
ফরাক্কার আদিবাসী গ্রামে প্রকৃতিপাঠ দিচ্ছে অংশুমান ঠাকুরদের সংস্থা
“আমার ঘরের আশেপাশে যে-সব আমার বোবা-বন্ধু আলোর প্রেমে মত্ত হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে, তাদের ডাক আমার মনের মধ্যে পৌঁছল। তাদের ভাষা হচ্ছে জীবজগতের আদিভাষা, তার ইশারা গিয়ে পৌঁছায় প্রাণের প্রথমতম স্তরে…” – বনবাণী/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মানুষের আদি বন্ধু গাছ। ফুল, ফল, ছায়ায় রিদ্ধ মানবসভ্যতা। আজকের যান্ত্রিক যুগের আধিপত্যে যখন মানুষ প্রকৃতি থেকে দূরে সরছে দ্রুত, তখন যেন না-ছুঁতে পারা গাছেদের, শহরের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির ডাক আরও বেশি করে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই ব্যক্তিগত বা সামাজিক স্তরে প্রকৃতিপাঠ দিচ্ছেন, পালনও করছেন। কিন্তু প্রকৃতির হাত ধরেই যদি জীবনযুদ্ধে নামে মানুষ? যদি প্রকৃতির কাছ থেকেই নেয় জীবনের পাঠ? গাছেদের না-বলা কথা বলে যায় নিজেদের যাপনে? তবে জীবনের শিকড় ছড়িয়ে পড়ে গভীরে। তেমনই যাপনে অভ্যস্ত একদল শিশু। যাদের দিনের শুরু থেকে শেষের প্রতিটি অভ্যাসে জড়িয়ে থাকে ‘আলো-গহিন’ গাছ। সৌজন্যে গাছ গ্রিন হ্যান্ডস সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট (Gach Green Hands Social Welfare Trust)। অংশুমান ঠাকুর এবং তাঁর দল এই কর্মকাণ্ডের উদ্যোক্তা। মুর্শিদাবাদ জেলার ফরাক্কার অন্তর্গত শামলাপুর নামের একটি আদিবাসী গ্রাম। বাংলার আদিবাসী গ্রাম-এর শিশুদের তাঁরা জড়িয়ে নিয়েছেন গাছে, নিজেরাও জড়িয়ে পড়েছেন, নিজেদের শিকড় উদযাপন করছেন। সেই উদযাপনে যেমন আছে অনির্বাণ গাছের ইস্কুল, তেমনই আছে পোড়ামাটি, কাঁচামাটি আর বিভিন্ন গাছের বীজের রাখি তৈরি করা ও অন্যান্য উদ্যোগ।

রাখি তৈরির জন্য মাটি সংগ্রহ
গত তিনবছর ধরে তাঁরা এই মাটির রাখি তৈরির কাজ করছেন। প্রথমে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এই এলাকাটি যেহেতু ঝাড়খণ্ড লাগোয়া, তাই এখানে বিভিন্ন রঙের রুক্ষ মাটি পাওয়া যায়।
বঙ্গদর্শন.কম-কে সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা অংশুমান ঠাকুর জানান, “খোলা আকাশের নিচে আমাদের একটা স্কুল আছে। অনির্বাণ গাছের ইস্কুল। সেখানে প্রকৃতির মধ্যেই চলে পড়াশোনা। প্রায় ৮০ জন আদিবাসী শিশু এখানে বিনামূল্যে পড়াশোনা করে।” তাঁদের কাজ মূলত পরিবেশ নিয়ে। পরিবেশ সংরক্ষণ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, সেসব নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা, বৃক্ষরোপণ, আদিবাসী মহিলাদের নিয়ে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ে তোলা, ওপেন এয়ার স্কুল ইত্যাদি। তিনি জানান, “ছোটোবেলা থেকে শিশুদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য আমরা এই খোলা আকাশের নিচে স্কুল শুরু করেছিলাম। এখানে এলাকার আদিবাসী যুবকেরা পড়ান, বাইরে থেকেও তিনজন শিক্ষক আসেন।”
তাঁরা দু-একবছর ধরে পোড়ামাটি আর কাঁচামাটির রাখি তৈরি করা শুরু করেছেন। সেই প্রসঙ্গে অংশুমান বলেন, “আমরা ২০১৯ সালের ৫ জুন থেকে ৫০টি গাছ লাগানোর মাধ্যমে আমাদের সংস্থার কাজ শুরু করেছিলাম। এরপর স্থানীয় মানুষদের বিভিন্ন ফলগাছের চারা বিলি করেছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য সব মানুষকে প্রকৃতির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা, নিজেদের উদ্যোগে তাঁদের সামিল করা। সেই উদ্দেশ্যেই এরপর শুরু করলাম মাটি আর গাছের বীজের রাখি বানানো।”

কচিকাঁচারা রাখি তৈরিতে ব্যস্ত

ছাঁচের পর
গত তিনবছর ধরে তাঁরা এই মাটির রাখি তৈরির কাজ করছেন। প্রথমে মাটি সংগ্রহ করা হয়। এই এলাকাটি যেহেতু ঝাড়খণ্ড লাগোয়া, তাই এখানে বিভিন্ন রঙের রুক্ষ মাটি পাওয়া যায়। কোনও মাটির রং লাল, কোনও মাটি কালো, কোথাও আবার সাদা বা হলদেটে। সেই মাটি আর পাথর গুঁড়ো করে রং তৈরি করা হয়। তা দিয়েই রঙের প্রলেপ দেওয়া হয় রাখিগুলোতে।
এ তো গেল রং করার কথা। রাখিগুলি কিন্তু তৈরিও হয় মাটি দিয়েই। তার জন্য ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ ধরনের মাটি। অংশুমান বলেন, “এই মাটি একটু সাদাটে। বর্ষাকালে এই মাটি, পলিমাটির মতন, এক জায়গায় এসে জমে। মাটিতে কাঁকরের পরিমাণ থাকে খুব কম।” এই মাটিকে সংগ্রহ করার পর ভালো করে চেলে নেওয়া হয়। এরপর জোগাড় করা হয় ধানের তুঁষ। সেগুলিকেও চেলে নেওয়া হয়। এরপর সেই মাটি আর তুঁষ মিশিয়ে রাখির গড়ন তৈরি করা হয়। আগের বছরগুলিতে তাঁরা হাত দিয়েই রাখি তৈরি করতেন। এবছর সেই জায়গায় ছাঁচের ব্যবহার করেছেন। তাতে অনেক সহজে আর কম সময়ে রাখিগুলি তৈরি করা গিয়েছে। এরপর রাখিগুলিকে ঘরে রেখে শুকানো হয়। রাখির সুতো তাঁরা বাজার থেকে সংগ্রহ করেন, কারণ তাঁদের কাছে এই মূহূর্তে সুতো তৈরি করার পরিকাঠামো নেই। তবে কোনও সিন্থেটিক সুতো নয়, শুদ্ধ সুতি ব্যবহার করা হয়।

পোড়ামাটির রাখি
রাখিগুলির উপর আটকে দেওয়া হয় বিভিন্ন গাছের বীজ। অংশুমান ঠাকুর জানান, “রাখি মানুষ একদিন পড়েন। তারপর খুলে রাখেন বা ফেলে দেন। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল যাতে সেই ফেলে দেওয়া রাখিগুলি থেকে একটা নতুন গাছ জন্মানোর সম্ভাবনা থাকে। বাজারে যে রাখি পাওয়া যায়, সেগুলি পরিবেশবান্ধব নয় একেবারেই। আমাদের রাখিগুলি যেন পরিবেশের কোনও ক্ষতি না করে, সেই দিকটাও ভেবেছি।” অনেকেই রাখি নিজের কাছে সংগ্রহ করে রাখেন। তাই এবছর অংশুমান-রা কাঁচামাটির রাখির সঙ্গে সঙ্গে পোড়ামাটির রাখিও তৈরি করেছেন, যা অনেকদিন টিকবে। এক্ষেত্রেও রাখি তৈরির পদ্ধতিটি এক। শুধু রাখিটি তৈরি করার পর, রং করার আগে, পুড়িয়ে নেওয়া হয়। পোড়ানোর কাজ করেন এলাকার অভিজ্ঞ মৃৎশিল্পীরা। মাটি সংগ্রহের কাজ করে স্কুলের শিশুরা, আর রাখিগুলি তৈরি করেন আদিবাসী মহিলারা। “আমি শান্তিনিকেতনে থাকার সময় বিশিষ্ট আলপনা শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের কাজ খুব কাছ থেকে দেখেছি, তাঁর থেকে শিখেছি। সেই শিক্ষাই প্রয়োগ করি রাখিগুলির উপর। এরপর রাখিতে বিভিন্ন গাছের বীজ আটকানো হয়। আগের বছর লাগানো হয়েছিল ধানের বীজ। এবছর কাঁচামাটির রাখির উপর আটকানো হয়েছে অমলতাস গাছের বীজ, আর পোড়ামাটির রাখি (Terracota Rakhi)-র উপর শশাবীজ।”
জানা গিয়েছে, প্রথম যখন এই কাজ শুরু করে এই সংস্থা, তখন অনেকেই নাকি সন্দেহ করেছিলেন। আদিবাসী মহিলারা আর স্কুলের শিশুরাও সংকোচ জানিয়েছিল যে, এইসব রাখি আদৌ বিক্রি হবে কি না! কিন্তু তাঁরা মানুষের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছেন। যাঁরা এই রাখি বানানোর সঙ্গে যুক্ত, তাঁরাও উৎসাহ পাচ্ছেন এখন। আজকাল সাধারণত ভাই-বোনের মধ্যেই রাখিবন্ধন দিবস-এর উদযাপন সীমিত হয়ে পড়েছে। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উৎসবের সূচনা করেন, সেই উৎসবের উদ্দেশ্য ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের সঙ্গে আত্মিক যোগাযোগ স্থাপন করা। গাছের ইস্কুলের এই উদ্যোগ শুধু মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগই নয়, বার্তা দিচ্ছে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যোগসূত্রকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ারও।
