাতে হবে, নাচের কিছু মুহূর্ত তুলে দেখাতে হবে, নাটকের মধ্যে দিয়ে পড়াতে হবে, তবে তো শিশুমনের দরজা জানলা আরও বড়ো হয়ে খুলবে। কিন্তু তেমন হয় কই!

আমরা তো সবাই ছবি আঁকি সেই ছোটোবেলা থেকেই। মাকে দেখলে শিশু ‘মা’ বলার চেষ্টা করে। অন্ধকারে মায়ের মতো কাউকে লাগলে তার হাত ধরে। নিজের খাওয়ার বাটি দেখলে বোঝে খেতে হবে। আরো কত কী! এর পর স্লেটে বা খাতায় গোল এঁকে, আঁকিবুকি করে মনের কথা বলার চেষ্টা করে। এই ভাবেই স্বাধীন শিশু জানতে থাকে বহুমুখী সূত্র থেকে। স্বাভাবিক এই যে জানার প্রক্রিয়া, সেটাকে কেন নিয়মমাফিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হবে না? ছবি আঁকা, নাচ-গান, এসব তো স্কুলে আছে! আছে, কিন্তু মূল পাঠের সঙ্গে তার দূরত্ব অনেক। ওগুলো আছে দুয়োরানির মতো। অথচ চারিপাশের ছন্দে তালে তাল মিলিয়েই তো আমরা চলি, তবে কেন বলব পড়া, গান, নাচ আঁকা সব আলাদা আলাদা, এক নয়? এক সাধারণ বাঁধনে কেন তাদের বাঁধা যাবে না!

Developed by DXDasia