বহু আঘাত পেয়েছেন, তবু সকলকে আনন্দে ভরিয়ে রাখতেন রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের জীবনে ঘটা নানান অজানা কাহিনি

কোনো কোনো সময় তত্ত্বের জটিল সড়কপথ ধরে অক্ষরের ঘোড়া ছোটাতে ইচ্ছে করে না। তার চেয়ে বেশ লাগে সহজ সরল শান্ত গলিপথে শব্দের আড্ডা বসাতে। গল্পে, আড্ডায় রবীন্দ্রনাথের অন্যরকম একটা স্কেচ তৈরি করতে। টুকরো টুকরো ঘটনাও মানুষের জীবন! মুহূর্তের মণিমাণিক্যও জীবনের অমূল্য সম্পদ। রবীন্দ্রনাথের নানান ঘটনার অন্তরালে রয়ে যায় এক আশ্চর্য চলমানতা, যাকে আমরা জীবনের গতি বলতে পারি। তাঁর নিজের কথাতেই বলা যায়, ‘চলো, চলো, চলো। ঝরনার মতো চলো, সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো চলো, প্রভাতের পাখির মতো চলো, অরুণোদয়ের আলোর মতো চলো’।

বৃদ্ধবয়সেও প্রবল উদ্যমে লিখে যেতেন রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore)। অফুরন্ত তাঁর প্রাণশক্তি। ‘প্রান্তিক’ (Prantik) কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর দিলীপকুমার রায় রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছিলেন, লেখায় এত প্রাণপ্রাচুর্য আসে কোথা থেকে! রবীন্দ্রনাথ তখন মজা করে বলেছিলেন যে, তিনি ক্লান্ত, এই কথাটা আমজনতাকে বোঝাতে না পারলে মুশকিল। কারণ সকলে তাঁকে নামকরণের রাজা বলে জানে। ইনস্টিটিউশনের নাম থেকে পাত্রপাত্রীর বিয়ের চিঠি — সব বিষয়ে কবিতা লিখতেই ডাক পড়ে তাঁর। সে বড়ো বিড়ম্বনা। এই বলে তিনি দিলীপবাবুকেই বললেন, ‘কিন্তু তুমি যখন বিয়ে করবে কবিতা টবিতা লিখে দেওয়ার জন্য আবার আমার কাছে ধন্না দিও না।’ তারপর মজা করে ঘোষণা করলেন, জীবনে ভালো থাকার জন্য দুটি জিনিস মেনে চলতে হবে। এক নম্বর স্কুল কলেজের ছায়া মাড়ানো চলবে না, আর দ্বিতীয়টি হল বিয়ে করা যাবে না কোনোমতেই। চারিদিকে হাসির হিল্লোল উঠেছিল। একবার রবীন্দ্রনাথ এবং ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রী গ্রামে বেড়াতে গিয়েছিলেন। গ্রামবাসীদের আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি ছিল না। তাঁদের খাওয়ার ব্যবস্থা হল এক সম্ভ্রান্ত বাড়িতে। দুজনেই সামনে বসে আপ্যায়ন করছেন গৃহকর্তা। শাস্ত্রীমশাই ডিমে হাত দিয়েই বুঝতে পারলেন ডিমটা পচা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নীরবে ডিমটি খেয়ে নিচ্ছেন দেখে বিনা বাক্যব্যয়ে ওই পচা ডিমটাই খেলেন। পরে অসুস্থও হয়ে পড়লেন। এখন রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করলেন তিনি কেমন করে ওই পচা ডিম হজম করলেন। রবীন্দ্রনাথ হেসে জানালেন যে, ওই ডিম তিনি খাননি। বললেন, নিজের দাড়ির ভিতর দিয়ে চাপকানের তলায় চালান করে দিয়েছিলেন। আশ্চর্য বুদ্ধি বটে! 

মৈত্রেয়ীদেবী রবীন্দ্রনাথের এক যথার্থ মুগ্ধ পাঠক ছিলেন। একবার অনিল চন্দ রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা টুকরো কাগজ ফেলে দিচ্ছিলেন। এই নিয়ে মৈত্রেয়ীদেবীর সঙ্গে তার মতবিরোধ হল। মতবিরোধ না বলে একপ্রকার কলহ বলাই ভালো। মৈত্রেয়ীদেবী বললেন, ‘আপনার হাতে লেখা কাগজ ফেলে দিচ্ছেন। আমি হলে কিন্তু রেখে দিতাম।’ রবীন্দ্রনাথের রসিকতা কম যায় না। বললেন, ‘ওরা অনেক পায় কিনা— তাই তোমাদের মতো কৃপণের সঞ্চয় করতে হয় না।’ রবীন্দ্রনাথ নিজে যেমন অসংখ্য গল্প লিখেছেন, তেমন অজস্র লেখককে গল্পের প্লটও দিয়েছেন। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, ‘বছর কুড়ি আগে যদি জন্মাতে তাহলে তোমাদের আমি দেদার প্লট দিতে পারতাম। তখন আমার মনে হত আমি দু-হাতে প্লট বিলিয়ে হরির লুট দিতে পারি।’ তিনি একবার একই প্লট ভুল করে শরৎকুমারীদেবী এবং চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়েছিলেন। চারুচন্দ্র পরে সেই প্লটের উপর ভিত্তি করে ‘চাঁদির জুতো’ নামে একটি গল্প লেখেন। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘দেবী’ গল্পটির প্লটও রবীন্দ্রনাথ দিয়েছিলেন। প্রভাতকুমার লিখেছিলেন, ‘দেবী গল্পটির আখ্যানভাগ শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় আমায় দান করিয়াছিলেন—’। লেডি রাণুকে লেখা চিঠিতেও বেশ মজাদার বিষয় খুঁজে পাওয়া যায়। একবার লিখেছিলেন, ‘একটা কথা তোমার সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিই। তুমি বলেচ কেউ আমাকে বয়েস জিজ্ঞেস করলে সাতাশ বলতে। আমার ভয় পাছে লোক সাতাশ শুনতে সাতাশি শুনে বসে, আর সেইটেই সহজে বিশ্বাস করে বসে। সেই জন্য তুমি যদি রাজি থাক তাহলে আমি আরো একটা বছর কমিয়ে বলতে পারি। কেননা ছাব্বিশ বল্লে ওর থেকে আর কিছু ভুল করবার ভয় থাকে না।’

সকলে রবীন্দ্রনাথকে নামকরণের রাজা বলে জানেন। ইনস্টিটিউশনের নাম থেকে পাত্রপাত্রীর বিয়ের চিঠি — সব বিষয়ে কবিতা লিখতেই ডাক পড়ে তাঁর। সে বড়ো বিড়ম্বনা।

 

রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘজীবনে ঘটনার ঘনঘটা তো কিছু কম ছিল না। সেই টুকরো ঘটনার কোলাজ মনের মধ্যে অন্য এক রবীন্দ্রনাথের ছবি জাগিয়ে তোলে। শান্তিনিকেতনে (Shantiniketan) খুব অল্প সংখ্যক ছাত্রীকে নিয়ে খোলা হয়েছিল ছাত্রী আবাস। হেমবালা সেনের তত্ত্বাবধানে ছাত্রীরা থাকতেন। একবার সেই ছাত্রীনিবাসে ডাকাত পড়ল। কালিমাখা, পাগড়ি পরা ডাকাতরা মেয়েদের অলঙ্কার নিয়ে টানাটানি শুরু করে। দু-একটি মেয়ে বেশ সাহসী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন একটি ডাকাতের হাত এমন চেপে ধরল যে সে ডাকাতের ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। অনেক কাণ্ড করে সেই ডাকাত হাত ছাড়ায় ডাকাতের পুরো দল অদৃশ্য হয়ে যায়। চারিদিকে হইহই রব। শিক্ষক সন্তোষ মজুমদার বন্দুক হাতে নিয়ে সকলকে অভয় দিতে থাকেন। কিন্তু মেয়েরা ভয়ে অস্থির। সকলেই বাড়ি চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। পরে জানা যায় এই ডাকাতদলের পাণ্ডা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী (Pratima Devi)। এর মাত্র কয়েকদিন পর জগদানন্দ রায়ের বাড়িতে সত্যিকারের ডাকাত পড়ে। পরের দিন রবীন্দ্রনাথের দরবারে ডাক পড়ল প্রতিমাদেবীর। রবীন্দ্রনাথ জানতে চাইলেন, ‘বউমা, তোমাদের দলের লোক নয় তো?’

জীবনের প্রতিপর্বে কষ্ট যন্ত্রণা তো কম পাননি রবীন্দ্রনাথ। তবু নিজের ও পারিপার্শ্বকে আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছেন। কারণ জীবনটাকে কেঁদে ভাসিয়ে দেওয়ার চাইতে হেসে উড়িয়ে দেওয়াই ভালো— জীবনের এই মূল সূত্রটি শুধু লেখায় নয়, নিজের জীবনচর্যায় অনুভব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

সহায়ক গ্রন্থঃ
রসিক রবীন্দ্রনাথ, পুলক চট্টোপাধ্যায়
চেনা কবি অচেনা রবি, পীতম সেনগুপ্ত

Developed by DXDasia