
সৈয়দা নিগার বানু-র প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি ‘নোনা পানি’
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২৯তম সংস্করণের NETPAC (Asian Select) বিভাগে রয়েছে এশিয়া মহাদেশের ছয়টি ছবি। তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক সৈয়দা নিগার বানু (Syeda Neegar Banu) নির্মিত ‘নোনা পানি’ (Nona Pani – Barren Waters)। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ খুলনার মানুষের জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে নোনা পানি। এই ছবির গল্পের মূলে আসলে খুলনা অঞ্চলের কিছু মানুষ, যারা প্রত্যেকে একা। ঘূর্ণিঝড় আয়লার পর বাংলাদেশে বড়োসড়ো জলবায়ু পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষদের জীবনেও, পেশার পরিবর্তন, মানসিক ট্রমা সবই তাদের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবিটি সম্পূর্ণ চিত্রায়িত হয়েছে খুলনার বিভিন্ন গ্রামে। নির্মাণপ্রক্রিয়ায় যুক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই খুলনার স্থানীয়। খুলনার সুন্দরবনের কাছে ভদ্রা নদীর পাড়ে বটখালি গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করে রোম্বা, দশপাই ও কৃষ্ণার মতো তিনটি চরিত্র। প্রতিটি চরিত্র সাধারণ, এতটাই সাধারণ যে বলার মতো কোনো গল্পও নেই তাদের। রোম্বা, দশপাই ও কৃষ্ণারা তাদের নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব, জেদ আর টিকে থাকার লড়াইয়ের সূত্রে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তারা সবাই চায় গ্রামে থিতু হতে, চায় আত্মপরিচয়। এই আকাঙ্ক্ষাকে মর্যাদা দিতে গিয়ে তারা কখনও কখনও আবার শিকড়ে ফিরে যেতে চায়, ঘুরে দাঁড়াতে চায়। চায় অসহায়ত্বের ঘেরাটোপ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে।

নোনা পানি ছবির প্রিমিয়ার হল ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩-এ খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে, যা বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে ইতিহাস হয়ে থাকল। কারণ রাজধানী শহর ঢাকার বাইরে সেই প্রথম কোনো ছবির প্রিমিয়ার হয়েছিল।
ফোন মারফৎ যোগাযোগ করা হয় নোনা পানি-র পরিচালক সৈয়দা নিগার বানু-র সঙ্গে। ছবি নির্মাণের প্রসঙ্গে বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানান, “২০১২ সালের শেষ দিকে নোনা পানি-র গল্পটা মাথায় আসে। ২০০৩ সালে আমার দুটো গল্প প্রকাশিত হয় একটি লিটল ম্যাগাজিনে। গল্প দুটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নোনা পানি-তে ব্যবহৃত তিনটি চরিত্রের মধ্যে দুটি। ২০১৩ সালে চিত্রনাট্য লেখার কাজ শেষ হয়। তখন বেঙ্গল ক্রিয়েশনস লিমিটেড থেকে চিত্রনাট্য জমা দেবার জন্য একটি বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। সেখানে ১২৫টি চিত্রনাট্য জমা পড়ে। চূড়ান্ত ৫টি চিত্রনাট্যের মধ্যে নোনা পানি নির্বাচিত হয়। করোনাকালীন পরিস্থিতিতে প্রযোজনা সংস্থা আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়ে। তাই পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তার বেশ কিছু বছর পর ছবির কাজ শেষ করে প্রযোজনা সংস্থা।”
দীর্ঘ দশ বছরের পরিশ্রম কি তবে বৃথা হয়ে যাবে! এমতাবস্থায় প্রযোজনা সংস্থাকে পরামর্শ দেন সৈয়দা। বলেন, যেহেতু ছবিটি প্রধানত খুলনা অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে, তাই খুলনায় এই ছবিটির কথা প্রচার করা হোক। খুলনার সিনেমাহলে প্রদর্শিত হলে প্রযোজকের টাকা উঠে আসতে পারে। সেইমতো নোনা পানি ছবির প্রিমিয়ার হল ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩-এ খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে, যা বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে ইতিহাস হয়ে থাকল। কারণ রাজধানী শহর ঢাকার বাইরে সেই প্রথম কোনো ছবির প্রিমিয়ার হয়েছিল।
দুই বাংলায় এখনও সিনেমামাধ্যমে পরিচালনার ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। সৈয়দার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। যদিও তাঁর শৈশব ছিল টেলিভিশন আর সিনেমা দিয়ে ভরা। নিজের চেষ্টায় লন্ডনে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্যারালাল সিনে মুভমেন্ট (পিসিএম) নামের একটি সংস্থাকে মৃতাবস্থা থেকে উদ্ধার করে রি-ফর্ম করেন খুলনায়। এই মুহূর্তে তিনটি বিষয় নিয়ে পিসিএম কাজ করছে – প্রশিক্ষণ, নির্মাণ ও প্রদর্শন। তিনি চলচ্চিত্রে গণ আন্দোলনে বিশ্বাস করেন। বলেন, “নিজেদের গল্প নিজেদেরই বলতে হয়, নইলে তা অতিরঞ্জিত বা অভিব্যক্তিহীন হয়ে যায়। চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্প মাধ্যম যা কঠিনভাবে অর্থ সম্পৃক্ত এবং মুনাফা কেন্দ্রিক। শুধুমাত্র মুনাফা উৎপাদনের হাতিয়ার থেকে চলচ্চিত্রকে মুক্ত করাই হল প্রতিষ্ঠান বিরোধী মতবাদকে গ্রহণ করা।”

দুই বাংলায় এখনও সিনেমামাধ্যমে পরিচালনার ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজ। সৈয়দার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটেনি। নিজের চেষ্টায় লন্ডনে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্যারালাল সিনে মুভমেন্ট (পিসিএম) নামের একটি সংস্থাকে মৃতাবস্থা থেকে উদ্ধার করে রি-ফর্ম করেন খুলনায়।
ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্ট লন্ডন থেকে ভিডিও প্রোডাকশন ও ফিল্ম স্টাডিজে মাস্টার্স করেন সৈয়দা নিগার বানু। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে কুড়িটিরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। ২ ঘণ্টা ৫ মিনিট দৈর্ঘ্যের নোনা পানি ছবিটিতে মূলত বাংলাদেশের থিয়েটারকর্মীরাই অভিনয় করেছেন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিলকিস বানু, কাজি রাকিবুল হক রিপন, জয়িতা মহলানবিশ প্রমুখ। পরিচালক জানান, “আমি তথাকথিত একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে, কোনো টানটান উত্তেজনাপূর্ণ গল্প দর্শককে বলতে চাইনি। আমি আসলে কোনো গল্পই বলতে চাই না। কারণ, গল্পের মতো মানুষের জীবন নয়, বরং মানুষের জীবন গল্পের চেয়েও বড়ো।”

এই ছবিতে দেখা যায় চল্লিশ বছরের দশপাই নামের একটি চরিত্র। তিনি পুরুষ না নারী এই ধন্ধ গ্রামের মানুষের মধ্যে থেকে আজও দূর হয়নি। লৈঙ্গিক পরিচিতি তাঁকে যেন প্রান্তিক থেকে আরও প্রান্তিকতায় ঠেলে দেয়। পরিচালক এ প্রসঙ্গে জানান, “একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের যোগসূত্রতা যেভাবে তৈরি হয় সেখানে পারিবার, সামাজ ও রাষ্ট্র বড়ো ভূমিকা রাখে। কিন্তু আমরা এই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের কখনোই মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিই না। ফলে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্কের বাতাবরণে আমাদের কল্পনা ঠাঁই করে নেয়, বাস্তবতা নেই তাতে। এই সিনেমাতে দশপাইয়ের মতো মানুষদের আলাদা দৃষ্টিতে দেখিনি বা আলগা মনোযোগ আকর্ষণের জালে আবদ্ধ করিনি। বরং খুব নির্মোহভাবে সমাজের প্রেক্ষাপটে তাঁকে ছেড়ে দিয়েছি, দেখতে চেয়েছি এরকম একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষেরা কীরকম ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় লিপ্ত হয়?”

নোনা পানির চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন নেহাল কুরেসি, সম্পাদনায় ইকবাল কবীর জুয়েল, সঙ্গে রয়েছে শাবাব আলি আরজুর যোগ্য সংগীত পরিচালনা। এটি সৈয়দা নিগার বানু পরিচালিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র। নোনা পানি ছাড়াও ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান সিলেক্ট নেটপ্যাক অ্যাওয়ার্ডে প্রদর্শিত হবে কিরগিজস্তানের ছবি ‘গড্স গিফট’, মায়ানমারের ছবি ‘ব্রোকেন ড্রিমস স্টোরিজ ফ্রম দ্য মায়ানমার কপ’, ফিলিপিন্সের ছবি ‘ওয়াকার’, ভারতের ছবি ‘নন্দ স্কুল অফ ট্রাডিশন’, নেপাল ও দক্ষিণ কোরিয়ার ছবি ‘নো উইন্টার হলিডে’।
_____
ছবি সৌজন্যে: সৈয়দা নিগার বানু
