মোহনবাগানের খেলায় গগন ঠাকুর – বৃষ্টিতে গাড়ি থেকে নামা হল না, কিন্তু ছবি আঁকা হল

গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম বিখ্যাত ছবি ‘মোহনবাগান’

ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় এসে বসতো দাঁড়কাকের সারি। গগন ঠাকুর মগ্ন হয়ে ছবি আঁকতেন আর বলতেন, ‘চুপ! ওরা আমাকে দিয়ে ছবি আঁকাচ্ছে।’ ১৯০৫ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত চাইনিজ ইঙ্কে কাকের বেশ কয়েকটি ছবি সিরিজের আকারে আঁকবেন গগন ঠাকুর, ছবির এক আশ্চর্য ভুবনে মগ্ন এক চিত্রকর! আবার কখনো সাদা আর নীল রঙের ঘোড়ায় চড়ে এসে দাঁড়ায় রূপকথার রাজপুত্র। তার সামনে জলাশয়। জমাট অন্ধকার ছড়িয়ে আছে জঙ্গলের আনাচে-কানাচে। হাতে তীরধনুক আর মাথায় মুকুট পরা রাজপুত্রকে বৃক্ষকোটর থেকে লক্ষ করছে দুটি পেঁচা। এমন ছবিই— ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’। গগন ঠাকুরের সৃষ্টি। শব্দ নয়, চিত্র ছিল তাঁর ভালো লাগা। ছবিতেই নিয়ে এসেছিলেন নতুন দিগন্ত। আজকের কথালাপ সেই মগ্ন শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে।

গুণেন্দ্রনাথ আর সৌদামিনীদেবীর ছেলে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি হতে চেয়েছিলেন সংগীতশিল্পী। সাহেব মাস্টার রেখে সুর নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতেন। কিনে আনতেন হরেকরকম বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু তারপর একটা সময়ের পর তুলি আর রং তাঁর সঙ্গী হয়ে উঠবে। মনখারাপের মেঘলা প্রহরে রোদ এঁকে দেবে একান্তে। সে এক কাহিনি। একবার গ্রীষ্মকালে গগনেন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবার জোড়াসাঁকোর বাড়ি ছেড়ে গিয়েছিলেন সার্কুলার রোডের বাড়িতে। সেখানে একটি রহস্যময় তালাবন্ধ ঘরের নিষিদ্ধ দরজা খুলে দিয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রমোদসুন্দরী। তারপরেই কাকতালীয়ভাবে টাইফয়েড হয়ে মারা যায় তাঁদের ছেলে গেহেন্দ্রনাথ, মাত্র ষোলো বছর বয়সে। পুত্রশোক প্রায় স্তব্ধ করে দেয় গগনেন্দ্রনাথকে। তখন ক্ষেত্রচূড়ামনি নামের কথক আসেন তাঁকে কথকতা শোনাতে। পুরাণের গল্প তাঁর শোকতপ্ত মনকে সান্ত্বনা দিতে পেরেছিল কিনা জানা নেই। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন তিনি পোর্ট্রেট আঁকতে শুরু করলেন। কথক, শিবু কীর্তনীয়া, দীনেশচন্দ্রকে ছবিতে ফুটিয়ে তুললেন অনায়াসে। তারপর রং তুলির ম্যাজিক চলতেই থাকলো। চিত্রশিল্পের অনেক দিক প্রভাবিত  করবে তাঁর সৃজনকে। গগনেন্দ্রনাথের ব্যঙ্গচিত্র তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। বিচারশালায় বসে নোট নিতেন গগনেন্দ্রনাথ। হাতে থাকতো খাতা আর পেন্সিল। সকলে যখন ভাবতো তিনি মাথা নিচু করে নোট নিচ্ছেন, তখন আসলে তিনি পোর্ট্রেট আঁকতেন। কোনো বিখ্যাত মানুষ বোধহয় বাদ পড়েনি তাঁর ব্যঙ্গচিত্রের বিষয় থেকে। রবীন্দ্রনাথ আরামকেদারায় বসে উড়ে যাচ্ছেন — এমন ছবিও এঁকেছেন। তাঁর আঁকা ব্যঙ্গচিত্র প্রবাসী, মর্ডান রিভিউ, ভারতী, নারায়ণ, আগমনী ইত্যাদি নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই ব্যঙ্গচিত্রগুলির মধ্যে ‘হাইব্রিড বেঙ্গলি’র উল্লেখ করা যায়। গগন ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রগুলি ভ্রষ্ট সমাজের প্রতি ব্যঙ্গের কষাঘাত ছিল।

রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন গগন ঠাকুর

গগনেন্দ্রনাথ আত্মভোলা শিল্পী। ঠাকুরবাড়ির বারান্দায় মগ্ন হয়ে বসে ছবি আঁকতেন। পাশে শান্ত হয়ে বসে থাকতেন স্ত্রী প্রমোদসুন্দরী। রবীন্দ্রনাথ অনেকবার তাঁকে বিদেশে গিয়ে চিত্র শিল্প বিষয়ে চর্চা করে আসতে বলতেন, কিন্তু গগনেন্দ্রনাথ রাজি হননি। শেষে রবীন্দ্রনাথের উৎসাহে জাপানি চিত্রশিল্পীরা ঠাকুরবাড়িতে আসেন এবং গগন ঠাকুরের ছবি আরও আকর্ষক হয়ে ওঠে। কিউবিক আর্টের ধরনটিকে তিনি আঁকায় ব্যবহার করেছিলেন। তাঁকে ‘ইন্ডিয়ান কিউবিস্ট’ বলা হতো। নিজের নামের প্রতীকচিহ্ন সোনালি বোর্ড আর জাপান থেকে আসা রঙের সাহায্যে তৈরি করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘জীবনস্মৃতি’  অলঙ্করণের কাজ দিয়েছিলেন। গগনেন্দ্রনাথের  সারাজীবনটাই একটা বিচিত্র কর্মকাণ্ড। ভারতীয় ও পাশ্চাত্য সাহিত্যে তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান। বাড়িতে বিপুল বড়ো গ্রন্থাগার তৈরি করান। ওরিয়েন্টাল সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট গগনেন্দ্রনাথের চেষ্টায় নতুন জীবন পেয়েছিল। ‘রূপম’ নামের এক শিল্প পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। নিয়মিত শিল্প সম্পর্কে বক্তৃতার আয়োজন করতেন। নাট্যমঞ্চ সাজাতেন মন দিয়ে। জীবনের শেষ আটবছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। তখন কাজ তেমন করতে পারেননি। কিন্ত ওই সময়ও যামিনী রায়ের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছেন। জাপানি কায়দায় বাগান তৈরি করিয়েছেন। ছোটোদের জন্য দিব্যি লিখে ফেলেছেন ‘ভোঁদড় বাহাদুর’। রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি স্কেচ করেছেন আপন মনে। মা সৌদামিনীকে নিয়ে জগন্নাথ দর্শনে গিয়ে সৃষ্টি করেছেন সমুদ্র সৈকত আর জগন্নাথ মন্দিরের আশ্চর্য সব কিউবিক আর্ট প্রভাবিত চিত্র। গগন ঠাকুরের আঁকা ছবিগুলি বাংলা শিল্পজগতের সম্পদ।

গগনেন্দ্রনাথ চিত্রিত নন–কো–অপারেশন মুভমেন্ট

তখনকার দিনে ব্রাহ্ম পরিবারগুলিতে বিয়ের কনের সেলাই করা কাপড় পরার রেওয়াজ ছিল না। গগনন্দ্রনাথ নিজের মেয়ে সুজাতাকে এমনভাবে নির্দেশ দিয়ে শাড়ি পরিয়েছিলেন যে মনে হয়েছিল কনে শাড়ি ও সেলাই করা জামা পরে আছে। বিয়েবাড়িতে হট্টগোলের মধ্যে তাঁর এই শিল্প প্রতিভাও সকলে দেখেছিলেন। মোহনবাগানের খেলা দেখতে গিয়েছিলেন একদিন জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে। প্রবল বর্ষায় গাড়ি থেকে নামাই হল না। ফিরে এসে এঁকে ফেললেন বিখ্যাত ছবি ‘মোহনবাগান’। ছবিতে কেবল ছাতার সারি! রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত জোব্বা পোশাকের পরিকল্পনাও তাঁর ছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রীতিমতো সাহায্য করতেন গগনেন্দ্রনাথ। বাড়িতে গোপনে বিপ্লবীদের আনাগোনা ছিল। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দলকে নতুন সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। বর্তমান ‘ক্যালকাটা ক্লাব’-এর নাম যখন ঠিক করা হয় ‘ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট’ তখন তীব্র প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। বাড়িতে পুলিশ এসেছিল স্বদেশী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য। তখন মা সৌদামিনীর নির্দেশে গগনেন্দ্রনাথের পাহাড় প্রমাণ স্বদেশী বই পুড়িয়ে ফেলা হয়। তাঁর নিজের আঁকা তিনটি ব্যঙ্গচিত্রের বই— ‘অদ্ভুতলোক’, ‘বিরূপ বজ্র’ এবং ‘নবহুল্লোড়’।

গগনেন্দ্রনাথ লিখিত ভোঁদড় বাহাদুর

যদিও ধনী পরিবারের সন্তান, তবু বাবার কথায় কখনো বিলাসী জীবনযাপন করেননি তিনি। মাত্র পনেরো বছরে বাবা মারা যাওয়ায় পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সন্তান শোকে বিহ্বল হয়ে আঁকড়ে ধরেছিলেন চিত্রশিল্পকে। বিচিত্র কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। বাইরের পৃথিবী যেমন চলেছে নিজের নিয়মে, গগন ঠাকুর মনে মনে ডুব দিয়েছেন রঙের ভুবনে। রূপের গভীরে নিমগ্ন ঠিক যেন এক সাধক।

সহায়ক গ্রন্থঃ

ভারতীয় চিত্রকলার আধুনিক পথিকৃৎ রবীন্দ্রনাথ, ইন্দ্রায়ুধ সেনগুপ্ত
রূপদক্ষ গগনেন্দ্রনাথ, কমল সরকার

 

Developed by DXDasia