
গল্প-কথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শিলাইদহের কুঠিবাড়ির লাগোয়া বাগানটি ছিল বেশ। বিচিত্ররকম ফুলের সমাহার। কম্পাউন্ডের মাঠটার মূল আকর্ষণ ছিল হরেকরকম রঙের গোলাপ গাছ। একবার সপ্তমী পুজোর দিন ব্রাহ্মমুহূর্তে এলাকার সব কচিকাঁচার দল চুপিচুপি রওনা হল কুঠিবাড়ির বাগানের দিকে। খোলা গেটের কাছে সেই বাহিনী প্রায় পৌঁছে গিয়েছে অমনি দেখা গেল বাগানের মালী নয়, আমলা নয়, পেয়াদা নয়, কুঠিবাড়ির সুপারিন্টেন্ডেন্ট নয়— স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) দাঁড়িয়ে। পিছনে বাগানের মালী। সে তো ফুলচোরদের দেখে রেগে আগুন! কিন্তু রবি ঠাকুরের মুখে হাসি, বললেন, “কী হে, পুজোর ফুল তুলতে এতদূর এসেছে? গ্রামের মধ্যে কি ফুল নেই?” সুপারিন্টেডেন্ট অনঙ্গবাবু ছোটোদের জবা, স্থলপদ্ম, রঙ্গন তুলে নিয়ে যেতে বললেন। কিন্তু বাচ্চাদের মধ্যে কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। রবীন্দ্রনাথ জোরে হেসে উঠলেন। বললেন, “ওহে ওদের গোলাপফুলের লোভ, সে লোভ কি স্থলপদ্ম মেটাতে পারে? তোমারা গোলাপফুল চাও তো? বেশ ত— তোমরা বাগান থেকে তুলে নাও গে, কিন্তু দেখো যেন গাছটাছ ভেঙো না।” বাচ্চাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিঘির ধার দিয়ে চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। যেন তপোবনের ঋষি অথবা দেবদূত।
রবীন্দ্রনাথ নিজেও রঙ্গরসিকতা করতেন আর কাছের লোকজনও তাঁর সঙ্গে রসিকতা করতে পারত। মংপুতে থাকার সময় প্রবাসী পত্রিকায় ‘মধু’ নিয়ে একটা কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পরে এক বোতল মধু পার্সেল হয়ে এল মংপুতে। কোনো এক অচেনা ভক্ত পাঠিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকে (Maitreyee Devi) সেটা দেখিয়ে বললেন, “দেখেছো তো, মধুর বিষয়ে কবিতা লেখার পর মধু আসছে।” সুধাকান্ত রায়চৌধুরী আর ডাক্তার সেন মন্তব্য করলেন, “মধুর কবিতা লিখে যদি মধু আসে, তাহলে মধুর বদলে বধূর কবিতা লিখতে পারতেন—।” রবি ঠাকুর বললেন, “সাধু—। এতো উত্তম প্রস্তাব।”
সুপারিন্টেডেন্ট অনঙ্গবাবু ছোটোদের জবা, স্থলপদ্ম, রঙ্গন তুলে নিয়ে যেতে বললেন। কিন্তু বাচ্চাদের মধ্যে কোনো উদ্যোগ দেখা গেল না। রবীন্দ্রনাথ জোরে হেসে উঠলেন। বললেন, “ওহে ওদের গোলাপফুলের লোভ, সে লোভ কি স্থলপদ্ম মেটাতে পারে?
প্রমথনাথ বিশী (Pramathanath Bishi) ছিলেন খুব ভোজনরসিক। একবার শান্তিনিকেতনের (Shantiniketan) আড্ডায় এসেছেন প্রমথবাবু। এমন সময় ভৃত্য সাধুচরণ কাচের গ্লাসে একটা সোনালি রঙের পানীয় দিয়ে গেল কবির হাতে। সোনালি পানীয় দেখেই প্রমথবাবুর খেতে ইচ্ছে হল। চঞ্চল হয়ে উঠলেন। তা লক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ বললেন, “খাবে নাকি?” প্রমথনাথ সঙ্গে সঙ্গে রাজি। সাধুচরণ রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে আরেক গ্লাস পানীয় এনে দিয়েছে তাঁকে। গ্লাস মুখে ঠেকিয়েই প্রমথবাবুর মুখের অভিব্যক্তি গেল বদলে। রবীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করছেন, “কেমন লাগল?” প্রমথবাবু বললেন, “চমৎকার।” রবীন্দ্রনাথ তখন হাসতে শুরু করেছেন। অন্যদের বলছেন, অকারণ চঞ্চল হবার কোনো কারণ নেই। ওটা নিমপাতা সিদ্ধ ছিল। ভৃত্যদের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ঝগড়ু ছিল রবীন্দ্রনাথের খাস চাকর। রামছাগল পুষত। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে গেলেই ঝগড়ু এবং তার রামছাগল দেখা দিয়ে যেত। ঠাকুর বংশের অনেক ইতিহাস জানত ঝগড়ু। মাঝে মাঝেই বলত, “রবিবাবুমশাই জীবনে এত শোকতাপ পেয়েছেন যে, সেরকম কোনো বাবুই পাননি। আর বাবু, আমি তাঁকে কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। আর দেখুন— এই বুড়োবয়সে একটু আরাম করবেন— তা না, ‘বিশ্বভারতী’ না কি যেন ওর নাম— তার জন্যে একেবারে পাগল হয়ে ক্ষেপে গেছেন। সারা পিত্থিমী দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। এতও সহ্য হয়? সব ছিষ্টিছাড়া কাণ্ড! এমন আর দেখিনি কোথাও।” রবীন্দ্রনাথের লেখা ছড়াতেও এসেছে ঝগড়ুর প্রসঙ্গ— “এক যে ছিল বাঘ/ তার গায়ে কালো দাগ,/ তাই বেজায় হলো রাগ/ ঝগড়ুকে তাই বল্লে হেঁকে—/ যা এখুনি প্রাগ।”
জোড়াসাঁকো (Jorasanko) থেকে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকা প্রকাশিত হত। সাহিত্য সভাও বসত। এই সভায় সাহিত্যিকদের জুতো ওলোটপালোট হয়ে যেত। কখনও জুতো চুরিও হত। একদিন সভায় এসেছেন শরৎচন্দ্র। জুতো চুরি হবার ভয়ে খবরের কাগজে জুতো মুড়ে নিয়ে ঢুকলেন। খবরটা রবীন্দ্রনাথের কানে গেল এবং রবীন্দ্রনাথ বললেন, “ওহে শরৎ, তোমার বগলে ওটা কীসের পুঁথি?” শরৎচন্দ্র তো অপ্রস্তুত। রবীন্দ্রনাথ কিছুক্ষণের নীরবতার পর বললেন, “বুঝতে পেরেছি, এটা হচ্ছে কলিযুগের পাদুকাচরণ।” সকলের সঙ্গে মজা করে কথা বলতেন রবীন্দ্রনাথ। একদিন ঘুমিয়ে আছেন, চাঁদের আলো এসে পড়েছে মুখে। ঘুম ভেঙে ভৃত্য মহাদেবকে বললেন, “ওরে চাঁদটাকে ঢেকে দে তো, ঘুম হচ্ছে না।” ভৃত্য তো ভেবে চলেছে, চাঁদ কীভাবে ঢাকবে। তখন রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন, “জানালা বন্ধ কর। কী হল? এবার চাঁদ ঢাকা পড়ল?”
ভৃত্যদের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ঝগড়ু ছিল রবীন্দ্রনাথের খাস চাকর। রামছাগল পুষত। রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে গেলেই ঝগড়ু এবং তার রামছাগল দেখা দিয়ে যেত। ঠাকুর বংশের অনেক ইতিহাস জানত ঝগড়ু।
একবার ‘বিসর্জন’ (Bisarjan) নাটকের মহড়া চলছে। কবি জয়সিংহের ভূমিকায় অভিনয় করছেন। তাঁর নাতি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর রঘুপতির ভূমিকায়। দিনেন্দ্রনাথের ছিল লম্বা চওড়া সুঠাম গড়ন। নাটকের শেষে জয়সিংহের মৃত্যু হবে এবং শোকসন্তপ্ত রঘুপতি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। মহড়া চলাকালীন দিনেন্দ্রনাথ অভিনয় সূত্রে ঝাঁপিয়ে পড়লেন রবীন্দ্রনাথের ওপর। রবি ঠাকুর চেঁচিয়ে উঠলেন, “ওরে দিনু, ভুলে যাসনি আমি কিন্তু সত্যি মরিনি, বেঁচে আছি।”
রবীন্দ্রনাথের সত্যি মৃত্যু নেই। তাঁর বিপুল রচনা সম্ভার এবং বিস্তৃত জীবন তাঁকে অমর করেছে। শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে?
সহায়ক গ্রন্থঃ
রসিক রবীন্দ্রনাথ, শ্রীশচীন্দ্র অধিকারী
রসিক রবীন্দ্রনাথ, পুলক চট্টোপাধ্যায়
