
অনেকেই তাঁর মতো সমালোচককে নিয়ে বেশ বিরক্ত ছিলেন, যদিও তাঁর গুণ আকৃষ্ট করেছিল রবীন্দ্রনাথকে
আজ রবীন্দ্রনাথের এক বিদেশি বন্ধুর গল্প বলি। স্টেলা ক্রামরিশ (Stella Kramrisch)। হঠাৎ দেখা এবং বন্ধুত্বের সরণি পার হয়ে তাঁর নামটি জুড়ে গেল রবীন্দ্রজীবনে। এমন কত মানুষই তো রবি ঠাকুরের পথের সাথী হয়েছেন। গল্পের মালার পদ্মবীজ যেন। ১৯২০ সালের জুন মাসে অক্সফোর্ডে (Oxford) এক আলোচনা সভায় দেখা হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ও স্টেলার। বরাবর ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি আশ্চর্য কৌতূহল স্টেলার। সেবার অক্সফোর্ডে রবীন্দ্রনাথ পাঠ করেছিলেন ‘দ্য মেসেজ অব দ্য ফরেস্ট’ (The Message of the Forest) নামের প্রবন্ধটি। স্টেলা বলেছিলেন ‘ইন্ডিয়ান টেম্পেল’ নিয়ে। বক্তৃতার শেষে রবীন্দ্রনাথের আন্তরিক সম্বর্ধনায় মুগ্ধ হয়েছিলেন স্টেলা, তাঁর বয়স তখন পঁচিশ। সেই দশ বছর বয়স থেকে ভারতের আধ্যাত্মিকতা তাঁকে টানে। লাইব্রেরির থেকে লিওপোল্ড ভন শ্রোয়েডারের করা ভগবত গীতার জার্মান অনুবাদ পড়ে মানস চোখে দেখেছিলেন একখণ্ড ভারতভূমিকে। অনেক বছর পর রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) এবং তাঁর শব্দের বলয় তাঁকে মুগ্ধ করল আবার। এক রহস্যময় অতীন্দ্রিয় পৃথিবী তাঁকে ডাক দিয়েছে বারবার। মধ্যযুগের ইউরোপ এবং প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মবাদ স্টেলা ক্রামরিশকে মনে মনে দার্শনিক করে তুলেছিল। ভারতের চিত্র, স্থাপত্য, রহস্যময়তা সবটুকু মায়াবী হাতছানিতে ডাক দিয়েছে তাঁকে। স্টেলার মগ্নচেতন হয়তো ভারতভূমির জন্য অপেক্ষায় ছিল। সেই ডাক এল রবীন্দ্রনাথের তরফ থেকে।
স্টেলার আশ্চর্য জ্ঞান ও মনীষার খবর পেয়ে তাঁকে বিশ্বভারতীতে আহ্বান করলেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বভারতীর (Visva-Bharati) কলাভবনে যোগ দেওয়ার ডাক পাওয়াটা স্টেলার কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো। অস্ট্রিয়ার মিকুলভ শহরের মোরাভিয়াতে জন্মেছিলেন যে মেয়েটি, ভিয়েনাতে বড়ো হয়ে ওঠার সময় তাঁর অন্তরের কেন্দ্রে জেগে উঠছিল আধ্যাত্মিক ভারতবর্ষ। ফলের আশা না করে কর্ম করে যাওয়ার মন্ত্রকে ভর করে সত্যি স্বপ্নপূরণ হল। ভিয়েনাতে ফিরে গেলেন না স্টেলা। রবীন্দ্রনাথের ডাকে সাড়া দেওয়াটা খুবই দরকার। অথচ ভারতে আসার জন্য তাঁর দরকার ছিল কিছু বিখ্যাত মানুষের শংসাপত্র। স্টেলা চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। রোটেনস্টাইনের কাছ থেকে শংসাপত্রের আশা করেছিলেন। অথচ রোটেনস্টাইন খোলা মনে স্টেলাকে ছাড়পত্র দিতে পারলেন না। রবীন্দ্রনাথ আর রোটেনস্টাইনের পত্রাবলির থেকে জানতে পারা যায়, মেয়ে বলেই ছাড়পত্র পান নি স্টেলা। কিন্তু স্টেলার মনের জোর ছিল অসীম। সেই ইচ্ছাশক্তির জোরেই বিশ্বভারতীর কলাভবনে (Kala Bhavana) পৌঁছে গেলেন স্টেলা। এটাই ভাগ্যের বিধান ছিল।

এই সময় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন অর্দ্ধেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলি। তাঁর অনুমোদন স্টেলার ভারতে আসার এক প্রধান সিঁড়ি ছিল। কিন্তু পরে তাঁদের সম্পর্ক জটিল হয়। অর্দ্ধেন্দু গাঙ্গুলি স্টেলাকে অনেকরকম সাহায্য করা সত্ত্বেও স্টেলা তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখতে পারেননি। অর্দ্ধেন্দু গাঙ্গুলি লিখেছিলেন, ‘কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যবশতই এই বিদূষী মহিলা আমার সাহায্যের বিনিময়ে অবশেষে আমার ক্ষতিসাধনেই ব্যাপৃত হয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে অর্দ্ধেন্দ্রকুমার গাঙ্গুলির সম্পর্কের ক্ষতিসাধনও নাকি করতে চেয়েছিলেন স্টেলা। নন্দলালের (Nandalal Bose) সঙ্গেও স্টেলার সম্পর্ক ভালো ছিল না। স্টেলা মর্ডান আর্টের প্রতি ছাত্রদের ভালোবাসা তৈরি করাতে পেরেছিলেন। তাঁর উচ্চারণ স্পষ্ট না হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ স্টেলার ক্লাসে উপস্থিত থাকতেন। স্টেলার বিষয়ে নন্দলালের বিখ্যাত উক্তি— ‘তিনি আধুনিকতার পত্তন করলেন আমাদের কলাভবনে।’ আবার অর্ধেন্দু ব্যানার্জীর আঁকা দেখে বিরূপ মন্তব্য করায় অবনীন্দ্রনাথ তার সমালোচনা করেছিলেন। কানাঘুঁষো শোনা যায়, অবনীন্দ্রনাথ প্রবল রেগে বলেছিলেন, ‘ও তো ডাইনি বুড়ি। ছেলেরা যখন ছবি আঁকছে, সে সময় ছবির সমালোচনা করতে নেই। যে করে সে তো ডাইনি।’
মধ্যযুগের ইউরোপ এবং প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মবাদ স্টেলা ক্রামরিশকে মনে মনে দার্শনিক করে তুলেছিল। ভারতের চিত্র, স্থাপত্য, রহস্যময়তা সবটুকু মায়াবী হাতছানিতে ডাক দিয়েছে তাঁকে। স্টেলার মগ্নচেতন হয়তো ভারতভূমির জন্য অপেক্ষায় ছিল।
অবন ঠাকুরের (Aabanindranath Tagore) বকুনি খেয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন স্টেলা। অনেকেই স্টেলার মতো ক্রিটিককে নিয়ে বেশ বিরক্ত ছিলেন। অথচ রবীন্দ্রনাথের পক্ষপাত ছিল তাঁর প্রতি। ইন্দিরাদেবীদের (Indira Devi) সঙ্গে স্টেলাকে পুরীতেও পাঠাতে চেয়েছিলেন। স্টেলা কিন্তু অত্যন্ত কর্মী মানুষ ছিলেন। তাঁর এবং গগন ঠাকুরের (Gaganendranath Tagore) সাহায্যে কলকাতায় জার্মান শিল্পীদের আঁকার প্রদর্শনী হয়েছিল। তবে স্টেলা শান্তিনিকেতনের (Shantiniketan) আবহাওয়া সহ্য করতে পারেননি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে (Calcutta University) অধ্যাপনায় অংশগ্রণ করেন। তখন থেকে ধীরে ধীরে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ক্ষীণ হতে থাকে। শান্তিনিকেতনে তাঁর সম্পর্কে সকলের ভালো ধারণাও ছিল না। সম্পর্কের নিরিখে একটা অস্বস্তি দানা বেঁধেছিল। স্টেলা অ-ভারতীয়, তাঁর আচরণ, পোশাক সবকিছুই সেকেলে মানুষদের কাছে তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ ছিল না। স্টেলা বিরক্ত হয়ে নিজের কাছে আগ্নেয় অস্ত্র রাখার আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে রাজশাহীর বারেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটিতে গিয়ে স্টেলার সঙ্গে পরিচয় হয় অক্ষয় মৈত্রের। এক নিবিড় গুরু শিষ্য সম্পর্কের সূচনা হয়। এক তান্ত্রিকের সঙ্গেও যোগাযোগ হয় স্টেলার। এই সময় শ্মশানে গিয়ে স্টেলা শবসাধনা করেন, এমন কথাও শোনা যায়। অথচ তিনি ছিলেন অসাধারণ শিক্ষক। শিল্পকে ভালোবাসতে শেখাতেন স্টেলা। তিনি অসামান্য বাগ্মীও ছিলেন। তাঁর এই গুণগুলিই সম্ভবত রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল।
হয়তো সেই প্রথম দিন শান্তিনিকেতনে আসার স্মৃতির সুবাস ঘিরেছিল তাঁকে। পৌষমেলা শুরু হওয়ার আগের দিনে মধ্যরাতে যে একলা মেয়েটি কয়েকটি শব্দ লিখেছিলেন, সেই শব্দকটিই মন্ত্রের মতো ঘিরেছিল তাঁকে, হয়তো সারাজীবনের কবচ কুণ্ডলের মতো
এরপর ল্যাজলো নেমেনির সঙ্গে বিয়ে হয় স্টেলা ক্রামরিশের। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার পর নেমেনি পাকিস্তান সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। বিবাহিত জীবনে বড়ো অল্প সময় একসঙ্গে থেকেছিলেন তাঁরা। নেমেনির আকস্মিক মৃত্যুতে স্টেলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। ভারত ছেড়ে চলে যান আমেরিকায়। রবি ঠাকুরের ডাকে যে মেয়েটি সাড়া দিয়ে এসেছিলেন ভারতে, তাঁর জীবন অনেক ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে এগিয়ে চলেছিল। জীবন যেমন এগিয়ে চলে কোনো আবেগের তোয়াক্কা না করে! অসংখ্য শিল্প, সাহিত্যের স্রষ্টা এবং ভারতের শিল্পকে নতুনভাবে দেখার চোখ তৈরি করেন স্টেলা ক্রামরিশ।
দীর্ঘজীবনে অনেক পর্ব পার করেছেন এই বিদেশিনী। অনেক আবেগ, ঝড়, তুফানের পরেও হয়তো এক নির্জন দ্বীপের মতো মনে জেগেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। হয়তো সেই প্রথম দিন শান্তিনিকেতনে আসার স্মৃতির সুবাস ঘিরেছিল তাঁকে। পৌষমেলা শুরু হওয়ার আগের দিনে মধ্যরাতে যে একলা মেয়েটি কয়েকটি শব্দ লিখেছিলেন, সেই শব্দকটিই মন্ত্রের মতো ঘিরেছিল তাঁকে, হয়তো সারাজীবনের কবচ কুণ্ডলের মতো—
‘মধ্যরাতের অল্প কিছু আগে পৌঁছেছিলাম আমি। অদ্ভুত শান্ত ছিল চারিদিক। ঠাণ্ডা ছিল বেশ। শীতের সময়। ছোটো ছোটো গাছগুলি ফুলে ভরেছিল। সুন্দর গন্ধ ছড়াচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ এলেন। স্বাগত জানালেন আমাকে। তাঁর পিছন পিছন এল একটা হরিণ। আমার মনে হল, এ যেন স্বপ্নের মতো, কথায় বোঝানো যায় না। আমার থাকার ছোটো ঘরটি দেখিয়ে দিলেন তিনি। মাটির তৈরি একটা চৌখুপি। উপরে খোলার ছাদ। রাত্রে খুব একটা ঘুমাইনি। কেননা পাঁচটার সময় ঘণ্টা বেজে উঠল। শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রীদের গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গানের সুর ভেসে আসছিল। এখানকার পৌষমেলার দিন ছিল এটা।’
স্টেলা ক্রামরিশের জীবনে অনেক গতিপথ এসেছে, কিন্তু মহাকাল জানে, সেরা বাঁকবদলের মুহূর্তে এই শব্দ কয়টি স্থির হয়ে আছে। স্টেলা ক্রামরিশের আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের মতো।
সহায়ক প্রবন্ধঃ
স্টেলা ক্রামরিশ ও রবীন্দ্রনাথ, মৃণাল ঘোষ, কোরক সাহিত্য পত্রিকা, শারদ ১৪১৫

