
শম্ভু মিত্রের মতোই দাহকার্যের পর সবাই জানল শাঁওলি আর নেই
“বাঁচা মানে ছুঁতে পারা
বাঁচা মানে চোখ ভ’রে দেখা
প্রাণ ভ’রে শোনা
হৃৎপিণ্ডের শব্দটুকু শুধু
ও কি বেঁচে থাকা…?”
কবিতায় জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা এই মেয়েটি আজ নেই৷ শাঁওলি মিত্র। অভিনেত্রী। নাট্য নির্দেশক। গ্রুপ থিয়েটার সংগঠক। লেখিকা। সাংস্কৃতিক কর্মী৷ প্রতিবাদী। লড়াকু। আরও অনেক কিছুই। শাঁওলি আসলে বাঁচার মতোই বেঁচেছেন চিরকাল। সম্রাজ্ঞীর মতো ঠায় নিজের সাংস্কৃতিক সিংহাসনটি আঁকড়ে রেখেছিলেন। জীবন আর মরণের মাঝে যে বিস্তৃত সাঁকো, তাকে ছুঁয়ে দেখার বড়ো সাধ ছিল তাঁর। লিখেছেন একের পর এক লাইন,
“এমনটা তো হতেই পারে
মৃত্যু-হানা ঝনঝনালো
কালো আকাশ ছিঁড়ে-ফেড়ে
শরীর খালি অবশ-বিবশ
পথ অফুরান
শেষকৃত্য নয়”
জীবনের অন্তিম দিনেও খানিক আড়ালের মাধ্যমে সম্রাজ্ঞীর সেই মেজাজ যেন অক্ষত রেখেছিলেন শাঁওলি। শেষ ইচ্ছাপত্রে তিনি জানিয়েছিলেন, দাহকার্যের পর তাঁর মৃত্যুর খবর যেন জানানো হয় সবাইকে। বাবা শম্ভু মিত্র-এর মতোই মৃত্যু পরবর্তী নিয়মবিধি প্রকাশ করে গেলেন। ফুলের ভারে তাঁর দেহ তাই সেজে উঠল না। আরেক অভিনেত্রী এবং শাঁওলির ‘মানসকন্যা’ অর্পিতা ঘোষকে তাঁর শেষকৃত্যের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন ২০২০ সালে।
আমরা ভুলিনি ‘বঙ্গবালা’-কে। শাঁওলির মাতৃময়ী মুখচ্ছবি চলচ্চিত্রায়নের মাধ্যমে কাজে লাগিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ছবিতে। এই বঙ্গবালা যেন দেশমাতৃকার প্রতীক। ঋত্বিক ঘটক-এর ‘মা’ চিত্রকল্পের আরেক মা হয়ে উঠেছিলেন শম্ভু-কন্যা। বঙ্গবালার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে ঋত্বিকের কণ্ঠে তখন ‘কেন চেয়ে আছো গো উমা…’। ঋত্বিক ঘটকের হাত ধরে ভারত চিনেছিল এক জাত অভিনেত্রীকে। বঙ্গবালারা আদর্শ মায়ের মতোই হয়ে উঠতে পারেন আদর্শ কন্যা। ১৯৯৭ সালের কথা বলতে হয় এ প্রসঙ্গে।
বাংলা নবনাট্যের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ শম্ভু মিত্রের হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে এল। তৃপ্তি মিত্র চলে গেছেন বেশ কিছু বছর আগেই। অথচ মঞ্চের এই নায়কের চলে যাওয়ার কথা জানতে পারলেন না কেউই। কোনো ফুলের মালা, গান স্যালুট, স্মারক স্মৃতি — নাহ! কোনো সুযোগই দিলেন না শম্ভু মিত্র। একমাত্র মেয়ে শাঁওলিকে শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন, দিনের শেষে একজন সামান্য মানুষ তিনি। তাই শেষবেলাও যেন সেই সামান্য আয়োজনের মধ্যে দিয়ে হয়। কথামতো গভীর রাতে, সবার অলক্ষ্যে, সিরিটির শ্মশানে জ্বলে উঠলেন তিনি, শেষবারের মতো। শ্মশানের এক কর্মী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘ইনি কি সেই মঞ্চের শম্ভু মিত্র?’
শাঁওলি বাবার কথা রেখেছিলেন। নিজের মৃত্যুতেও কথা রাখলেন। নিজের দাহকার্যও হল সেই সিরিটিতেই। যেন পাশাপাশি শুয়ে দুটি নিথর শরীর। মেকআপ চলছে। এরপরেই মঞ্চে উঠতে হবে। চুল্লির তেজের মতো আলো জ্বলে উঠবে সারা মঞ্চে৷ চারদিক ফেটে পড়বে হাততালিতে। জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে দূরে বহু দূরে শুরু হবে সেই গান,
“মুখ লুকাও মা, ধুলিশয়নে— ভুলে থাকো যত হীন সন্তানে।শূন্য-পানে চেয়ে প্রহর গণি গণি
দেখো কাটে কিনা দীর্ঘ রজনী।দুঃখ জানায়ে কী হবে, জননী,
নির্মম চেতনাহীন পাষাণে
কেন চেয়ে আছো গো মা, মুখপানে…”
‘নাথবতী অনাথবৎ’ নাটকে শাঁওলি মিত্রের অসাধারণ অভিনয়
শম্ভু-শাঁওলি মুখোমুখি সেই দৃশ্যে। অমোঘ। চিরন্তন। ঠিক যেমন মানুষের জীবনে শ্মশান। শাশ্বত। বাবার থেকেই তো শেখা রাজনৈতিক বোধ। আর তাঁর থিয়েটার নিয়ে আলোচনা করলে অবশ্যম্ভাবী আলোচিত হবে এই গভীর রাজনীতি-পাঠ। উঠে আসবে ‘নাথবতী অনাথবৎ’, ‘একটি রাজনৈতিক হত্যা’, ‘কথা অমৃতসমান’ কিংবা ‘সীতার কথা’। লিঙ্গ রাজনীতি আর শ্রেণি বৈষম্যে একের পর এক তীর্যক প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছেন সমাজব্যবস্থাকে। ‘নাথবতী অনাথবৎ’ নাটক প্রসঙ্গে শাঁওলি মিত্র নিজেই বলেছেন,
“সময়টা আশি থেকে তিরাশি সাল। তখন মহিলাদের অবমাননাকর বেশ কিছু ঘটনা ঘটছিল। যেটা হয়তো দ্রৌপদীর অপমানের সঙ্গেই তুলনা করা যায়। সেই জন্যই হয়তো আমার মনে হয়েছিল দ্রৌপদীর চরিত্রটা নিয়েই আমি কাজ করব।”
যাত্রা ফুরোয়নি। ‘কথা অমৃতসমান’-এও তুলে এনেছেন দেশের বিপর্যয়ের কথা। এই নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয় ১৯৯০ সালের দিকে। তখনও বাবরি মসজিদের ঘটনা ঘটেনি। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরের পর যখন পুনরায় এই নাটকটি মঞ্চস্থ করা হল, তখন শাঁওলি দেখলেন পুরোনো সংলাপে নিজেকে প্রকাশ করতে পারছেন না। তাই আবার নাটকের পুনর্নির্মাণ হল। শুরুর অংশে যোগ হল বাবরি মসজিদের ইতিহাস।
২০১৯ সালেও পাঠ-নাটকের আকারে উপস্থাপন করলেন আরও এক মহাকাব্যিক নাট্যচরিত্র। নাটক ‘সীতা কথা’। যে উপস্থাপনা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল গোটা সমাজকে। দর্শক-শ্রোতাদেরও ঠেলে দিয়েছিল লজ্জাবোধের দিকে।
এমন এক সাংস্কৃতিক কর্মীর অকস্মাৎ মৃত্যু এক নিমেষে শোকের আবহাওয়া তৈরি করেছিল গতবছর। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে শোকবার্তায় লিখেছিলেন, “বাংলা নাট্য জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং প্রখ্যাত মঞ্চশিল্পীর প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাভিভূত বোধ করছি। শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্রের কন্যা শাঁওলি মিত্র বাংলার অভিনয় জগতে মহীরূহ ছিলেন। তিনি আমার বহুদিনের সহযোগী ছিলেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তিনি আমার সঙ্গে একসাথে ছিলেন। আমি রেলমন্ত্রী থাকার সময় তিনি আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন। পরে আমরা দায়িত্বে এলে কিছুদিন পর তিনি বাংলা আকাদেমির সভাপতি হন এবং দায়িত্বের সঙ্গে মূল্যবান কাজ করেন।… শাঁওলিদির ইচ্ছাক্রমে তাঁর প্রয়াণের খবর আমায় শেষকৃত্যের পর দেওয়া হয়। আমি কিন্তু কাছের মানুষ হিসেবে তাঁকে মনে ধরে রাখলাম। আমাদের বহুদিনের সহকর্মী এবং সুহৃদ হিসেবে তিনি আমাদের মনের মণিকোঠায় থেকে যাবেন। আমি শাঁওলিদির পরিবার-পরিজন এবং অগণিত গুণগ্রাহীকে আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।”
‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ছবিতে দেশ মুগ্ধ হয়েছিল শাঁওলি মিত্রের অভিনয়ে
নান্দীকার থিয়েটার দল অভিনেত্রীর মৃত্যু প্রসঙ্গে বলেছিল, “নাট্যজগৎ আবারও মাতৃহারা।” অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছেন, “অনেক আদর পেয়েছি। অনেক ভালোবাসা। অনেককিছু শিখেছি। মঞ্চাভিনয়ের খুঁটিনাটি।… আমার নাটক দেখে ফোন করে খুব প্রশংসা করেছিলেন। আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলাম। বড়ো হয়ে একসঙ্গে একটা কাজ করার আর্জি নিয়েও গিয়েছিলাম। সিনেমায়। করেননি।” অভিনেতা বিপ্লব দাশগুপ্ত বর্ষীয়ান অভিনেত্রীর মৃত্যু সংবাদে লিখেছেন, “প্রথম যখন বহুরূপীতে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় আমায় পাঠান, তখন থেকেই শাঁওলি মিত্রের সঙ্গে আমার পরিচয়। বাবার মতোই দাহ করার পর সবাই জানল তিনি আর নেই। ওঁর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।” অভিনেত্রী-সঞ্চালিকা চৈতালি দাশগুপ্ত বলেন, “অসময়ে চলে যাওয়া আমার বন্ধু শাঁওলিকে মনে পড়ে”। অভিনেত্রী চৈতি ঘোষাল ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “ছোটোবেলা শেষ হয়ে গেল।”
অভিনয় সুবাদে শাঁওলি মিত্র ২০০৯-এ পদ্মশ্রী সম্মানে সম্মানিত হন। এছাড়াও সংগীত-নাটক অকাদেমি (২০০৩) এবং বঙ্গ-বিভূষণ (২০১২)-এ ভূষিত করা হয় তাঁকে। ২০১১ সালে রবীন্দ্র সার্ধ্বশত জন্মবর্ষ উদযাপন কমিটির চেয়ারপার্সন ছিলেন তিনি।
জীবন ফুরোয়। কিন্তু কাজ ফুরোয় না। মঞ্চের সেই দৃপ্ত কণ্ঠে আজীবন শাঁওলি হয়ে থাকবেন কখনও দ্রৌপদী, কখনও সীতা, কখনও বঙ্গবালা। এ দেশে বঙ্গবালারা যুগে যুগে ফিরে আসবেন। কারণ বঙ্গবালা জানেন মিলনের মন্ত্র। কোনো বিচ্ছেদের সুর তাঁর জীবনে নেই।
