
পায়ে হেঁটে জানুন তিলোত্তমা ইতিহাস
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
কলকাতার ‘নেটিভ’ এলাকায় শেষ হয়েছিল গতবারের ভ্রমণ। অভিজাত বাঙালিরা এখানে বাস করতেন। বেশিরভাগের সঙ্গেই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরে ইংরেজ রাজ-সরকারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। ১৮ এবং ১৯ শতকে চিৎপুর রোড এবং তার আশেপাশে থাকতেন মিত্তির, মল্লিক, শীল, ঠাকুরের মতো পুরোনো সব পরিবার।
এঁদের মধ্যে সবাই যে ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসা করে ধনী হয়েছিলেন, তা নয়। সোনা, মশলা, নুন, কাপড়, জাহাজ কিংবা মহাজনি কারবারে অনেকে যুক্ত ছিলেন আগে থেকেই। তবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে ব্যবসার সুযোগ বেড়ে যায়। পূর্ব এবং পশ্চিমের সংযোগ আরও শক্তিশালী হয়। দেশীয় বণিকরা ব্রিটিশদের বণিকদের সহায়তা করতে থাকেন। প্রথম দিকে একেবারে সমান অংশীদার হিসেবে। প্রমাণিত হয়, সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের থেকে উপনিবেশের বাসিন্দারা কম প্রভাবশালী নন।
কেবল অর্থ এবং আড়ম্বরেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই প্রভাব। দুর্গাপুজো কিংবা দোলযাত্রার জাঁকজমক, পোষা কুকুরের ‘বিয়ে-র মতো বিলাসিতা ছাড়াও কয়েকটি পরিবার বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল বাংলার নবজাগরণে। ১৯ শতকে পশ্চিমি শিক্ষায় আলোকিত হয়ে নতুন সমাজ গঠনে এগিয়ে যান অভিজাত যুবকেরা।
কয়েকটি প্রাসাদে আজও তাঁদের বংশধরেরা বাস করেন। তাই প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। বিশেষ অনুমতি নিয়ে আপনি ভিতরে ঘুরতে পারবেন। মার্বেল প্যালেসের অল্প কিছু অংশে যেতে পারবেন সরকারের অনুমতি নিয়ে।
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি
কেউ মনে করেন, এই অঞ্চলে দু’টো সেতু পাশাপাশি ছিল এক সময়। যার থেকে ‘জোড়াসাঁকো’ নাম এসেছে। আবার অনেকের মতে, এক জোড়া শিবমন্দির ছিল (‘শঙ্কর’ থেকে ‘সাঁকো’) বলেই এমন নাম। সঠিক তথ্য কোনটা, সন্দেহ আজও রয়েছে। ১৭৮৪ সালে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের ((১৭৯৪-১৮৪৬) আমলে এই বাড়ি হয়ে ওঠে কলকাতার অন্যতম সাংস্কৃতিক পীঠস্থান।
দ্বারকানাথ কয়লা, নীল, কাপড়, জাহাজের ব্যবসা করে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছন। সঙ্গে দার্শনিক এবং সামাজিক কাজকর্মেও ব্যাপক অবদান রাখেন। তাঁর ছেলে দেবেন্দ্রনাথ ব্যবসার দিকে না গেলেও অব্যাহত রেখেছেন পরিবারের উন্নতি। সেই গরিমা চরমে নিয়ে যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বহুমুখী সৃষ্টি দিয়ে বাঙালির আসন সারা বিশ্বে চিরকালের জন্য অম্লান করে দেন। তাঁর ভাইবোনেরাও যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন সাংস্কৃতিক জগতে।
চিৎপুর রোড এবং মুক্তারামবাবু ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঠাকুরবাড়ি। এখন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। বাড়ির প্রায় সব অংশেই দর্শনার্থীরা যেতে পারেন। রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়াম অবশ্যই দেখবেন।
মার্বেল প্যালেস
এবার চলুন মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে। ১৯ শতকের অন্যতম সেরা সংরক্ষিত প্রাসাদ রয়েছে এখানে। রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের স্বপ্ন ছিল মার্বেল প্যালেস। ১৮৩৫ সালে নির্মাণ সমাপ্ত হয়। নুন এবং অন্যান্য সামগ্রী বিক্রি করে প্রচুর সম্পদের অধিকারী হন রাজেন্দ্র। শিল্পেও আগ্রহ ছিল। ইউরোপের নানা প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করতেন চোখ-ধাঁধানো শিল্পসামগ্রী। আপনিও দেখতে পাবেন মার্বেল প্যালেসে গেলে। ইতালীয় রেঁনেসাসের বিখ্যাৎ শিল্পী তিশিয়ানের আঁকা ছবিও রয়েছে। প্রাসাদে একটি ছোটো চিড়িয়াখানা বানানো হয়েছিল। একতলার ব্যাংকেট হলের মেঝে প্রায় একশো রকমের মার্বেল দিয়ে বানানো। এই কারণেই সম্ভবত প্রাসাদের এমন নাম। বসতবাড়ির পাশেই জগন্নাথ মন্দির। সেখানে পারিবারিক দেবতা রাধাকান্তের পুজো হয়। প্রত্যেক বছর আয়োজিত হয় বিশাল রথযাত্রা। বাড়ির কালীপুজোও বেশ প্রসিদ্ধ। পুরোনো কলকাতার অল্প কিছু অভিজাত বাড়িতে দুর্গাপুজো হয় না। তাঁর মধ্যে মার্বেল প্যালেস অন্যতম।
প্রাসাদটি ইউরোপীয় নিও-ক্লাসিক্যাল রীতির দারুণ নিদর্শন। তবে খোলা দরবার গড়ে উঠেছে বাঙালি পরম্পরা মেনে। এভাবেই পূর্ব এবং পশ্চিমের সমন্বয় ঘটেছে। অনুমতি নিয়ে আপনি মার্বেল প্যালেসে ঢুকতে পারবেন। ঘুরে দেখানোর জন্য প্রশিক্ষিত কর্মীরা হাজির থাকেন।
অন্যান্য বনেদি পরিবার
আরও বেশ কিছু অভিজাত প্রাসাদ ছড়িয়ে রয়েছে এলাকা জুড়ে। যেমন ঠাকুর এবং মল্লিক পরিবারের অন্যন্য শাখা। চিৎপুর রোড ধরে উত্তর দিকে হাঁটতে থাকুন। পৌঁছে যাবেন রাজেন্দ্রনারায়ণ রায়ের জোড়াসাঁকো রাজবাড়ি। এখন মহামারির জন্য বন্ধ থাকলেও ছাদ, বারান্দা এবং বিশাল দরবার দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে।
তারপর এগোলে দেখতে পাবেন লোহিয়া মাতৃ সেবা সদন। এক সময় বাবু হরনাথ শীলের আবাস ছিল। ৩৫টি বিলাসবহুল গাড়ির মালিক বিখ্যাত ধনী বাবু প্রদ্যুম্ন মল্লিকের কাছে তিনি বাড়িটি বিক্রি করে দেন। এখন অবশ্য পরিত্যক্ত। বিশাল বিশাল লোনিয়ান স্তম্ভের জন্য প্রাসাদটিকে অনেক বেশি বড়ো দেখায়।
এই প্রাসাদের উল্টোদিকে আরেকটি মল্লিকবাড়ি। সংস্কার করে নতুন রূপ দেন আশুতোষ মল্লিক। ধনী ব্যবসায়ী মধুসূদন সান্যালের থেকে বাড়িটি কেনেন। ১৮৭২ সালে এখানে দীনবন্ধু মিত্রের নাটক ‘নীলদর্পণ’ মঞ্চস্থ হয়। নীল চাষিদের ওপর ব্রিটিশদের অত্যাচার সরাসরি তুলে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার নিষিদ্ধ করে এই নাটক। প্যালাইডিয়ান রীতির প্রাসাদে আরেকটি আকর্ষণ ঘড়িঘর।
কাছেই রয়েছে গোরাচাঁদ মল্লিকের বসতবাড়ি। তার নহবতখানা, উঁচু উঁচু রাজকীয় স্তম্ভ, ব্রোঞ্জ ও মার্বেলের ভাস্কর্য এবং ছবির সংগ্রহ দেখার মতো।
পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিট
মল্লিক পরিবারের অন্য একটি শাখার জন্য এই রাস্তা বিখ্যাত। তবে ঘোষ পরিবারের রমরমাও কম নয়। আগে রাস্তা থেকে হুগলি নদী পর্যন্ত ছিল পাথরে বাঁধানো ঘাট। সরু গলির মতো এই পথেই রয়েছে খেলাত ঘোষ পরিবারের বিশাল অট্টালিকা। সমৃদ্ধ বণিক খেলাত ঘোষ ছিলেন গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের দেওয়ান রামলোচন ঘোষের নাতি। ১৮৫৬ সালে তিনি এই বাড়ি তৈরি করেন। খুব অল্প কয়েকটি পরিবারের খ্যাতি ছিল ‘ওল্ড মানি’-র মালিক হিসেব। তার মধ্যে খেলাত ঘোষ পরিবার একটি। আজও বাড়িটির গায়ে ফুটে ওঠে পুরোনো দিনের গৌরব।
তার ঠিক পরেই ভূপেন্দ্রকৃষ্ণ ঘোষের বাড়ি। রামলোচন ঘোষের আরেক বংশধর। খেলাত ঘোষের প্রাসাদের চেয়ে এই বাড়ি অনেক পুরোনো। আড়াইশো বছরের কাছাকাছি। তবে আকারে ছোটো। ভূপেন্দ্রকৃষ্ণ এবং তাঁর ছেলে মন্মথনাথ দুজনেই ছিলেন ধ্রুপদী সংগীতের ভক্ত। তখনকার দিনের সেরা সংগীতশিল্পীরা পা রেখেছেন এই বাড়িতে।
আরও পড়ুন: কলকাতার সবচেয়ে পুরোনো রাস্তার গল্প
উল্টোদিকে রয়েছে নিমাইচরণ মল্লিকের নাতি যদুলাল মল্লিকের বাড়ি। নিমাই মল্লিকের নামেই হাওড়া ব্রিজের কাছে মল্লিক ঘাট। যদুলালের বাড়িতে ঢালাই লোহার থাম এবং খিলান, ছাদে ইস্পাতের কড়িকাঠ ছিল তখনকার দিনে অভিনব।
প্রসন্নকুমার ঠাকুর স্ট্রিট
খেলাত ঘোষের বাড়ি থেকে বাঁ দিকে ঘুরলেই প্রসন্নকুমার ঠাকুর স্ট্রিট। গভর্নর জেনারেলের দেওয়ান দর্পনারায়ণ ঠাকুরের নাতি প্রসন্নকুমার ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। ধনী ব্যবসায়ী, উকিল এবং সমাজ সংস্কারক। ১৮৫০ সালে গড়ে ওঠা টেগোর ক্যাসেলের প্রধান উদ্যোক্তা তিনিই। টাওয়ার এবং টারেট নিয়ে ব্রিটিশ ক্যাসেলের মতোই গঠন। বহুবার সংস্কার করা হয়েছে বাড়িটি। তাই আদি ক্যাসেলের সামান্য অংশই অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরের দিন আমরা চিৎপুর রোড ধরে হাঁটব। তারপর চলে যাব শিয়ালদহ অঞ্চলে। এই সপ্তাহের যাত্রা শুভ হোক।
