
১৯৩৮ সাল থেকে বেশ কয়েকবার মংপুতে মৈত্রেয়ীদেবীর বাড়ি গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ
রবি ঠাকুর (Rabindranath Tagore) বাংলার আবেগ। আপামর বাঙালির সবরকম অনুভূতির অনায়াস প্রকাশ ঘটেছে যাঁর সাহিত্যে, তাঁর জন্মদিন উদযাপনের দিন হয়ে যায়। সাতাশ বছর বয়স থেকে রবি ঠাকুরের জন্মদিন উদযাপন করা হয়। তখন ১৮৮৭ সাল! সে বছর পঁচিশে বৈশাখ (Pochishe Baishakh) রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারীদেবীর মেয়ে সরলাদেবী ভোর ভোর দাদা জ্যোৎস্নানাথের সঙ্গে কাশিয়াবাগান থেকে সোজা চলে গিয়েছিলেন ৪৯ নম্বর পার্কস্ট্রিটে, সত্যেন্দ্রনাথ এবং জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ তখন সেখানেই ছিলেন। সরলাদেবী বকুল ফুলের মালা নিজের হাতে গেঁথে নিয়ে গিয়েছিলেন। পথে কিনেছিলেন বেল এবং আরো অনেকরকম ফুল। এছাড়াও ছিল ধুতি, চাদর এবং একটি ইংরেজি কবিতার বই— The Poems of Heine। সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এরপর কতবার কতরকমভাবে তাঁর জন্মদিন পালন করা হবে। এখন তো রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন বাঙালির মহোৎসব। আজ এই অনেক অনেক জন্মদিন পালনের স্মৃতির ভিড় থেকে একটি বিশেষ জন্মদিনের ঘটনা তুলে আনি। যেন অতীতের গাছে ঝলমলিয়ে ফুটে থাকা স্মৃতির ফুল।
১৯৩৮ সাল থেকে বেশ কয়েকবার (আনুমানিক চারবার) মংপুতে, মৈত্রেয়ীদেবীর বাড়িতে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মৈত্রেয়ীদেবী ছিলেন সেই সময়কার মস্ত বড়ো দার্শনিক সুরেন দাশগুপ্তর মেয়ে এবং রবীন্দ্রঅনুরাগী। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছের জন্যই অসুস্থ শরীরেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। মংপুতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে অতিবাহিত করা প্রিয় মুহূর্তগুলি নিয়ে মৈত্রেয়ীদেবী (Maitreyi Devi) একটি মনোজ্ঞ স্মৃতিকথা লিখেছিলেন, ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’। শেষবার যখন রবীন্দ্রনাথ মংপুতে রয়েছেন, তখন পঁচিশে বৈশাখ আসন্ন। এমন দিনে রবীন্দ্রনাথ থাকবেন মৈত্রেয়ীদেবীর কাছে। বড়ো মধুর, বড়ো বিশেষ সেইদিন। ভাবনা চিন্তা শুরু হল বেশ! কেমন করে দিনটি উদযাপন করা যায়। অথচ মৈত্রেয়ীদেবীর মংপুর (Mangpoo) বাড়িটিকে ঘিরে তেমন জনবসতি নেই। কেবল রয়েছে জংলি পাহাড়ির দল এবং দুই এক ঘর মাত্র বাঙালি। অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করা হল, সেবার পাহাড়িদের নিয়েই উৎসব হবে। অমিয় চক্রবর্তী বললেন, ‘আমি জানি ওঁর ভালো লাগবে। মস্ত হোমরাচোমরাদের নিয়ে উৎসব তো ঢের হয়েছে, নগণ্যদের নিয়ে উৎসবের বিশেষত্ব আছে।’ রবীন্দ্রনাথও এই আয়োজনের খবর পেয়ে মস্ত খুশি। রথীন্দ্রনাথ প্রতিমাদেবীও আসবেন, যোগ দেবেন অনুষ্ঠানে।
শেষবার যখন রবীন্দ্রনাথ মংপুতে রয়েছেন, তখন পঁচিশে বৈশাখ আসন্ন। এমন দিনে রবীন্দ্রনাথ থাকবেন মৈত্রেয়ীদেবীর কাছে। বড়ো মধুর, বড়ো বিশেষ সেইদিন। ভাবনা চিন্তা শুরু হল বেশ! কেমন করে দিনটি উদযাপন করা যায়। অথচ মৈত্রেয়ীদেবীর মংপুর বাড়িটিকে ঘিরে তেমন জনবসতি নেই। কেবল রয়েছে জংলি পাহাড়ির দল এবং দুই এক ঘর মাত্র বাঙালি।

মংপুতে মৈত্রেয়ীদেবীর বাড়ি
পঁচিশে বৈশাখের দুদিন আগে, রবিবার উৎসবের আয়োজন হল। সকাল দশটয় স্নান সেরে কালো রঙের জামা, কালো জুতো পরে বাইরে এসে বসলেন রবীন্দ্রনাথ। কাঠের বুদ্ধমূর্তির সামনে বসে একজন বৌদ্ধ স্তোত্র পাঠ করলেন। রবীন্দ্রনাথের পাঠে প্রাণবন্ত হয়ে উঠল ঈশোপনিষদের শ্লোক। সেইদিন দুপুরবেলাতেই লিখে ফেলেছিলেন ‘জন্মদিন’ নামে তিনটি কবিতা। স্মৃতিটুকু আটকা পড়ল শব্দের ফ্রেমে। বিকেলবেলায় দলে দলে এসে গেলেন পাহাড়ি নিমন্ত্রিত মানুষজন। বেজে উঠল সানাই। মংপুর পাহাড় ও উপত্যকা যেন নিজস্ব নিস্তব্ধতা ভেঙে উৎসবের আনন্দে সামিল হল। রবীন্দ্রনাথ তখন পরেছেন গেরুয়া রঙের জামা। মালা ও চন্দনে সেজে হুইল চেয়ারে বসে বাড়ির পথ ধরে যখন তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন পাহাড়িরা মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলেন সেই স্বর্গীয় সৌন্দর্য। প্রণত হয়ে ফুল দিচ্ছিলেন তাঁরাও। হয়তো তাঁদের সিংহভাগ মানুষ রবি ঠাকুরের লেখক সত্তার সঙ্গে পরিচিতই ছিলেন না। শুধু অমন ঋষিপ্রতিম ব্যক্তিত্বের সামনে তাঁরা নত হচ্ছিলেন যেন কোন অপার্থিব নির্দেশে। তিব্বতি নিমন্ত্রিতরা এসে তাঁকে পরিয়ে দিলেন খর্দা গাছের সুতোয় বোনা স্কার্ফ। লামারা পরতেন এমন স্কার্ফ। পর্বতের মধ্যে বাড়ি, তার সামনের শিলাতলে এসে যখন বসলেন, তখন শঙ্খ বাজছে। তিব্বতি আর ভুটানিরা শুরু করেছেন তাঁদের নাচ। এরপর সকলে পাতার ঠোঙা নিয়ে বসে গেলেন নিমন্ত্রণ খেতে। রবীন্দ্রনাথ নিজে বসে বসে তদারক করলেন তাঁদের খাওয়া দাওয়া। অনেক রাতে সেই জন্মদিনের সভা শেষ হয়। মৈত্রেয়ীদেবী আবেগে আপ্লুত। বলছেন, ‘এমনদিনে যে আপনাকে কাছে পাব, এ কখনও কল্পনাও করিনি।’ ক্লান্ত অসুস্থ শরীরেও রসিকতা করে বললেন রবীন্দ্রনাথ, ‘কল্পনাশক্তির অভাব একেই বলে।’
তিব্বতি নিমন্ত্রিতরা এসে তাঁকে পরিয়ে দিলেন খর্দা গাছের সুতোয় বোনা স্কার্ফ। লামারা পরতেন এমন স্কার্ফ। পর্বতের মধ্যে বাড়ি, তার সামনের শিলাতলে এসে যখন বসলেন, তখন শঙ্খ বাজছে। তিব্বতি আর ভুটানিরা শুরু করেছেন তাঁদের নাচ।

কিংবদন্তি মৈত্রেয়ীদেবী
পরেরদিন সকলকে নিজের লেখা ‘জন্মদিন’ শীর্ষক কবিতাগুলি পড়ে শোনাচ্ছিলেন। মনের আনাচ কানাচ ভরা জন্মদিনের খুশি। অথচ তারই মাঝখানে সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ দিতে হল তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের জীবনের আনন্দের মুহূর্ত আর দুঃখের মুহূর্ত পাশাপাশি চলেছে। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন সারাদিন। বিকেলে ‘মৃত্যু’ নামের একটি কবিতা লিখে দিলেন। বললেন, ‘জন্মদিনের কবিতার সঙ্গেই এটাও প্রবাসীতে যাক।’ তারপর আবার নীরবতা! অন্ধকার বারান্দায় বসে একটি কষ্টকাতর মানুষ, যেন জীবন ও মৃত্যুর মধ্যেকার রসায়নটা বুঝে নিতে চাইছেন। সারা জীবন কষ্ট পাওয়া এই মানুষটিই বলেছিলেন, ‘নিজেকে খুশি করা নিজের হাতে। যা পেয়েছি তাই ভালো— হাসিমুখে আনন্দিত মনে পার হয়ে যেতে হবে পথ। মন খুঁতখুঁত করে উঠলেই মনকে দিয়ে বলিয়ে নিও— আনন্দং পরমানন্দং পরম সুখং পরমাতৃপ্তি।’ এই আনন্দ-মন্ত্রের কবচকুণ্ডল নিয়েই জন্মেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

মংপুতে রবীন্দ্রনাথের বাড়ি
সহায়ক গ্রন্থঃ
মংপুতে রবীন্দ্রনাথ, মৈত্রেয়ীদেবী

