‘পথের পাঁচালি’ থেকে ‘সুবর্ণরেখা’, রাজ্যের উদ্যোগে কালজয়ী বাংলা ছবির নেগেটিভ সংরক্ষণ

চলচ্চিত্র শতবর্ষ ভবনে চলছে হিমশীতল ঘরে বাংলা ছবির নেগেটিভ সংরক্ষণের কাজ

ত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক থেকে শুরু করে মৃণাল সেন, তপন সিনহা এমনকি বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, বাংলা চলচ্চিত্রের প্রায় পাঁচ দশকের ইতিহাস এক ছাদের নিচে। টালিগঞ্জ বাঙুর হাসপাতালের কাছে চলচ্চিত্র শতবর্ষ ভবনে (Chalachchitra Satabarsha Bhaban) শুরু হয়েছে কালজয়ী বাংলা ছবির নেগেটিভ সংরক্ষণের কাজ। জানা গিয়েছে, সেরার তালিকায় থাকা প্রায় সাড়ে আটশো ছবিকে আনা হতে চলেছে সংরক্ষণের আওতায়। ১৯৫০ থেকে ২০০০ সাল, এই ৫০ বছরের অন্তত ৫০ জন নামী পরিচালকের ছবির (Film) নেগেটিভ সংরক্ষণ করতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানা গিয়েছে, সরকার প্রযোজিত ৩৫টি, বেসরকারি প্রযোজনার ১২০টি ছবি ছাড়াও তথ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি রয়েছে ৪৮৩টি।

মুঠোফোনের দৌলতে সিনেমা দেখা এখন নাগালের মধ্যে। ডিজিটাল মাধ্যমে এখন সবকিছুই সংরক্ষণ করা খুব সহজ। কিন্তু এককালে ছবির নেগেটিভই ছিল একমাত্র ভরসা।আমাদের ছোটোবেলতেও ডিজিটাল ছবির চল ছিল না। ঘরে ঘরে ক্যামেরা ছিল না। পাড়ার মোড়ে কিংবা আরও খানিকটা দূরে নিদেনপক্ষে একটা অথবা দুটো স্টুডিও। সেখানেই কাঙ্ক্ষিত ছবিটি তুলে আসতে হতো। বেশ কিছু দিন পর ছবিটা হাতে পাওয়া যেত। সঙ্গে দেওয়া হতো ছবির নেগেটিভ। ছবিটিকে হারিয়ে ফেললে অথবা নষ্ট হয়ে গেলে ওই নেগেটিভখানাই ছিল শেষ ভরসা। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সেকালের সবকটি ছবিরই ছিল মূল্যবান সব নেগেটিভ। কেমন আছে সেকালের বিখ্যাত সব সিনেমার রিল অথবা নেগেটিভগুলো? আধুনিক প্রজন্মের কাছে সেই স্মৃতিকে ফিরিয়ে দিতে ইতিমধ্যেই অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের (Govt of Westbengal) তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ।

জলীয় বাষ্প থেকে মূলবান ছবির নেগেটিভ অথবা রিলগুলিকে বাঁচাতে তৎপর হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ যেন সত্যিকারের এক হিমঘর। কোথাও তাপমাত্রা ৮-১০ ডিগ্রি কোথাও আবার প্রায় হিমাঙ্ক ছুঁইছুঁই। জানা গিয়েছে, ‘পথের পাঁচালি’-র নেগেটিভটি রয়েছে প্রায় ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায়, ‘হীরক রাজার দেশে’-তে পৌঁছলে আবার তাপমাত্রা আরও খানিকটা নেমে হয়ে যায় ২-৩ ডিগ্রি। ‘গণদেবতা’-ও রয়েছে ওই একই তাপমাত্রায়।

পুরোনো ছবিগুলোকে যুগের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে চলেছে সরকার। তৈরি হচ্ছে বিশেষ ‘ডিজি লকার সিস্টেম’ যাতে ভবিষ্যতে এগুলোকে সহজে পাওয়া সম্ভব হয়। পরবর্তীতে এই সব সংরক্ষিত ছবি থেকে বেশ কিছু ছবি ‘ফিল্ম এপ্রিশিয়েশনস কোর্স’-এ দেখানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানা গিয়েছে, সরকার প্রযোজিত ৩৫টি, বেসরকারি প্রযোজনার ১২০টি ছবি ছাড়াও তথ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি রয়েছে ৪৮৩টি। একটি ছবিতে সাধারণত ১২ থেকে ১৩টা রিল থাকে। কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন, ‘সোনার কেল্লা’ ১৫ রিলের ছবি, আবার ‘হীরক রাজার দেশে’ ও ‘পথের পাঁচালি’ তৈরি হয়েছে ১৪টি রিল দিয়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজারটির মতো রিল রয়েছে সংরক্ষণাগারে।

সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) পরিচালিত ৩৪টি ছবির পাশাপাশি এখানে রয়েছে মৃণাল সেন-এর (Mrinal Sen) ‘আকালের সন্ধানে’ (১৯৮০), ‘আকাশ কুসুম’(১৯৬৫), ঋত্বিক ঘটক-এর (Ritwik Ghatak) ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬৫), ‘মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০), উৎপল দত্তের (Utpal Dutta) ‘ব্যারিকেড’ (১৯৮২), বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের (Buddhadev Dasgupta) ‘দূরত্ব’ (১৯৮১), তপন সিনহার (Tapan Sinha) ‘ঝিন্দের বন্দি’ (১৯৬১), সরোজ দের (Saroj Dey) ‘কোনি’-র (১৯৮৪) মতো কালজয়ী সমস্ত ছবি, এমনকি নাইট্রেট নেগেটিভে শ্যুট করা সুধীর মুখোপাধ্যায় (Sudhir Mukhopadhyay) পরিচালিত ‘পাশের বাড়ি’ (১৯৫২) ছবিটির রিলও সংরক্ষণ করা হয়েছে এখানে।

বর্তমানে চলচ্চিত্র ভবন অর্থাৎ রাধা স্টুডিও-তে নেগেটিভ পরিষ্কার, কোনও জায়গায় ছিঁড়ে গিয়ে থাকলে তা জোড়া দেওয়া, স্ক্যানিং, নেগেটিভের আঁচড় বা দাগ সাফ করার মতো ছবির প্রাক ডিজিটাইজেশনের কাজ করা হয়। প্রায় ১৫টি ধাপের এই প্রক্রিয়ার কিছুটা হয় হাতে, কিছুটা যন্ত্রে। তবে রিল ডিজিটাইজড করার চূড়ান্ত কাজ হয় পুণে ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অফ্ ইন্ডিয়া-এর তরফে। এখনও পর্যন্ত মোট ২২টি ছবি পাঠানো হয়েছে পুণেতে, এমনটাই জানানো হয়েছে রাজ্য সরকারের তরফে। এর মধ্যে কিছু কাজ শেষ করে ফিরে এসেছে, বাকিগুলির কাজ এখনও চলছে। আগামী প্রজন্মের কাছে সেকালের চলচ্চিত্র ভাবনা ও তার প্রক্রিয়া পৌঁছে দিতে রাজ্য সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। এমনকি চলচ্চিত্র-গবেষকদের কাজেও আসতে পারে নেগেটিভগুলি।

(বামদিকের ছবিতে সংরক্ষণের কাজ, ডানদিকের উপরে ও নিচে যথাক্রমে 'পথের পাঁচালি' ও 'সোনার কেল্লা'র নেগেটিভ)

সেকালে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির মগনলাল মেঘরাজ অথবা ‘সোনার কেল্লা’য় মুকুলের ‘দুষ্টুলোক’ এসব চরিত্ররাই ছিল ছোটোদের চোখে ভয়ের কারণ। আবার ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবির ‘ভূতের রাজা’ ছিল সব পেয়েছির দেশ। কখনও আবার ‘কোনি’ ছবির ‘ক্ষিতদা’র মতো চরিত্ররা হয়ে উঠেছিল জীবনের ‘আইডল’। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবির অসাধারণ সুরের জাদু কিংবা উৎপল দত্তের ‘ব্যারিকেড’-এর সোচ্চার বার্তা সব কিছুই তো জীবনের মন্ত্র। অসাধারণ কিছু কাহিনি, অনবদ্য সুর, চোখ ধাঁধানো অভিনয়, এসব কালের নিয়মে তলিয়ে গেলে আফসোস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকতো না।

তাই পুরোনো ছবিগুলোকে যুগের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে চলেছে সরকার। তৈরি হচ্ছে বিশেষ ‘ডিজি লকার সিস্টেম’ যাতে ভবিষ্যতে এগুলোকে সহজে পাওয়া সম্ভব হয়। পরবর্তীতে এই সব সংরক্ষিত ছবি থেকে বেশ কিছু ছবি ‘ফিল্ম এপ্রিশিয়েশনস কোর্স’-এ দেখানো হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পুরো বিষয়টা দেখাশোনা করছেন পরিচালক গৌতম ঘোষ। তাঁর তত্ত্বাবধানে স্থাপিত হতে চলেছে বাংলা ছবির সেকালের সঙ্গে একালের একটি যোগসূত্র। স্মৃতি বাঁচানোর যে লড়াইটা শুরু হয়েছে, তার হাত ধরেই হয়তো বাংলা চলচ্চিত্র জগতের স্বর্ণযুগের চাবিকাঠি খুঁজে পাবে আগামী প্রজন্ম।

*ভিতরের ছবিটি সংগৃহীত

Developed by DXDasia